লেখক: সরোজ কুমার মিস্ত্রী, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, কালিয়া, নড়াইল
তথ্যসূত্র: মাসিক ‘খামার’ (পোলট্রি, পশুসম্পদ ও মৎস্য বিষয়ক)
বাংলাদেশে গলদা চিংড়ি চাষ অনেকদিন ধরেই একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় শিল্প। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঘের বাড়ছে, উৎপাদন বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত হারে। এই অবস্থায় মনোসেক্স গলদা চিংড়ি চাষ (শুধু পুরুষ বা শুধু স্ত্রী চিংড়ি আলাদা করে চাষ) হতে পারে ইউনিট প্রতি উৎপাদন বাড়ানোর সবচেয়ে সময়োপযোগী প্রযুক্তি—যা অনেকের কাছে এখনও নতুন ও অপরিচিত।
বাংলাদেশের মাটি, পানি ও আবহাওয়া গলদা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ফলে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, নড়াইল, পিরোজপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় দিন দিন নতুন নতুন ঘের তৈরি হচ্ছে। মিঠা পানিতে চাষ হওয়ায় টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত যেসব জলাশয়ে বছরের ৬ মাস বা তার বেশি সময় ২–৩ ফুট পানি থাকে, সেখানেও গলদা চাষের সুযোগ রয়েছে। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নিতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ইউনিট প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি—দুটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।
কেন মনোসেক্স চাষ এখন জরুরি?
আমাদের দেশে এখনও অধিকাংশ চাষি গলদা চাষ করেন সনাতন বা উন্নত সনাতন পদ্ধতিতে। ফলে ঘেরের আয়তন বাড়লেও গড় উৎপাদন কম থাকে। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, খাদ্য নিরাপত্তা, এবং মৎস্য রপ্তানির চাহিদা—সব মিলিয়ে একই জমিতে বেশি উৎপাদন করাই হবে আগামী দিনের টেকসই সমাধান।
বিশ্বের অন্যান্য দেশ—বিশেষ করে ভারত ও থাইল্যান্ড—গলদায় যে উৎপাদন পাচ্ছে, তার তুলনায় আমাদের উৎপাদন কম। তাই মনোসেক্স চাষ হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা বাস্তবভিত্তিকভাবে উৎপাদনকে দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়িয়ে দিতে পারে।
মনোসেক্স গলদা চিংড়ি চাষ কী?
মনোসেক্স চাষ মানে—
শুধু পুরুষ গলদা চিংড়ি চাষ (All-male culture) অথবা
শুধু স্ত্রী গলদা চিংড়ি চাষ (All-female culture)
এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ পুরুষ গলদা স্ত্রী গলদার তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ে এবং অনেক বেশি ওজন হয়। ফলে কম সময়ে বেশি ওজন পাওয়া যায়—আর বাজারে গ্রেড অনুযায়ী দামও অনেক বাড়ে।
“গ্রেড”–ই আসল লাভ-লোকসানের জায়গা
গলদা বিক্রিতে দাম নির্ধারিত হয় গ্রেডিং (ওজনভিত্তিক শ্রেণি) অনুযায়ী। এখানে সামান্য ওজন বাড়লে দাম অনেক বেড়ে যায়।
উদাহরণ
একটি গলদার ওজন ৯০ গ্রাম হলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে ২০ গ্রেড ধরা হয়।
একই গলদা আর মাত্র ১০ গ্রাম বেড়ে ১০০ গ্রাম হলে ১০ গ্রেড-এ চলে যেতে পারে।
ফলাফল: একই মাছ, সামান্য ওজন বৃদ্ধি—কিন্তু কেজি দরে বড় পার্থক্য, এবং মোট আয়ে বড় পরিবর্তন।
এই কারণে “গ্রেডে উঠতে না পারা” গলদা চাষিদের বড় ক্ষতির কারণ। মনোসেক্স (পুরুষ) চাষে এই সমস্যার সমাধান অনেক সহজ হয়—কারণ পুরুষ দ্রুত বড় হয় এবং গ্রেডে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
বাংলাদেশের প্রচলিত ধান-ঘের পদ্ধতিতে সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশে অনেক চাষি ধানের জমিতে গলদা চাষ করেন। সাধারণভাবে—
বোরো ধান কাটার পরে চৈত্র-বৈশাখে ঘের প্রস্তুত
পুরুষ-স্ত্রী মিশ্র রেণু (PL) ছাড়া
শীতের আগে (অগ্রহায়ণ-পৌষ) চিংড়ি বিক্রি
এভাবে চাষের সময় সাধারণত ৬–৮ মাস।
কিন্তু অনেক সময় রেণু সময়মতো না পাওয়া, বা ব্যক্তিগত/প্রাকৃতিক কারণে রেণু ছাড়তে দেরি হলে চাষের সময় আরও কমে যায়। তখন অনেক চিংড়ি কাঙ্ক্ষিত গ্রেডে পৌঁছায় না—চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হন, অনেকে আগ্রহ হারান।
মনোসেক্স (বিশেষ করে all-male) চাষে একই সময়ে বড় ওজন পাওয়ার সুযোগ বেশি—ফলে স্বল্প সময়ের চাষেও তুলনামূলক ভালো গ্রেড ওঠে।
পুরুষ বনাম স্ত্রী গলদা: বৃদ্ধির পার্থক্য
পুরুষ গলদা সাধারণত দ্রুত বড় হয়
প্রাকৃতিকভাবে কোনো কোনো পুরুষ গলদা ৪০০–৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে দেখা গেছে
স্ত্রী গলদা তুলনামূলকভাবে ধীরে বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২০–১৫০ গ্রাম পর্যন্তই সীমিত থাকে
এই বাস্তব পার্থক্যই মনোসেক্স চাষের ভিত্তি।
মনোসেক্স গলদা চাষের “যুগোপযোগী” কলাকৌশল
১) ১০০% পুরুষ/স্ত্রী PL এখনো সাধারণভাবে সহজলভ্য নয়
বাস্তবে এখনও অনেক ক্ষেত্রে হ্যাচারিতে শতভাগ পুরুষ বা শতভাগ স্ত্রী PL ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায় না। তাই মনোসেক্স চাষ করতে গেলে সাধারণ কৌশল হলো—
প্রথমে নার্সারি → তারপর লিঙ্গ শনাক্ত করে আলাদা → এরপর গ্রো-আউট ঘেরে চাষ
২) নার্সারি অপরিহার্য (সরাসরি ঘেরে PL ছাড়া বড় ভুল)
অনেক চাষি নার্সারি না করে সরাসরি PL ঘেরে ছেড়ে দেন—এটা মোটেও ঠিক নয়।
কারণ:
মৃত্যুহার বেশি
বৃদ্ধি ধীর
“পিচ” (জুভেনাইল) হতে সময় বেশি লাগে
শেষ পর্যন্ত গ্রেডে ওঠে কম
ভালো নার্সারির লক্ষ্য: ২–৩ মাসের মধ্যে PL কে দ্রুত জুভেনাইল/পিচ বানানো।
নার্সারি স্টকিং ধারণা: সাধারণভাবে প্রতি শতকে প্রায় ১০০০টি PL (পরিস্থিতিভেদে কমবেশি হতে পারে)।
৩) উচ্চ প্রোটিন ও ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার
নার্সারিতে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে হলে ভাল মানের ফিড/সম্পূরক খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল খাবার দিলে পিচ হতে সময় বাড়ে—আর আপনার হাতে গ্রেডে তোলার সময় কমে যায়।
৪) লিঙ্গ শনাক্তকরণ ও আলাদা করা (এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
জুভেনাইল পর্যায়ে পুরুষ-স্ত্রী আলাদা করা কিছুটা অভিজ্ঞতা নির্ভর। তবু কিছু সহজ লক্ষণ—
পুরুষ গলদা
একই বয়সে আকারে বড় ও দ্রুত বাড়ে
দ্বিতীয় ভ্রমণপদ (দ্বিতীয় “বাহু”) লম্বা, মোটা, দাঁড়া বিশিষ্ট
শিরোবক্ষ (Cephalothorax) মোটা, উদর (Abdomen) তুলনামূলক সরু
জনন অঙ্গ পঞ্চম ভ্রমণপদের গোড়ায়
স্ত্রী গলদা
উদর তুলনামূলক চওড়া (ডিম ধারণে সুবিধা)
বাহু ছোট, মাথা অপেক্ষাকৃত ছোট
জনন অঙ্গ তৃতীয় ভ্রমণপদের গোড়ায়
পরিপক্ক স্ত্রীর মাথার নিচে/পার্শ্বে গোলাপি/কমলা আভা দেখা যেতে পারে
বাস্তবে—এই আলাদা করার কাজটি ভালোভাবে করতে পারলে মনোসেক্স চাষ সফল, না হলে মিশ্র হয়ে যাবে।
শুধু পুরুষ চাষের লাভ (All-male): চাষির জন্য সবচেয়ে লাভজনক রুট
১) আপ-গ্রেডেশন: দ্রুত ওজন বাড়ে → গ্রেডে ওঠে → দাম বাড়ে
২) মোট উৎপাদন বাড়ে: একই ঘেরে বেশি কেজি গলদা পাওয়ার সম্ভাবনা
শুধু স্ত্রী চাষ (All-female): ভবিষ্যৎ গলদা শিল্প বাঁচানোর “ব্রুড ব্যাংক”
এটা অনেকেই গুরুত্ব দেন না—কিন্তু বাস্তবতা হলো গলদা শিল্প টিকিয়ে রাখতে মানসম্মত ব্রুড (ডিমওয়ালা স্ত্রী) অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের দেশে এখনও অনেকখানি নির্ভরতা আছে প্রাকৃতিক উৎসের ওপর—যা জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সুতরাং মনোসেক্স (শুধু স্ত্রী) চাষ করে ভালো মানের ব্রুড তৈরি করে—হ্যাচারিভিত্তিক রেণু উৎপাদন শক্তিশালী করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প আরও টেকসই হবে।
মনোসেক্স বনাম মিশ্র চাষ: উৎপাদন-লাভের তুলনা
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে) প্রচলিত পদ্ধতিতে গলদার হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন সাধারণভাবে ৬০০–৭০০ কেজি (কখনও কম)।
কিন্তু একই আয়তনের দুইটি পুকুরে একই ব্যবস্থাপনায়—
মিশ্র (স্ত্রী-পুরুষ একত্রে): হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ≈ ৬৯০ কেজি
শুধু পুরুষ (মনোসেক্স): হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ≈ ১১৩০ কেজি
নীট মুনাফা (হেক্টরপ্রতি)
মিশ্র চাষ: ১,৯৫,৪২০ টাকা
মনোসেক্স পুরুষ: ৩,৪৯,০০০ টাকা
অর্থাৎ একই জমিতে উৎপাদন ও লাভ—দুইই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সফল মনোসেক্স গলদা চাষে ১০টি করণীয় (চেকলিস্ট)
PL সরাসরি ঘেরে না ছেড়ে নার্সারি করুন
নার্সারিতে উচ্চমানের খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করুন
সময় কম থাকলে PL ছাড়ায় দেরি না করে দ্রুত পিচ বানানোর পরিকল্পনা করুন
জুভেনাইল পর্যায়ে অভিজ্ঞ হাতে লিঙ্গ শনাক্ত করে আলাদা করুন
All-male চাষে গ্রেড লক্ষ্য করে সময়মতো স্যাম্পলিং করুন
পানি মান, অক্সিজেন, আশ্রয়স্থল, রোগব্যবস্থাপনা ঠিক রাখুন
অতিরিক্ত স্টকিং নয়—উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে মৃত্যুহার না বাড়ান
বাজারের গ্রেডিং বুঝে হারভেস্ট টাইমিং ঠিক করুন
বৃষ্টি/শীতের আগেই বাজারজাত করার প্রস্তুতি রাখুন
সম্ভব হলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে টেকনিক্যাল গাইডলাইন নিন
উপসংহার
গলদা চিংড়ি বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্প। কিন্তু টিকে থাকতে হলে এখন শুধু ঘের বাড়ানো নয়—ইউনিট প্রতি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। মনোসেক্স গলদা চাষ সেই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কৌশল।
চাষি পর্যায়ে প্রযুক্তি প্রদর্শন, প্রশিক্ষণ, নার্সারি-ভিত্তিক উন্নত ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা—এই চারটি জিনিস জোরদার হলে খুব দ্রুত গলদা উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।










0 comments:
মন্তব্য করুন