২০০০ সালে আমি বিভিন্ন হাওড়-বাওড় থেকে নানা আকারের প্রায় হাজার খানেক শোল মাছ সংগ্রহ করি প্রজননের উদ্দেশ্যে। এর আগে ১৯৯৮ সালে দেশি মাগুর, ১৯৯৯ সালে শিং, এবং ২০০০ সালে চিতল ও ফলি মাছের প্রজননে সফলতা পাই। শিং ও মাগুরের সফলতাই আমাকে শোল মাছ নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
১) শুরুতেই বড় ধাক্কা: শীতকাল, ক্ষত রোগ ও ব্যাপক মৃত্যু
ব্রুড শোল মাছগুলো পুকুরে মজুদ করার পরই দেখা দিল ক্ষত রোগ। তখন ছিল শীতকাল—শোল মাছে এ সময় ক্ষত রোগ এমনিতেই বেশি দেখা যায়। অনেক চিকিৎসা-পরিচর্যার পর মাছ সুস্থ হলেও হাজার খানেক মাছ থেকে মাত্র ৮০টির মতো কংকালসার মাছ টিকে রইল।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—
মাছ খাবার খাচ্ছিল না,
খাবার পানিতে পড়ে নষ্ট হতে হতে পানি নষ্ট হয়ে গেল,
অজানা পথে অনেক টাকার অপচয় হলো।
২) খাবারের রহস্য ভাঙা: “খাবার না জানলে ব্রুড বাঁচে না”
আমি শোল মাছগুলোকে পাকা পুকুরে স্থানান্তর করলাম। কিছু মাছ আরও মারা গেল। কোনভাবেই খাবার খাওয়ানো যাচ্ছিল না।
একদিন সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে বসে আছি—হঠাৎ একটি ছোট ব্যাঙ পুকুরে পড়ে গেল। সাথে সাথে কয়েকটি শোল মাছ দৌড়ে এসে মুহূর্তে ব্যাঙটি নিয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম—শোল মাছের স্বভাবগত খাবার কী ধরনের হতে পারে।
এরপর স্থানীয় খাল-বিল থেকে ছোট ব্যাঙ এনে পুকুরে ছাড়া হলো। শোল মাছগুলো ক্ষুধার্ত ছিল—খুব দ্রুত শিকার করে ফেলল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয়ও আসে:
আমি নিজেও তখন অনুশোচনা করেছি—এভাবে এত ব্যাঙ মারা ঠিক কি না। তাই বুঝেছি, শোলের খাবার “প্রকৃতিগত শিকারজাত” হলেও চাষ ব্যবস্থায় বিকল্প খাবারে অভ্যস্ত করানোই ভালো।
ব্যবহারিকভাবে শেখা কথা: শোল মাছকে বাঁচিয়ে ব্রুড বানাতে হলে শুরুতে উপযুক্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে ফিডে অভ্যস্ত করতে হবে (যেমন: শুটকি গুঁড়া/ফিশ পেস্ট/ট্র্যাশ ফিশ ইত্যাদি)। (বন্য ব্যাঙ সংগ্রহ অনেক এলাকায় আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে—স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা জরুরি।)
৩) বৈশাখে ডিম এল—কিন্তু “স্পার্ম” পেলাম না
নিয়মিত খাওয়ানোর ফলে মাছগুলো মোটাতাজা হলো। এরপর বৈশাখ মাসে মাছের পেটে ডিম আসে। প্রজননের জন্য ১ জোড়া পুরুষ ও ১ জোড়া স্ত্রী নির্বাচন করি।
আমি পি.জি. হরমোন দিয়ে দুইটি মাত্রায় ইনজেকশন দিলাম।
ডিম এল ঠিকই, কিন্তু সমস্যা হলো—পুরুষ মাছ থেকে স্পার্ম পাওয়া গেল না। তাড়াহুড়ো করে পুরুষ মাছের পেট কেটে টেস্টিজ বের করার চেষ্টা করলাম; কিন্তু শোল মাছের টেস্টিজের গঠন অন্যান্য মাছের মতো স্পষ্ট নয়—ফলে জটিলতা হলো।
৪) নতুন অভিজ্ঞতা: শোল মাছের ডিম পানিতে ভাসে!
ডিম-স্পার্ম মিশিয়ে বোতল জারে রাখলাম—দেখলাম ডিমগুলো ভেসে উঠছে।
এর আগে কখনও মাছের ডিম পানিতে ভাসতে দেখিনি। ভাবলাম ভাসলে বুঝি ফুটবে না—তাই ডিমগুলো সিস্টার্ণে নামিয়ে দিলাম এবং কিছু ডিমকে ফ্রেম বানিয়ে পানির নিচে আটকিয়ে রাখলাম।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ—
ডুবন্ত ডিমগুলো নষ্ট হয়ে গেল
আর যে ডিমগুলো ভাসমান ছিল, সেগুলো থেকে কিছু বাচ্চা পাওয়া গেল।
এটা ছিল আমার জন্য বড় শিক্ষা:
শোল মাছের ডিমের আচরণ/প্রকৃতি অন্য অনেক মাছের থেকে আলাদা।
৫) আসল সাফল্য: প্রাকৃতিকভাবে “বাইশ” দেখা ও পোনা সংগ্রহ
এরই মধ্যে যে পুকুর থেকে মাছগুলো প্রথমে ধরা হয়েছিল, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে ২টি “বাইশ” (শোল পোনার ঝাঁক) দেখতে পেলাম। তখনই পাকা পুকুরের মাছগুলোকে সেই পুরনো পুকুরে স্থানান্তর করি।
স্থানান্তরের ১৫ দিনের মধ্যে প্রচুর “বাইশ” দেখা দিতে লাগল। এরপর বাইশগুলোকে ঠেলে জাল দিয়ে ধরে একের পর এক সিস্টার্ণে তুলতে থাকলাম।
৬) পোনা খাবারে অভ্যস্ত করা: চিংড়ির শুটকি পাউডার
শুরুতে পোনাগুলোও খাবার খাচ্ছিল না। পরে চিংড়ির শুটকি ভালোভাবে পাউডার করে দিলে ধীরে ধীরে খেতে শুরু করে।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে পোনাগুলো শুটকি খেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
এভাবে মাত্র ১ মাসে প্রায় ২–৩ লক্ষ শোল মাছের পোনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল।
৭) এই অভিজ্ঞতা থেকে শেখা “মূল পয়েন্ট”
শোল ব্রুড সংগ্রহের পর শীতকালে ক্ষত রোগের ঝুঁকি খুব বেশি—সতর্ক প্রস্তুতি দরকার।
ব্রুডকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রথম কাজ হলো খাবারে আনা; না হলে পানি নষ্ট, রোগ, মৃত্যু—সব বাড়ে।
শোল মাছের ডিমের বৈশিষ্ট্য আলাদা—ভাসমান ডিম বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।
অনেক সময় কৃত্রিম প্রজননের চেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ দিলে প্রাকৃতিক প্রজনন বেশি সফল হতে পারে।
পোনা লালনে খাবারে অভ্যস্ত করানোই মূল চাবিকাঠি।
লেখক: এ. কে. এম. নূরুল হক
স্বত্বাধিকারী: ব্রহ্মপুত্র ফিস সীড কমপ্লেক্স (হ্যাচারি), শম্ভুগঞ্জ, ময়মনসিংহ










0 comments:
মন্তব্য করুন