Showing posts with label চিংড়ি ও কাঁকড়া. Show all posts
Showing posts with label চিংড়ি ও কাঁকড়া. Show all posts

এমটিটি চাষে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধি সম্ভব

এমটিটি (মডিফাইড ট্র্যাডিশনাল টেকনোলজি) অর্থাৎ উন্নত সনাতন চাষ কৌশল বা পরিবতিত সনাতন চাষ কৌশল। এমটিটি চিংড়ি চাষ কৌশলটি সনাতন চাষ এবং ভাল চাষ ব্যবস্থাপনা কৌশল (বিএমপি) এর চেয়ে উন্নত, আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক কৌশলের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত একটি ঝুঁকি বিহীন টেকসই চিংড়ি চাষ কৌশল।

২০০৬ সাল হতে ওয়ার্ল্ড ফিস, বাংলাদেশ সফলভাবে এমটিটি চিংড়ি চাষ কৌশল বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার চাষীদের মাঝে কারিগরি সহযোগীতা, প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রদর্শণী পুকুরের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে সফলভাবে চিংড়ি উৎপাদন করছে। বাগদা চিংড়ি চাষের মূল সমস্যা হচ্ছে ভাইরাস-এই পদ্ধতিতে কৌশলের পাশাপাশি পিসিআর পরীক্ষিত বাগদা চিংড়ির ভাইরাসমুক্ত পোনা মজুদ করা হয়, মজুদ ঘনত্ব সীমিত রাখা হয় এবং প্রতিদিন নিয়মিত গুণগত মান সম্পন্ন খাদ্য প্রয়োগ করা হয়।

চিংড়ি চাষের জন্য দুটি পুকুরের প্রয়োজন হয়। একটি চাষ পুকুর এবং অন্যটি নার্সারী পুকুর। সাধারণতঃ চাষ পুকুরের আয়তনের ১০-১৫ শতাংশ আয়তন বিশিষ্ট নার্সারী পুকুর হয়। ধরা যাক চাষ পুকুরের জলায়তন ১০০ শতক। সেক্ষেত্রে নার্সারী পুকুরের জলায়তন হবে ১০-১৫ শতক।

নার্সারী পুকুরের পাড় শক্ত মজবুত,দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত করা হয় যেন বাইরে থেকে দূষিত পানি ও রোগ জীবানু ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। শুধু নার্সারী পুকুরটির পাড় উঁচু নেট দ্বারা ঘিরে দেওয়া হয় যেন বাইরে থেকে সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, কুঁচে, কুকুর, বিড়াল বা মানুষ নার্সারীতে সহজে প্রবেশ করতে না পারে। পোনার মৃত্যুর ঝুঁকি এবং রোগবালাই প্রতিরোধের
জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বায়ো সিকিউরিটি (Bio-Security) বা জীব নিরাপত্তা বা জৈব নিরাপত্তা বলা হয়।

নার্সারী পুকুরটি নিয়ম মোতাবেক চুন, সার প্রয়োগ করে প্রস্তুত করা হয়। অত:পর ঘন ফাঁসের নেট দিয়ে ছেকে পানি প্রবেশ করানো হয়,পানির গভীরতা ৪-৫ ফুট বজায় রাখা হয়। পানি প্রবেশের ৪-৫ দিন পর ৬০ পিপিএম হারে পানিতে ব্লিচিং প্রয়োগ করে জীবানুমুক্ত করা হয়। ব্লিচিং প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর চুন, সার, চিটাগুড়, পালিশকুঁড়ো ও ইষ্ট পাউডার প্রয়োগে প্রাকৃতিক খাবার তৈরী করা হয়।
 পানির বিষাক্ততা পরীক্ষার পর নার্সারী পুকুরে রোগমুক্ত সুস্থ সবল পোনা মজুদ করা হয়। চাষ পুকুর  সঠিকভাবে চুন সার দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। চাষ পুকুরে সাধারণত: ব্লিচিং প্রয়োগ করা হয় না। তবে ১০ পিপিএম হারে ব্লিচিং প্রয়োগ করলে রোগ জীবানু ধ্বংস হয়ে যায় এবং ভাল ফল পাওয়া যায়। নার্সারী পুকুরে প্রতিশতকে ৫০০-৬০০ টি পোনা মজুদ করা হয় এবং পোনা মজুদের ২৫ দিন পর হতে পোনা আহরণ শুরু হয়।

চাষ পুকুরে গণনা করে পোনা মজুদ করা হয় এবং প্রতিশতকে ৫০-৬০টি, ২৫-৩৫ দিন বয়সের কিশোর চিংড়ি মজুদ করা হয়। পোনা মজুদের দিন হতেই প্রতিদিন নার্সারী ও চাষ পুকুর উভয় স্থানে গুণগতমান সম্পন্ন ৪০-৪৫ % প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োগ করা হয়। নার্সারী পুকুরে চিংড়ি পোনার বাঁচার হার ৮০-৮৫ % হয়ে থাকে এবং চাষ পুকুরে মজুদকৃত কিশোর চিংড়ির পোনার বাঁচার হার ৯০-৯৫ % হয়ে থাকে। নার্সারী পুকুরে ৬০০০টি পোনা মজুদ করা হলে, ৪৮০০-৫০০০টি কিশোর চিংড়ি চাষ পুকুরে (১০০ শতক) মজুদ করা যাবে এবং ৯০-১১০ দিন পর ৩৩-৩৫ গ্রাম ওজনের চিংড়ি আহরণ করা যায়।

এক্ষেত্রে নার্সারীতে ৩০-৩৫ দিন এবং চাষ পুকুরে ৯০-১১০ দিন, চাষের মেয়াদ কাল হবে ১২০-১৪০ দিন। চিংড়ির সম্ভাব্য উৎপাদন হবে প্রতি ফসলে ১৫০-১৬০ কেজি। বৎসরে ৩-৪ বার পোনা মজুদ করা যায়। বিগত কয়েক বৎসরের এমটিটি চাষের ফলাফলে ৪৫০ কেজি থেকে ৬৫০ কেজি চিংড়ি প্রতি বৎসর প্রতি একরে উৎপাদন হয়েছে।

বছরের শুরুতে ১৫ ফেব্রুয়ারী হতে ১লা মার্চের মধ্যে প্রথমবার, ১লা মে-এর মধ্যে দ্বিতীয়বার, ১লা জুলাই এর মধ্যে তৃতীয়বার সহজেই তিনবার পুকুর প্রস্তুত করে পোনা মজুদ করা যায়। অনেক চাষী ৪-৫ বার পোনা মজুদ করে থাকেন। কোন কোন চাষী চাষ পুকুরে পানির গভীরতা পর্যাপ্ত পরিমাণ থাকলে প্রথমবারেই বেশী করে পোনা মজুদ করে ৮-৯ মাস পর একবার চিংড়ি আহরণ করেন।

এমটিটি পদ্ধতি চিংড়ি চাষে ২০১৩ সালে প্রতিকেজি চিংড়ির (৩৩-৩৫ গ্রাম প্রতিটি চিংড়ি ৩০-২৮ পিচে কেজি) উৎপাদন ব্যয় হয়েছে (পুকুর প্রস্তুত হতে বিক্রি পর্যন্ত) ৩৩০-৩৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি চিংড়ি বিক্রি হয়েছে ৮০০-৮৫০ টাকা। প্রতি একরে সর্বনিম্ন উৎপাদন ৪৫০ কেজি হলে বৎসরে কমপক্ষে দুইলক্ষ টাকা শুধু চিংড়ি থেকে লাভ করা যায়। গলদা চিংড়ি ও অন্যান্য সাদা মাছ থেকে চাষীরা প্রতি একরে বৎসরে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রকৃত মুনাফা করে থাকেন।

এমটিটি কৌশলে প্রথমবারের চিংড়ি চাষে ব্যয় হয় ৬০,০০০-৭০,০০০ টাকা। প্রথমবার চিংড়ি আহরণের পর হতে, চিংড়ি বিক্রির টাকা থেকে ব্যয় নির্বাহ করা যায়। বর্তমানে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বৎসরে ১৫০-১৮০ কেজি প্রতি একরে। অপরদিকে এমটিটি চাষে উৎপাদন ৪৫০-৬৫০ কেজি প্রতি একরে। চাষীকে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত কারিগরি সহযোগীতা এবং ঋণ হিসাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান ।
পাশাপাশি পিসিআর পরীক্ষিত পোনা, গুণগত মান সম্পন্ন খাদ্য প্রাপ্তিতে সহায়তা করা হয় তবে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বর্তমান উৎপাদনের দ্বিগুণ করা সম্ভব খুব সহজেই।

মো: নাজমুল আলম
সিনিয়র টেকনিক্যাল স্পেশিয়ালিষ্ট
এ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম এন্ড নিউট্রিশন প্রকল্প

ওয়ার্ল্ডফিস, খুলনা-বাংলাদেশ।

আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষ

বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে স্বাদু পানির দ্রুত বর্ধনশীল চিংড়ির মধ্যে গলদা চিংড়ি অতি পরিচিত। প্রাকৃতিক পরিবেশে গলদা চিংড়ি স্বাদু পানি এবং ঈষৎ লবণাক্ত পানিতে পাওয়া যায়। তবে নদীর উঁচু অংশে যেখানে জোয়ার-ভাটার তারতম্য বেশি সেখানে এরা অবস্থান করতে বেশি পছন্দ করে। গলদা চিংড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কম্পুচিয়া, ভিয়েতনাম, অষ্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে পাওয়া যায়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গ্রীষ্ম মন্ডলীয় এবং আধা গ্রীষ্ম মন্ডলীয় দেশ সমূহের স্বাদু পানিতে পাওয়া যায়।

স্বাদু পানির চিংড়িকে প্রন (Prawn)  বলে। গলদা চিংড়ি বিশ্বে Giant Fresh water Prawn  নামে পরিচিত। গলদা চিংড়ি অমেরুদন্ডী, শীতলরক্ত বিশিষ্ট, খোলসে আবৃত নিশাচর সর্র্বভূক প্রাণী। খোলস পরিবর্তনের মাধ্যমে দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। পচনশীল জৈব পদার্থ, প্রাণী, উদ্ভিদকণা (Diatom, Copepod, Crustacea)  প্রভৃতি খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে। লার্ভা বা রেনু অবস্থায় এরা প্লাংক্টন ভোজী এবং বাচ্চা বা কিশোর ((Juvenile)  অবস্থায় পানির তলদেশের উদ্ভিদ ও প্রাণীজ খাদ্য গ্রহণ করে। পুরুষ গলদা, স্ত্রী গলদার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় হয় এবং দ্রুত বর্ধনশীল। এরা স্বজাতি ভোজী। খোলস পরিবর্তনের সময় নরম চিংড়িকে সুযোগ পেলে খেয়ে ফেলে।

গলদা চিংড়ি চাষের সুবিধা :
  • গলদা চিংড়ি দ্রুত বর্ধনশীল।
  • সুস্বাদু, কাটা বিহীন, সহজে রান্না করা যায়।
  • স্বাদু পানিতে এবং অল্প লবণাক্ত পানিতে (লবণাক্ততা ৫ পিপিটির কম) চাষ করা যায়।
  • বাংলাদেশের সর্বত্র চাষের সুযোগ রয়েছে।
  • একক ও মিশ্রচাষ (কার্প জাতীয় মাছ-রুই, কাতলা, মৃগেল এর সাথে) করা যায়।
  • প্রাকৃতিক উৎস ও হ্যাচারীতে উৎপাদিত রেনু পোনা বা পিএল পাওয়া যায়।
  • সর্বভূক প্রাণী, খাদ্য হিসাবে সহজে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করা যায়।
  • সম্পূরক খাদ্য তৈরীর উপাদান সহজে সংগ্রহ করা যায়।
  • বাজার মূল্য, চাহিদা বেশি এবং সহজে বিক্রয় করা যায়।
  • রোগ বালাই কম এবং চিকিৎসা করা যায়।


গলদা চিংড়ির চাষ পদ্ধতি :
আমাদের দেশে গলদা চিংড়ি সাধারণতঃ ২টি পদ্ধতিতে চাষীরা চাষ করে থাকেন।

১. একক চাষ পদ্ধতি : শুধুমাত্র গলদা চিংড়ির চাষ একক চাষ । একক চাষ পদ্ধতিতে প্রতি একরে ৬০০০-১০০০০টি গলদা রেনু পোনা মজুদ করা হয়। উৎপাদন প্রতি একরে ৪০০-৫০০ কেজি হয়ে থাকে।

২. মিশ্র চাষ পদ্ধতি : গলদা চিংড়ির সাথে রুই, কাতলা, মৃগেল জাতীয় মাছের চাষ করা হয়। মিশ্র চাষ পদ্ধতিতে প্রতি একরে ২০০০টি-৪০০০টি গলদা চিংড়ি রেনু এবং ২০০০-৫০০০টি কার্প জাতীয় মাছের পোনা মজুদ করা হয়। উৎপাদন প্রতি একরে চিংড়ি ২০০-৩০০ কেজি এবং কার্প জাতীয় মাছ ২০০০-২৫০০ কেজি হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ির চাষে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ির উৎপাদন প্রতি একরে ১২০০ থেকে ২৫০০ কেজি হয়েছে। আমাদের দেশে গলদা চিংড়ির আধুনিক চাষ গুটি কয়েক জন চাষী ছাড়া ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়নি। আধুনিক চাষের জন্য চাষ পুকুরের সাথে একটি নার্সারী পুকুর থাকা অত্যাবশ্যক।

নার্সারী পুকুরের আয়তন চাষ পুকুরের ২০ শতাংশ হওয়া ভাল। চাষ পুকুর এক একর ১০০ শতাংশ হওয়া ভাল। চাষ পুকুর এক একর ১০০ শতক হলে নার্সারী পুকুরের আয়তন হবে ২০ শতক। নার্সারী পুকুরটির পাড় শক্ত, মজবুত, দৃঢ়ভাবে মেরামত করতে হবে। পুকুরটির পানির গভীরতা থাকতে হবে ৪-৫ ফুট এবং তলা সমতর হতে হবে। পুকুরটির পাড়ের উপরের অংশ নেট দিয়ে ঘিরে দিতে হবে। নেট দিয়ে ঘিরে দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাইরে থেকে সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, কুঁচে, নার্সারী পুকুরের ভিতরে প্রবেশ করে রেনু পোনা খেতে না পারে। এছাড়া পুকুরের উপর দিয়ে রশি বা ফিতা ঘন ঘন করে টেনে দেওয়া হয় যেন পাখী পুকুরে নামতে না পারে। এর ফলে রেনু পোনার বাঁচার হার বৃদ্ধি পায় এবং রোগ জীবানুর আক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জীব নিরাপত্তা বা জৈব নিরাপত্তা বা বায়ো সিকিউরিটি (Bio-security)  বলে।

গলদা চিংড়ির রেনু পোনা প্রাপ্তি :
আমাদের দেশে প্রাকৃতিক উৎস- নদী এবং সাগরের মোহনা থেকে গলদার রেনু পাওয়া যায়। এছাড়া হ্যাচারীতে উৎপাদিত গলদার রেনযু পাওয়া যায়। বৎসরের শুরুতে চৈত্র-বৈশাখ মাসে (মার্চ-এপ্রিল) মাসে প্রথম রেনু পাওয়া যায়। বৎসরের শেষ দিক (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) পর্যন্ত গলদা রেনু পাওয়া যায়।


রেনু পোনা মজুদ :
প্রথম বার, বৎসরের শুরুতে রেনু পোনা সংগ্রহ করে নার্সারী পুকুরে মজুদ করা হয়। প্রতি শতকে ১০০০টি পোনা নার্সারীতে মজুদ করা যায়। নার্সারীতে রেনু পোনা ৬০-৭৫ দিন লালনের পর কিশোর গলদা চিংড়ির স্ত্রী, পুরুষ বাছাই করা যায়। চাষ পুকুরে শুধু পুরুষ কিশোর চিংড়ি মজুদ করা হয়, কারণ পুরুষ চিংড়ির বৃদ্ধি বেশি এবং দ্রুত হয়। কিশোর স্ত্রী চিংড়ির পৃথকভাবে একক চাষ করলে উৎপাদন মোটামুটি ভাল পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে চাষীর আরও পুকুর প্রয়োজন হয়। নতুবা চাষী করে দিতে পারেন কেজি অথবা পিচ হিসাবে। নার্সারী পুকুর হতে প্রথমবার কিশোর চিংড়ি আহরণ করে (চাষ পুকুরে মজুদের পর), পূণরায় নার্সারী পুুকুরটি প্রস্তুত করতে হবে। অতঃপর পূণরায় (দ্বিতীয়বার) রেনু পোনা মজুদ করতে হবে। এক একর বা ১০০ শতক চাষ পুকুরে কিশোর পুরুষ চিংড়ি মজুদের জন্য নার্সারীতে ২০,০০০টি রেনু পোনা মজুদ করা হয়। নার্সারী পুকুরে রেনু পোনা বাঁচার হার শতকরা ৮০%। মজুদকৃত রেনু পোনার শতকরা ৪০ % পুরুষ গলদা চিংড়ি পাওয়া যায়। নার্সারী পুকুরে ২০,০০০টি রেনু পোনা মজুদ করলে বাঁচার হার ৮০% হিসাবে ১৬,০০০টি কিশোর চিংড়ি পাওয়া যাবে, সেখান হতে ৬৪০০টি পুরুষ চিংড়ি পাওয়া যাবে। চাষ পুকুরে এক একর (১০০ শতকে) ৫০০০টি পুরুষ কিশোর চিংড়ি মজুদ করা হয়।

চাষ পুকুরে পুরুষ কিশোর গলদা চিংড়ি মজুদ :
জুন-জুলাই মাসে ২০-২৫ গ্রাম ওজনের ৫০০০টি পুরুষ কিশোর চিংড়ি মজুদ করা হয়। নভেম্বর মাস হতে আংশিক আহরণ শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে আহরণ শেষ করা হয়। জানুয়ারী মাসে চাষ পুকুর সেচ দিয়ে প্রস্তুত করা হয় এবং ফেব্রুয়ারী মাসের শেষে পূণরায় নার্সারী হতে (দ্বিতীয় বার মজুদ রেনুপোনা) পুরুষ কিশোর চিংড়ি ৩০-৩৫ গ্রাম ওজনের আহরণ করে মজুদ করা হয়, ৫০০০টি। পূণরায় জুন মাসে চিংড়ি আহরণ করা হয়। চাষ পুকুরে মজুদ কিশোর চিংড়ির বাঁচার হার শতকরা ৯০-৯৫% হয়ে থাকে। কোন চিংড়ির বৃদ্ধি কম হলে পরবর্তী সময়ে আহরণের জন্য রেখে দেওয়া হয়।
এই পদ্ধতিতে বৎসরে দুইবার চাষের ফলে প্রতি একরে ১০০০ থেকে ১২০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন করা যায়।

চাষ পুকুর ও নার্সারীতে সিলভার কার্প পোনা মজুদ :
পানির গুণাবলীর সাম্যবস্থা বজায় ও প্লাংক্টন সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য প্রতি একরে ৭০০-১০০০টি বড় আকৃতির (১৫০-২০০ গ্রাম ওজনের) সিলভার কার্প-এর পোনা মজুদ করা যায়। বৎসর শেষে প্রতিটি মাছের ওজন ১.০ কেজি- ১.৫ কেজি হয়ে থাকে। প্রতি একরে ৬০০-৭৫০ কেজি মাছ উৎপাদন করা যায়।

নার্সারী ও চাষ পুকুর প্রস্তুত :
নার্সারী ও চাষ পুকুর নিয়ম মোতাবেক সেচ দিয়ে শুকিয়ে তলার পঁচা কাঁদামাটি তুলে ফেলে প্রয়োজন মতো মাটিতে চুন, সার প্রয়োগ করা হয়। অতঃপর ঘন ফাঁসের নেট দিয়ে পানি ছেকে প্রবেশ করানো হয়। পানির গভীরতা নার্সারী পুকুরে পানির গভীরতা ১.২৯৫ মিটার এবং চাষ পুকুরে পানির গভীরতা ১.৫-১.৮ মিটার থাকা ভাল। গলদা চিংড়ি স্বজাতিভোজী। খোলস পরিবর্তনের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি, পিভিসি পাইপ, বিভিন্ন ধরণের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। পুরুষ গলদা চিংড়ির পা আকারে বড় হয় এবং অন্য চিংড়িকে সাড়াশি বা চিমটা দ্বারা আক্রমন করে ক্ষতিগ্রস্থ করে। প্রতি পনের দিন পর চিংড়ির পুকুরে বা ঘেরে জাল টেনে পা ভেঙ্গে দিতে হয়। পা ভেঙ্গে দেওয়ার ফলে অন্য চিংড়ি আক্রান্ত বা খাওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং চিংড়ির বৃদ্ধি বেশি হয়। পা নাড়ানোর জন্য দেহের ১৫-২০% শক্তি ব্যয় হয়।

গলদা চিংড়ির রোগ বালাই :
গলদা চিংড়ির পুকুরের পরিবেশ ঠিক থাকলে কোন রোগ বালাই হয় না। পরিবেশ নষ্ট হলে বিষাক্ত গ্যাসের কারণে চিংড়ি মারা যায়। এছাড়া এন্টেনা কাটা/ভাঙ্গা, লেজ পচা, গায়ে শেওলা হওয়া, মাতায় পানি জমা, মাথায় ক্রিমি হওয়া রোগ দেখা যায়। এসব রোগের সঠিক চিকিৎসা করা হলে চিংড়ি সুস্থ হয়ে যায়।

গলদা চিংড়ির উৎপাদন:
বর্তমানে গলদা চিংড়ির উৎপাদন বৎসরে ২০০-৩০০ কেজি প্রতি একরে। গলদা চিংড়ি এবং মাছ উৎপাদন করে চাষীরা প্রতি একরে ২,০০,০০০-২,৫০,০০০ টাকা লাভ করে থাকেন। আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষে প্রতি একরে ১০০০-১২০০ কেজি চিংড়ি এবং উপজাত হিসাবে ৭৫০-১০০০ কেজি মাছ উৎপাদন করা যায়। প্রতি কেজি গলদা চিংড়ি উৎপাদনে ব্যয় হয়ে থাকে ৩৮০-৪০০ টাকা। আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষ করে সহজে প্রতি একরে ৪,৫০,০০০-৫,০০,০০০ টাকা লাভ করা যায়। বাংলাদেশের সর্বত্র গলদা চিংড়ি চাষের সুযোগ রয়েছে।

মো: নাজমুল আলম
সিনিয়র টেকনিক্যাল স্পেশিয়ালিষ্ট
এ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম এন্ড নিউট্রিশন প্রকল্প
ওয়ার্ল্ডফিস, খুলনা-বাংলাদেশ।

পুকুরে গলদা চিংড়ির চাষে প্রচুর লাভ

স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ: লাভজনক চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড (একক ও মিশ্রচাষ)

আমিষভোজী মানুষের প্রিয় খাদ্য মাছ—আর মাছের পাশাপাশি চিংড়িও প্রায় একই কাতারে উচ্চারিত হয়। নানা ধরনের চিংড়ির মধ্যে গলদা চিংড়ি (Freshwater Giant Prawn) সবসময়ই বাজারে চাহিদাসম্পন্ন এবং দামও তুলনামূলক বেশি থাকে। অনেক সময় দাম এত বেশি হয় যে তা মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়—কিন্তু মাছচাষির কাছে এটি সুখবর, কারণ সঠিক প্রযুক্তি মেনে চাষ করতে পারলে গলদা চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি

স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চাষ এককভাবেও করা যায়, আবার রুই–কাতলা–গ্রাস কার্পের মতো উপরস্তরের মাছের সাথে মিশ্রচাষও করা যায়। তবে লাভ পেতে হলে মূল কথা একটাই—সঠিক পুকুর নির্বাচন, বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতি, সঠিক ঘনত্বে পোনা ছাড়ানো, নিয়মিত পানির গুণমান দেখা এবং খাবার ব্যবস্থাপনা।

নিচে স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চাষের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলো ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।

সতর্কতা: চুন/ইউরিয়া/এসএসপি/মহুয়া খোল প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ, পানির গভীরতা ও পুকুরের অবস্থাভেদে মাত্রা সামান্য ওঠানামা করতে পারে। প্রয়োগের সময় হাতে গ্লাভস/মাস্ক ব্যবহার এবং নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা উত্তম।


১) পুকুর নির্বাচন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)

গলদা চাষের জন্য উপযোগী পুকুরের বৈশিষ্ট্য—

  • আয়তন: সাধারণত ২–৩ বিঘা মাপের পুকুর সুবিধাজনক
  • আকার: আয়তাকার হলে ব্যবস্থাপনা সহজ
  • তলদেশ: পাঁক/অতিরিক্ত কাদা কম, তলদেশ সমতল হওয়া ভালো
  • পানির গভীরতা: প্রায় ১.৫–২.০ মিটার
  • পানির স্থায়িত্ব: পানি একেবারে শুকিয়ে যায় কি না—এটা জানা জরুরি (কারণ প্রস্তুতি পদ্ধতি ভিন্ন হবে)


২) পুকুর প্রস্তুতি (দুই রকম পরিস্থিতি)

ক) যেসব পুকুর শুকিয়ে যায় (Dryable Pond)

১) পুকুর প্রস্তুতির শুরুতে—

  • একরপ্রতি ১০০–২০০ কেজি চুন ছিটিয়ে
  • পুকুরের তলদেশে চাষ/কোদাল দিয়ে নেড়ে দিন

২) কয়েকদিন রোদ খাইয়ে—

  • প্রথমে ১ ফুট গভীরতায় পানি ঢোকান

৩) সার প্রয়োগ (প্রাথমিক উৎপাদন/শ্যাওলা তৈরিতে):

  • ৩০–৩৫ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট (SSP)
  • ১৫ কেজি ইউরিয়া (একরপ্রতি)

৪) এরপর ১০–১৫ দিন পুকুর ফেলে রাখুন

  • এতে পর্যাপ্ত শ্যাওলা/প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হবে

৫) শেষে প্রয়োজনীয় উচ্চতা পর্যন্ত পানি ভরে মজুদ (স্টকিং) করুন।


খ) যেসব পুকুর শুকায় না (Perennial Pond)

১) অবাঞ্ছিত মাছ/জীব নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতি:

  • প্রতি একরে প্রতি ফুট পানির গভীরতার জন্য ৩০০ কেজি মহুয়া খোল প্রয়োগ

২) ৫–৭ দিন পর

  • একরপ্রতি ১০০–২০০ কেজি চুন প্রয়োগ

৩) মহুয়া খোল দেওয়ার ১০–১৫ দিন পরে

  • ৩০ কেজি SSP

  • ১০ কেজি ইউরিয়া (একরপ্রতি)

৪) মহুয়া খোল দেওয়ার ২০–২২ দিন পরে

  • প্রয়োজনীয় উচ্চতায় পানি দিন এবং পোনা ছাড়ুন




৩) পোনা মজুদ (একক চাষ ও মিশ্রচাষ)

✅ একক চাষ (Only Golda)

  • একরপ্রতি ১০–১২ হাজার পোস্ট-লার্ভা (PL) ছাড়তে হবে

  • পোনার দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০–১৫ মিমি হলে ভালো

এরিয়েটর থাকলে (অতি-ঘন চাষ)

  • একরপ্রতি ২০–২৫ হাজার পর্যন্ত মজুদ করা যায়

  • তবে পানির অক্সিজেন, খাবার ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে


✅ মিশ্রচাষ (Golda + কার্প)

  • একরপ্রতি ৬,০০০টি গলদা চারা

  • এবং ১,৫০০–১,৮০০টি পোনা মাছ (দৈর্ঘ্য ১০–১৫ সেমি হলে ভালো)

এরিয়েটর থাকলে

  • এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা যায় (ব্যবস্থাপনা শক্ত হতে হবে)

কোন মাছ দেবেন?

  • গলদার সাথে রুই, কাতলা, গ্রাস কার্প দেওয়া ভালো

  • তলদেশে বসবাসকারী মাছ (বটম ফিডার) না দেওয়াই উত্তম
    কারণ গলদা নিজেই তলদেশে থাকে—প্রতিযোগিতা/ধাক্কাধাক্কি বাড়তে পারে


৪) পোনা ছাড়ার পর পরিচর্যা ও পানির মান

✅ জৈব সার কেন দেবেন না?

গলদা চাষের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে জৈব সার (গোবর/কম্পোস্ট ইত্যাদি) দেওয়া ঠিক নয়, কারণ—

  • এতে পানি ঘোলা হয়
  • দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) কমে যেতে পারে
  • ফলে গলদা মড়ক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়

✅ নিয়মিত চুন ও রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনা

  • প্রতি মাসে একবার একরপ্রতি ২৫ কেজি চুন প্রয়োগ

  • চুন দেওয়ার এক সপ্তাহ পরে

    • একরপ্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া

    • একরপ্রতি ২০ কেজি SSP
      পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিন

✅ পানি পরিবর্তন

  • প্রতি ২–৩ সপ্তাহ অন্তর

  • পুকুরের ১০–১৫% পানি বের করে নতুন/শুদ্ধ পানি ঢোকান
    এতে গ্যাস কমে, পানি সতেজ থাকে

✅ স্বাস্থ্য পরীক্ষা

  • প্রতি ১৫ দিন অন্তর জাল টেনে

    • গলদার বৃদ্ধি, খোলস বদল, দাগ/ক্ষত, দুর্বলতা

    • মাছের স্বাস্থ্য
      পর্যবেক্ষণ করুন


৫) খাদ্য ব্যবস্থাপনা (লাভের চাবিকাঠি)

✅ গলদা চিংড়ির খাবার

  • পেলেট ফিড দেওয়া সবচেয়ে ভালো

  • খাবারে কমপক্ষে ৩০% প্রোটিন থাকা উচিত

খাবারের হার (স্টক অনুযায়ী)

  • শুরুর দিকে: মোট মজুদ গলদার ওজনের ১০%

  • ধীরে ধীরে কমিয়ে: ৫% পর্যন্ত আনুন

দিনে কখন দেবেন?

খাবার ২ ভাগে দিন—

  • সন্ধ্যায়: মোট খাবারের ৩/৪ অংশ

  • সকালে: মোট খাবারের ১/৪ অংশ
    (গলদা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে—তাই সন্ধ্যায় বেশি দেওয়া হয়)


✅ পোনা মাছের খাবার

  • মোট মাছের ওজনের ২% হারে দিন
  • সম পরিমাণ চালের কুঁড়া + সরিষা/বাদাম খোল মিশিয়ে খাদ্য বানানো যায়
  • মাছের খাবার সাধারণত সকালে একবারে দেওয়া হয়


৬) অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা (বিশেষ সতর্ক সময়)

মাঝরাতের পরে ও মেঘলা দিনে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যেতে পারে। লক্ষণ হতে পারে—

  • গলদা/মাছ পানির উপর ঘেঁষে ঘোরাঘুরি
  • অস্বাভাবিক নড়াচড়া
  • খাবার গ্রহণ কমে যাওয়া

✅ এসব হলে এরিয়েটর চালানো দরকার।


৭) উৎপাদন ও লাভের সম্ভাবনা 

একক চাষ (৬ মাসে)

  • একরপ্রতি ১২,০০০ গলদা মজুদ করলে
  • ৬ মাসে প্রতি গলদা ৪০–৬০ গ্রাম হতে পারে
  • ৮০% বাঁচার হার হলে ফলন ≈ ৪৮০ কেজি/একর

এরিয়েটরসহ অতি-ঘন চাষ

  • একরপ্রতি ২৪,০০০ গলদা মজুদ করলে ফলন ≈ ৯৬০ কেজি/একর
  • আয় হতে পারে ≈ ৬,৭২,০০০ টাকা

মিশ্রচাষ

  • একরপ্রতি ৬,০০০ গলদা + ১,৮০০ পোনা মাছ মজুদ করলে

    • গলদা ≈ ৩৩৬ কেজি

    • মাছ ≈ ৭ কুইন্টাল

  • এরিয়েটর থাকলে ঘনত্ব বাড়িয়ে দ্বিগুণ ফলন সম্ভব (ভালো ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষে)

খরচ–লাভ

  • মোট আয়ের ৩৫–৪০% ব্যয়
  • ফলে প্রকৃত লাভ ৬০–৬৫% পর্যন্ত হতে পারে
  • নিবিড় ব্যবস্থাপনায় ৬ মাসে একবার, বছরে ২টি ফলন নেওয়ার সুযোগও থাকে


শেষ কথা

স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ নিঃসন্দেহে লাভজনক—কিন্তু লাভ নিশ্চিত করতে হলে পুকুর প্রস্তুতি, ঘনত্ব, অক্সিজেন ও খাবার ব্যবস্থাপনা—এই চারটি জায়গায় নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। একক চাষ হোক বা মিশ্রচাষ—সঠিক প্রযুক্তি মেনে চললেই কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া সম্ভব।

প্রকল্প : গলদা চিংড়ি



গলদা চিংড়ি চাষের পরামর্শপত্র
পকুরের জলায়তন
শতক= . বিঘা= একর
ক্রমিক নং কাজের বিবরন সম্ভাব্য ব্যয়
ব্যয়
মজুদ পূর্ব ব্যবস্থাপনা
জমির ইজারা মূল্য , প্রতি শতকের মূল্য ১৫০/= টাকা হিসাবে টাকা
পুকুর প্রস্তুতি পানি ব্যবস্থাপনা, প্রতি শতকে ৫০/= টাকা হিসাবে টাকা
চুন প্রয়োগ প্রতি শতকে ১০/= টাকা হিসাবে টাকা
মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা
জুভিনাইল মজুদ (শতকে ১০০ হারে শুধু পুরষ) প্রতিটির মূল্য ৭/= টাকা দরে টাকা
কাতলা পোনা মজুদ (শতকে ২ টি ৪-৫ ইঞ্চি) , প্রতিটি ৩/= টাকা দরে টাকা
মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা
খাদ্য প্রদান (এফসিআর ২ হিসাবে ) টাকা
শ্রমিক, পাহারাদার ইত্যাদি ২ জন, ২০০০/= টাকা দরে টাকা
সব্জি বাগান শতকে ৫০/= টাকা দরে টাকা
অন্যান্য ব্যয়, পরিচালনা ব্যয়, নিরাপত্তা বেষ্টণী তৈরী ইত্যাদি টাকা
মোট ব্যয় টাকা
আয়
(ক) চিংড়ি বিক্রি (শতকে ৬ কেজি মাছ উৎপাদিত হবে ৬ মাসে যার মূল্য হবে , বিক্রয় মূল্য ৪০০ টাকা দরে) টাকা
(খ) সবজি বাগান থেকে আয় হবে, প্রতি শতকে ৫০/= টাকা আয় ধরে টাকা
মোট আয় টাকা
বৎসরে ২ টি ফসল থেকে আয় হবে ৪৯৪০০০ টাকা

কাঁকড়া থেকে কোটি টাকা আয়

কাঁকড়া। একেবারেই অবহেলিত এক জলজ প্রাণী। অবহেলিত এই কাঁকড়াই খুলে দিতে পারে দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার। কারণ বিদেশে এই কাঁকড়ার চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া। সঠিক পরিকল্পনা নিলে এ পণ্য বদলে দিতে পারে লাখো মানুষের ভাগ্য। কাঁকড়া রপ্তানি করে এখন প্রতিবছর গড়ে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। দিন দিন যে হারে চাহিদা বাড়ছে তাতে সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত চিংড়িকেও হার মানাতে পারে এই জলজ সম্পদ-এমনটাই মনে করছেন কাঁকড়া চাষিরা। কাঁকড়া রপ্তানি করে বছরে হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এখন প্রয়োজন শুধু সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের কাঁকড়া বাজারজাত করতে প্রতিমাসে পুলিশকে দিতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এ টাকা না দিলে পথেই পচে নষ্ট হয় শত শত টন কাঁকড়া। অন্যদিকে রপ্তানিকারকরাও প্রতিনিয়ত নানারকম ভোগান্তির শিকার হন। সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার পরও হয়রানির শিকার হন তারা। রপ্তানির ছাড়পত্র নিতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে উৎকোচ। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে কাঁকড়া মৎস্য সম্পদ হলেও এটি রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেয় বন বিভাগ। সম্ভাবনাময় কাঁকড়া শিল্প নিয়ে অনুসন্ধানের সময় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।অবশ্য মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেছেন, কাঁকড়া একটি সম্ভাবনাময় খাত। এ জন্য এটিকে একটি নীতিমালা ও সমন্বয়ের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 


মাছের সংজ্ঞার মধ্যেই কাঁকড়ার কথা বলা হয়েছে। এটিকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করতে শীঘ্রই উদ্যোগ নেওয়া হবে।যেভাবে শুরু : বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সরকারিভাবে এটি কোনো রপ্তানি পণ্য হিসেবে গণ্য হয়নি। ১৫ বছর ধরে রপ্তানি হতো মূলত প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাঁকড়া। চাষিরা নদী, সাগর, ডোবা, জলাশয় থেকে কাঁকড়া আহরণ করে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে সেগুলো রাজধানীতে পাঠাতেন। রপ্তানিকারকরা সেগুলো নিজেদের মতো করে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো শুধু প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাঁকড়াই বিক্রি করছেন না চাষিরা বরং চাষ করা কাঁকড়াও রপ্তানি করছেন।বছরে আয় ৪০০ কোটি টাকা : কাঁকড়া হচ্ছে চিংড়ির মতোই সুস্বাদু। দেশের বাজারে এর তেমন কোনো চাহিদা না থাকলেও বিদেশের বাজারে চাহিদা ব্যাপক। যার ফলে দেশে আহরিত কাঁকড়ার সবগুলোই রপ্তানি হয়। তবে এই কাঁকড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারি কোনো রকম সহযোগিতা নেই। 

জানা গেছে, বছরের চার মাস অর্থাৎ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময় হচ্ছে কাঁকড়ার ভরা মৌসুম। ওই সময়ে চাষি পর্যায়ে প্রতি কেজি কাঁকড়া প্রকারভেদে বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। আর অফ-পিক মৌসুমে প্রতি কেজি বিক্রি হয় প্রকারভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। খুলনার পাইকগাছা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি অধিবাস দাস বলেন, এলাকায় কাঁকড়া চাষ করে কয়েক হাজার লোক জীবিকা নির্বাহ করে। তারা প্রতিদিন রাজধানীতে কাঁকড়া পাঠান। কাঁকড়া বিক্রি করে অনেকে সংসারে সচ্ছলতা এনেছে। জানা গেছে, রাজধানীতে মোট ৫০ থেকে ৫২ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা কাঁকড়া রপ্তানি করেন। উত্তরা এলাকার খালপাড়েই বসে কাঁকড়ার আড়ত। মূলত এখান থেকে কাঁকড়া প্যাকেজিং হয়। বিদেশে কাঁকড়ার প্রধান বাজার হচ্ছে চীন, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, হংকং এবং সিঙ্গাপুর। এর বাইরে আরও কয়েকটি দেশে কাঁকড়া রপ্তানির কথাবার্তা চলছে। 

ক্ষুদ্র রপ্তানিকারক দীপংকর জানান, ভরা মৌসুমে প্রতি মাসে গড়ে ২২০ থেকে ২৫০ টন কাঁকড়া রপ্তানি করেন। আর মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ টন রপ্তানি করা হয়। কিন্তু রপ্তানিতে সরকারি পর্যায়ে কোনো রকম সহযোগিতা নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেন দীপংকর। কাঁকড়া রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড ফুড এঙ্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক গাজী আবুল হাশেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তাদের অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে মোট ১১৫ জন্য সদস্য রয়েছেন। বর্তমানে কাঁকড়া রপ্তানিতে সক্রিয় রয়েছে ৫০ থেকে ৫২ জন্য সদস্য। সবাই মিলে প্রতিদিন সাত থেকে আট টন কাঁকড়া রপ্তানি করেন। চাহিদা আরও বেশি থাকলেও নানা সমস্যার কারণে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে অসহযোগিতাই রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় বাধা। মৎস্য অধিদফতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত তিন বছরে কাঁকড়া রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। তবে এ পরিসংখ্যান পুরো চিত্র তুলে ধরছে না বলে জানান, মৎস্য অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা।

কাঁকড়া চাষ ও আহরণ : দেশের উকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি, বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ, কঙ্বাজারের মহেশখালী, কঙ্বাজার সদর, টেকনাফ, চকোরিয়া, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম সদর, সীতাকুণ্ডু, সন্দীপ এলাকায় কাঁকড়া চাষ ও আহরণ হচ্ছে। এ ছাড়াও বরিশাল, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের কিছু এলাকায়ও কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে চাষিরা নদী, সাগর, খাল-বিল, ডোবা থেকে কাঁকড়া আহরণ করে হ্যাচারিতে নিয়ে মোটাতাজা করে বাজারজাত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব এলাকায় বাণিজ্যিকভাবেও কাঁকড়ার চাষ বেড়েছে। খুলনা অঞ্চলে কাঁকড়ার অন্তত তিন হাজার হ্যাচারি গড়ে ওঠেছে। যেখানে কাজ করছে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক। একইভাবে দেশের অন্য এলাকাগুলোতেও আরও অন্তত এক হাজার হ্যাচারি গড়ে ওঠেছে। শুধু উপকূলীয় এলাকাতেই কাঁকড়া চাষ ও বিক্রির সঙ্গে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ দরিদ্র মানুষ জড়িত।

সম্ভাবনা প্রচুর সমস্যা অনেক : সম্ভাবনাময় এই খাতের সঙ্গে জড়িতদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রতি পদে পদে। চাষিরা কোনো রকম সরকারি সহযোগিতা কিংবা ব্যাংক ঋণ পান না। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের মৎস্য সম্পদের তালিকায় থাকলেও বাস্তবে এর জন্য মাঠপর্যায়ে মৎস্য বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। আবার উৎপাদিত বা আহরণ করে আনা কাঁকড়া রাজধানীতে পেঁৗছাতে প্রথম ধাক্কা সামাল দিতে হয় চাষিদেরকে। খুলনা, সাতক্ষীরা কিংবা কঙ্বাজার থেকে ট্রাক ভর্তি কাঁকড়া নিয়ে রাজধানীতে পেঁৗছতে পেঁৗছতে চাষিকে রাস্তায় গুনতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। রপ্তানিকারকরা বললেন, রপ্তানি ছাড়পত্র নিতে গিয়েই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। রপ্তানিকারক গাজী আবুল হাশেম বলেন, কাঁকড়া মৎস্য সম্পদ হলেও এটিকে দেওয়া হয়েছে বন বিভাগের অধীনে। আর বন বিভাগ থেকে ছাড়পত্র আনতে গেলে তারা নানা অজুহাতে সময় নষ্ট করে। তখন এই কাঁচামালটি নষ্ট হতে থাকে। তিনি বলেন, রপ্তানিকারকদের তখন বাধ্য হয়ে ঘুষের বিনিময়ে ছাড়পত্র আনতে হয়। অথচ প্রতি কেজি কাঁকড়া রপ্তানিতে সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছি তিন টাকা।

পুকুরে রুই-কাতলার পাশাপাশি গলদা চিংড়ি

স্বাদু পানিতে গলদা চিংড়ির চাষ ভালো হয়। পুকুরে রুই-কাতলা মাছের সঙ্গেও গলদা চিংড়ি চাষ করা যায়। চিংড়ি সাধারণত পুকুরের তলায় যেসব খাদ্য পায় তাই খেয়ে থাকে। চিংড়ি চাষের পুকুরে অধিক অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় বলে মাঝেমধ্যে পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হয়। তাই সাধারণত যেখানে নদী, খাল-বিল, ঝরনা, গভীর বা অগভীর নলকূপ হতে সহজে প্রয়োজনীয় পানি দেয়া যায়—এ রকম স্থানে পুকুর তৈরি করা উত্তম। এটেল মাটি ও দোঁআশ মাটিতে পুকুর তৈরি করা সুবিধাজনক। কারণ, এ ধরনের মাটির পাড় বা বাঁধ শক্ত ও মজবুত হয় এবং পানি চুঁইয়ে যেতে পারে না।
পুরাতন পুকুরে চিংড়ি চাষ করতে হলে পুকুরের আবর্জনা, ময়লা, কচুরিপানা, কলমী লতা, হেলেঞ্চা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে। পুকুরপাড়, গাছপালা এবং আগাছামুক্ত হলে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ও বাতাস চলাচল অতিপ্রয়োজন। গলদা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে পুকুরের গভীরতা সাধারণত ১-১.৫ মিটার (৩-৪ ফুট) হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুকুরপাড় এমনভাবে উঁচু করতে হবে যাতে পানি গড়িয়ে পুকুরে না আসতে পারে। কারণ, বৃষ্টির পানি গড়িয়ে এলে পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে পানির ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে বাধা সৃষ্টি করে, এতে পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হবে না। যে কোনো আকারের (সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ) পুকুরে চিংড়ি চাষ করা যায়। তবে ব্যবস্থাপনা সুবিধার জন্য আয়তকার পুকুরে চিংড়ি চাষ করা উত্তম।

পুকুর প্রস্তুতি
ক. চাষের শুরুতেই তৈরি করে নিতে হয়। পুকুর তৈরি করতে হলে প্রথমেই পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হবে। পুকুর শুকালে রাক্ষুসে মাছ দূর হবে। তাছাড়া পুকুরের তলদেশে জমে থাকা ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে যাবে। পুকুর শুকালে পুকুরের তলদেশে সূর্যের আলো পড়বে। পুকুর শুকানো না গেলে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৩ গ্রাম হারে রোটেনন পাউডার পানিতে গুলে তা পুকুরের সব অংশে ছিটিয়ে দিতে হবে। রোটেনন ব্যবহারের আগে পানি কমিয়ে নিলে রোটেননের পরিমাণও আনুপাতিক হারে কম লাগবে।

খ. মাটির প্রকারভেদে চুন প্রয়োগের মাত্রা কম-বেশি হয়। নতুন পুকুর বা অম্লীয় মাটিযুক্ত (লাল মাটি) পুকুরে চুনের মাত্রা বেশি প্রয়োজন হয়। সাধারণত পুকুরে শতাংশপ্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিতে হয়।
গ. পুকুরে চুন দেয়ার ৬-৭ দিন পর শতাংশপ্রতি ৫-৭ কেজি পচানো গোবর বা ৩-৪ কেজি মুরগির বিষ্ঠা, ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি এবং ২০ গ্রাম এমপি সরবরাহ করতে হয়। পুকুরে সার দেয়ার পর অল্প পরিমাণ পানি সরবরাহ করলে তাতে সার পচে ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়ে যাবে এবং মাছের খাদ্য তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপাদান বের হয়ে আসবে। এভাবে সার পচানোর পর পানির গভীরতা বাড়িয়ে ১-১.৫ মিটার (৩-৪ ফুট) করা যেতে পারে।
ঘ. পুকুরে সার দেয়ার ৭-৮ দিন পর চিংড়ির পোনা মজুদ করতে হবে। পুকুরের মাটির উর্বরতা, পানির গুণাগুণ সম্পূরক খাদ্য ও পুকুর ব্যবস্থাপনার সুযোগ-সুবিধার ওপর পোনা মজুদের হার নির্ভরশীল। পুকুরে এককভাবে গলদা চিংড়ির চাষে সাধারণত একরে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজারটি পোনা ছাড়া যাবে। যেসব পুকুরে উত্তম পানি ব্যবস্থাপনার সুযোগসহ উন্নতমানের খাবার ব্যবহার করা হবে, সেখানে আরও অধিক হারে চিংড়ির পোনা মজুদ করা যাবে। তা ছাড়া পুকুরের পানির পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য শতাংশে ৫টি সিলভার কার্প ও ৫টি কাতলার পোনা মজুদ করলে ভালো হয়।
সম্পূরক খাবার সরবরাহ : চাষের জন্য পুকুরে যে কম্পোষ্ট সার প্রয়োগ করা হয় তা থেকে উত্পন্ন খাবার মাছের মতো চিংড়িও খেয়ে থাকে। তবে এদের বৃদ্ধির জন্য আলাদাভাবে তৈরি খাবার দিলে খুবই সুফল পাওয়া যায়। নিম্নলিখিত উপাদান দিয়ে চিংড়ির সুষম সম্পূরক খাদ্য তৈরি করা যায়। যেমন—১. চালের কুঁড়া/গমের ভুসি, ২. খৈল (সরিষা/সয়াবিন/তিল/তিষি), ৩. ফিস মিল, ৪. শামুক-ঝিনুকের খোলসের গুঁড়া, ৫. লবণ, ৬. ভিটামিন মিশ্রণ।

খাদ্য ব্যবহারের পরিমাণ : পুকুরে মজুদকৃত চিংড়িকে দৈনিক ২ বার (সূর্যোদয়ের পর ও সূর্যাস্তের আগে) তাদের ওজনের শতকরা ৩-৫ ভাগ হারে খাবার দেয়াই যথেষ্ট।

সার ব্যবহার : পুকুরে সম্পূরক খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি সার দেয়া প্রয়োজন। রুই জাতীয় মাছ চাষের মতো একই নিয়মে পুকুরে সার ব্যবহার করতে হয়। একর প্রতি বছরে ১০০-১৫০ কেজি ইউরিয়া, ৫০-৭০ কেজি টিএসপি এবং ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কেজি গোবর ব্যবহার করতে হয়। এসব সার মাসিক ভাগ করে কিস্তিতে দুই সপ্তাহ পরপর পুকুরে সরবরাহ করতে হয়। শীতকালে সার দেয়ার প্রয়োজন নেই। পুকুরে সার প্রয়োগের মাত্রা, মাটির উর্বরতা শক্তি, পুকুরের জৈব অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই সার ব্যবহারের হার অবস্থাভেদে পরিবর্তনশীল। পুকুরে অতিরিক্ত প্লাঙ্কটন জন্মালে সার ও খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। চিংড়ির খোলস পাল্টানোর সময় অন্য কোনো প্রাণী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য পুকুরে কিছু পাতাবিহীন ডালপালা এবং বাঁশ পুঁতে দেয়া প্রয়োজন। এতে চিংড়ি আশ্রয় নিতে পারবে।

চিংড়ি ধরা ও বাজারজাতকরণ : 
চিংড়ি ৬-৭ মাসের মধ্যে বাজারজাতকরণের উপযুক্ত হয়। এ সময় ১৫-২০টিতে ১ কেজি ওজনের হলে চিংড়ি ধরে বাজারজাত করা যায়। বড় ফাঁস জাল ব্যবহার করে শুধু বড় আকৃতির চিংড়ি ধরে ফেলতে হয়। ছোট চিংড়ি কিছু দিন রেখে বাজারজাত করার উপযুক্ত হলে পুকুর শুকিয়ে সব চিংড়ি ধরে ফেলতে হয়।