এমটিটি চাষে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধি সম্ভব
আধুনিক পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষ
- গলদা চিংড়ি দ্রুত বর্ধনশীল।
- সুস্বাদু, কাটা বিহীন, সহজে রান্না করা যায়।
- স্বাদু পানিতে এবং অল্প লবণাক্ত পানিতে (লবণাক্ততা ৫ পিপিটির কম) চাষ করা যায়।
- বাংলাদেশের সর্বত্র চাষের সুযোগ রয়েছে।
- একক ও মিশ্রচাষ (কার্প জাতীয় মাছ-রুই, কাতলা, মৃগেল এর সাথে) করা যায়।
- প্রাকৃতিক উৎস ও হ্যাচারীতে উৎপাদিত রেনু পোনা বা পিএল পাওয়া যায়।
- সর্বভূক প্রাণী, খাদ্য হিসাবে সহজে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করা যায়।
- সম্পূরক খাদ্য তৈরীর উপাদান সহজে সংগ্রহ করা যায়।
- বাজার মূল্য, চাহিদা বেশি এবং সহজে বিক্রয় করা যায়।
- রোগ বালাই কম এবং চিকিৎসা করা যায়।
পুকুরে গলদা চিংড়ির চাষে প্রচুর লাভ
স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ: লাভজনক চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড (একক ও মিশ্রচাষ)
আমিষভোজী মানুষের প্রিয় খাদ্য মাছ—আর মাছের পাশাপাশি চিংড়িও প্রায় একই কাতারে উচ্চারিত হয়। নানা ধরনের চিংড়ির মধ্যে গলদা চিংড়ি (Freshwater Giant Prawn) সবসময়ই বাজারে চাহিদাসম্পন্ন এবং দামও তুলনামূলক বেশি থাকে। অনেক সময় দাম এত বেশি হয় যে তা মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়—কিন্তু মাছচাষির কাছে এটি সুখবর, কারণ সঠিক প্রযুক্তি মেনে চাষ করতে পারলে গলদা চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি।
স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চাষ এককভাবেও করা যায়, আবার রুই–কাতলা–গ্রাস কার্পের মতো উপরস্তরের মাছের সাথে মিশ্রচাষও করা যায়। তবে লাভ পেতে হলে মূল কথা একটাই—সঠিক পুকুর নির্বাচন, বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতি, সঠিক ঘনত্বে পোনা ছাড়ানো, নিয়মিত পানির গুণমান দেখা এবং খাবার ব্যবস্থাপনা।
নিচে স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চাষের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলো ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
সতর্কতা: চুন/ইউরিয়া/এসএসপি/মহুয়া খোল প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ, পানির গভীরতা ও পুকুরের অবস্থাভেদে মাত্রা সামান্য ওঠানামা করতে পারে। প্রয়োগের সময় হাতে গ্লাভস/মাস্ক ব্যবহার এবং নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা উত্তম।
১) পুকুর নির্বাচন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
গলদা চাষের জন্য উপযোগী পুকুরের বৈশিষ্ট্য—
- আয়তন: সাধারণত ২–৩ বিঘা মাপের পুকুর সুবিধাজনক
- আকার: আয়তাকার হলে ব্যবস্থাপনা সহজ
- তলদেশ: পাঁক/অতিরিক্ত কাদা কম, তলদেশ সমতল হওয়া ভালো
- পানির গভীরতা: প্রায় ১.৫–২.০ মিটার
- পানির স্থায়িত্ব: পানি একেবারে শুকিয়ে যায় কি না—এটা জানা জরুরি (কারণ প্রস্তুতি পদ্ধতি ভিন্ন হবে)
২) পুকুর প্রস্তুতি (দুই রকম পরিস্থিতি)
ক) যেসব পুকুর শুকিয়ে যায় (Dryable Pond)
১) পুকুর প্রস্তুতির শুরুতে—
- একরপ্রতি ১০০–২০০ কেজি চুন ছিটিয়ে
- পুকুরের তলদেশে চাষ/কোদাল দিয়ে নেড়ে দিন
২) কয়েকদিন রোদ খাইয়ে—
-
প্রথমে ১ ফুট গভীরতায় পানি ঢোকান
৩) সার প্রয়োগ (প্রাথমিক উৎপাদন/শ্যাওলা তৈরিতে):
- ৩০–৩৫ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট (SSP)
- ১৫ কেজি ইউরিয়া (একরপ্রতি)
৪) এরপর ১০–১৫ দিন পুকুর ফেলে রাখুন
-
এতে পর্যাপ্ত শ্যাওলা/প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হবে
৫) শেষে প্রয়োজনীয় উচ্চতা পর্যন্ত পানি ভরে মজুদ (স্টকিং) করুন।
খ) যেসব পুকুর শুকায় না (Perennial Pond)
১) অবাঞ্ছিত মাছ/জীব নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতি:
-
প্রতি একরে প্রতি ফুট পানির গভীরতার জন্য ৩০০ কেজি মহুয়া খোল প্রয়োগ
২) ৫–৭ দিন পর
-
একরপ্রতি ১০০–২০০ কেজি চুন প্রয়োগ
৩) মহুয়া খোল দেওয়ার ১০–১৫ দিন পরে
-
৩০ কেজি SSP
-
১০ কেজি ইউরিয়া (একরপ্রতি)
৪) মহুয়া খোল দেওয়ার ২০–২২ দিন পরে
-
প্রয়োজনীয় উচ্চতায় পানি দিন এবং পোনা ছাড়ুন
৩) পোনা মজুদ (একক চাষ ও মিশ্রচাষ)
✅ একক চাষ (Only Golda)
-
একরপ্রতি ১০–১২ হাজার পোস্ট-লার্ভা (PL) ছাড়তে হবে
-
পোনার দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০–১৫ মিমি হলে ভালো
এরিয়েটর থাকলে (অতি-ঘন চাষ)
-
একরপ্রতি ২০–২৫ হাজার পর্যন্ত মজুদ করা যায়
-
তবে পানির অক্সিজেন, খাবার ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে
✅ মিশ্রচাষ (Golda + কার্প)
-
একরপ্রতি ৬,০০০টি গলদা চারা
-
এবং ১,৫০০–১,৮০০টি পোনা মাছ (দৈর্ঘ্য ১০–১৫ সেমি হলে ভালো)
এরিয়েটর থাকলে
-
এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা যায় (ব্যবস্থাপনা শক্ত হতে হবে)
কোন মাছ দেবেন?
-
গলদার সাথে রুই, কাতলা, গ্রাস কার্প দেওয়া ভালো
-
তলদেশে বসবাসকারী মাছ (বটম ফিডার) না দেওয়াই উত্তম
কারণ গলদা নিজেই তলদেশে থাকে—প্রতিযোগিতা/ধাক্কাধাক্কি বাড়তে পারে
৪) পোনা ছাড়ার পর পরিচর্যা ও পানির মান
✅ জৈব সার কেন দেবেন না?
গলদা চাষের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে জৈব সার (গোবর/কম্পোস্ট ইত্যাদি) দেওয়া ঠিক নয়, কারণ—
- এতে পানি ঘোলা হয়
- দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) কমে যেতে পারে
- ফলে গলদা মড়ক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়
✅ নিয়মিত চুন ও রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনা
-
প্রতি মাসে একবার একরপ্রতি ২৫ কেজি চুন প্রয়োগ
-
চুন দেওয়ার এক সপ্তাহ পরে
-
একরপ্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া
-
একরপ্রতি ২০ কেজি SSP
পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিন
-
✅ পানি পরিবর্তন
-
প্রতি ২–৩ সপ্তাহ অন্তর
-
পুকুরের ১০–১৫% পানি বের করে নতুন/শুদ্ধ পানি ঢোকান
এতে গ্যাস কমে, পানি সতেজ থাকে
✅ স্বাস্থ্য পরীক্ষা
-
প্রতি ১৫ দিন অন্তর জাল টেনে
-
গলদার বৃদ্ধি, খোলস বদল, দাগ/ক্ষত, দুর্বলতা
-
মাছের স্বাস্থ্য
পর্যবেক্ষণ করুন
-
৫) খাদ্য ব্যবস্থাপনা (লাভের চাবিকাঠি)
✅ গলদা চিংড়ির খাবার
-
পেলেট ফিড দেওয়া সবচেয়ে ভালো
-
খাবারে কমপক্ষে ৩০% প্রোটিন থাকা উচিত
খাবারের হার (স্টক অনুযায়ী)
-
শুরুর দিকে: মোট মজুদ গলদার ওজনের ১০%
-
ধীরে ধীরে কমিয়ে: ৫% পর্যন্ত আনুন
দিনে কখন দেবেন?
খাবার ২ ভাগে দিন—
-
সন্ধ্যায়: মোট খাবারের ৩/৪ অংশ
-
সকালে: মোট খাবারের ১/৪ অংশ
(গলদা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে—তাই সন্ধ্যায় বেশি দেওয়া হয়)
✅ পোনা মাছের খাবার
- মোট মাছের ওজনের ২% হারে দিন
- সম পরিমাণ চালের কুঁড়া + সরিষা/বাদাম খোল মিশিয়ে খাদ্য বানানো যায়
- মাছের খাবার সাধারণত সকালে একবারে দেওয়া হয়
৬) অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা (বিশেষ সতর্ক সময়)
মাঝরাতের পরে ও মেঘলা দিনে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যেতে পারে। লক্ষণ হতে পারে—
- গলদা/মাছ পানির উপর ঘেঁষে ঘোরাঘুরি
- অস্বাভাবিক নড়াচড়া
- খাবার গ্রহণ কমে যাওয়া
✅ এসব হলে এরিয়েটর চালানো দরকার।
৭) উৎপাদন ও লাভের সম্ভাবনা
একক চাষ (৬ মাসে)
- একরপ্রতি ১২,০০০ গলদা মজুদ করলে
- ৬ মাসে প্রতি গলদা ৪০–৬০ গ্রাম হতে পারে
- ৮০% বাঁচার হার হলে ফলন ≈ ৪৮০ কেজি/একর
এরিয়েটরসহ অতি-ঘন চাষ
- একরপ্রতি ২৪,০০০ গলদা মজুদ করলে ফলন ≈ ৯৬০ কেজি/একর
- আয় হতে পারে ≈ ৬,৭২,০০০ টাকা
মিশ্রচাষ
-
একরপ্রতি ৬,০০০ গলদা + ১,৮০০ পোনা মাছ মজুদ করলে
-
গলদা ≈ ৩৩৬ কেজি
-
মাছ ≈ ৭ কুইন্টাল
-
-
এরিয়েটর থাকলে ঘনত্ব বাড়িয়ে দ্বিগুণ ফলন সম্ভব (ভালো ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষে)
খরচ–লাভ
- মোট আয়ের ৩৫–৪০% ব্যয়
- ফলে প্রকৃত লাভ ৬০–৬৫% পর্যন্ত হতে পারে
- নিবিড় ব্যবস্থাপনায় ৬ মাসে একবার, বছরে ২টি ফলন নেওয়ার সুযোগও থাকে
শেষ কথা
স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ নিঃসন্দেহে লাভজনক—কিন্তু লাভ নিশ্চিত করতে হলে পুকুর প্রস্তুতি, ঘনত্ব, অক্সিজেন ও খাবার ব্যবস্থাপনা—এই চারটি জায়গায় নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। একক চাষ হোক বা মিশ্রচাষ—সঠিক প্রযুক্তি মেনে চললেই কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া সম্ভব।
প্রকল্প : গলদা চিংড়ি
| পকুরের জলায়তন | |||||
| শতক= | ৩.০৩ | বিঘা= | ১ | একর | |
| ক্রমিক নং | কাজের বিবরন | সম্ভাব্য ব্যয় | |||
| ব্যয় | |||||
| মজুদ পূর্ব ব্যবস্থাপনা | |||||
| ১ | জমির ইজারা মূল্য , প্রতি শতকের মূল্য ১৫০/= টাকা হিসাবে | ১৫০০০ | টাকা | ||
| ২ | পুকুর প্রস্তুতি পানি ব্যবস্থাপনা, প্রতি শতকে ৫০/= টাকা হিসাবে | ৫০০০ | টাকা | ||
| ৩ | চুন প্রয়োগ প্রতি শতকে ১০/= টাকা হিসাবে | ১০০০ | টাকা | ||
| মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা | |||||
| ১ | জুভিনাইল মজুদ (শতকে ১০০ হারে শুধু পুরষ) প্রতিটির মূল্য ৭/= টাকা দরে | ৭০০০০ | টাকা | ||
| ২ | কাতলা পোনা মজুদ (শতকে ২ টি ৪-৫ ইঞ্চি) , প্রতিটি ৩/= টাকা দরে | ৬০০ | টাকা | ||
| মজুদ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা | |||||
| ১ | খাদ্য প্রদান (এফসিআর ২ হিসাবে ) | ৬০০০০ | টাকা | ||
| ২ | শ্রমিক, পাহারাদার ইত্যাদি ২ জন, ২০০০/= টাকা দরে | ৪৮০০০ | টাকা | ||
| ৩ | সব্জি বাগান | শতকে ৫০/= টাকা দরে | ৫০০০ | টাকা | |
| ৪ | অন্যান্য ব্যয়, পরিচালনা ব্যয়, নিরাপত্তা বেষ্টণী তৈরী ইত্যাদি | ১৫০০০ | টাকা | ||
| মোট ব্যয় | ২১৯৬০০ | টাকা | |||
| আয় | |||||
| (ক) | চিংড়ি বিক্রি (শতকে ৬ কেজি মাছ উৎপাদিত হবে ৬ মাসে যার মূল্য হবে , বিক্রয় মূল্য ৪০০ টাকা দরে) | ২৪০০০০ | টাকা | ||
| (খ) | সবজি বাগান থেকে আয় হবে, প্রতি শতকে ৫০/= টাকা আয় ধরে | ৭০০০ | টাকা | ||
| মোট আয় | ২৪৭০০০ | টাকা | |||
| বৎসরে ২ টি ফসল থেকে আয় হবে | ৪৯৪০০০ | টাকা | |||
কাঁকড়া থেকে কোটি টাকা আয়
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের কাঁকড়া বাজারজাত করতে প্রতিমাসে পুলিশকে দিতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এ টাকা না দিলে পথেই পচে নষ্ট হয় শত শত টন কাঁকড়া। অন্যদিকে রপ্তানিকারকরাও প্রতিনিয়ত নানারকম ভোগান্তির শিকার হন। সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার পরও হয়রানির শিকার হন তারা। রপ্তানির ছাড়পত্র নিতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে উৎকোচ। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে কাঁকড়া মৎস্য সম্পদ হলেও এটি রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেয় বন বিভাগ। সম্ভাবনাময় কাঁকড়া শিল্প নিয়ে অনুসন্ধানের সময় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।অবশ্য মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেছেন, কাঁকড়া একটি সম্ভাবনাময় খাত। এ জন্য এটিকে একটি নীতিমালা ও সমন্বয়ের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাছের সংজ্ঞার মধ্যেই কাঁকড়ার কথা বলা হয়েছে। এটিকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করতে শীঘ্রই উদ্যোগ নেওয়া হবে।যেভাবে শুরু : বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সরকারিভাবে এটি কোনো রপ্তানি পণ্য হিসেবে গণ্য হয়নি। ১৫ বছর ধরে রপ্তানি হতো মূলত প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাঁকড়া। চাষিরা নদী, সাগর, ডোবা, জলাশয় থেকে কাঁকড়া আহরণ করে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে সেগুলো রাজধানীতে পাঠাতেন। রপ্তানিকারকরা সেগুলো নিজেদের মতো করে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো শুধু প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাঁকড়াই বিক্রি করছেন না চাষিরা বরং চাষ করা কাঁকড়াও রপ্তানি করছেন।বছরে আয় ৪০০ কোটি টাকা : কাঁকড়া হচ্ছে চিংড়ির মতোই সুস্বাদু। দেশের বাজারে এর তেমন কোনো চাহিদা না থাকলেও বিদেশের বাজারে চাহিদা ব্যাপক। যার ফলে দেশে আহরিত কাঁকড়ার সবগুলোই রপ্তানি হয়। তবে এই কাঁকড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারি কোনো রকম সহযোগিতা নেই।
জানা গেছে, বছরের চার মাস অর্থাৎ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময় হচ্ছে কাঁকড়ার ভরা মৌসুম। ওই সময়ে চাষি পর্যায়ে প্রতি কেজি কাঁকড়া প্রকারভেদে বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। আর অফ-পিক মৌসুমে প্রতি কেজি বিক্রি হয় প্রকারভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। খুলনার পাইকগাছা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি অধিবাস দাস বলেন, এলাকায় কাঁকড়া চাষ করে কয়েক হাজার লোক জীবিকা নির্বাহ করে। তারা প্রতিদিন রাজধানীতে কাঁকড়া পাঠান। কাঁকড়া বিক্রি করে অনেকে সংসারে সচ্ছলতা এনেছে। জানা গেছে, রাজধানীতে মোট ৫০ থেকে ৫২ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা কাঁকড়া রপ্তানি করেন। উত্তরা এলাকার খালপাড়েই বসে কাঁকড়ার আড়ত। মূলত এখান থেকে কাঁকড়া প্যাকেজিং হয়। বিদেশে কাঁকড়ার প্রধান বাজার হচ্ছে চীন, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, হংকং এবং সিঙ্গাপুর। এর বাইরে আরও কয়েকটি দেশে কাঁকড়া রপ্তানির কথাবার্তা চলছে।
ক্ষুদ্র রপ্তানিকারক দীপংকর জানান, ভরা মৌসুমে প্রতি মাসে গড়ে ২২০ থেকে ২৫০ টন কাঁকড়া রপ্তানি করেন। আর মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ টন রপ্তানি করা হয়। কিন্তু রপ্তানিতে সরকারি পর্যায়ে কোনো রকম সহযোগিতা নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেন দীপংকর। কাঁকড়া রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড ফুড এঙ্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক গাজী আবুল হাশেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তাদের অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে মোট ১১৫ জন্য সদস্য রয়েছেন। বর্তমানে কাঁকড়া রপ্তানিতে সক্রিয় রয়েছে ৫০ থেকে ৫২ জন্য সদস্য। সবাই মিলে প্রতিদিন সাত থেকে আট টন কাঁকড়া রপ্তানি করেন। চাহিদা আরও বেশি থাকলেও নানা সমস্যার কারণে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে অসহযোগিতাই রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় বাধা। মৎস্য অধিদফতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত তিন বছরে কাঁকড়া রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। তবে এ পরিসংখ্যান পুরো চিত্র তুলে ধরছে না বলে জানান, মৎস্য অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা।
কাঁকড়া চাষ ও আহরণ : দেশের উকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি, বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ, কঙ্বাজারের মহেশখালী, কঙ্বাজার সদর, টেকনাফ, চকোরিয়া, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম সদর, সীতাকুণ্ডু, সন্দীপ এলাকায় কাঁকড়া চাষ ও আহরণ হচ্ছে। এ ছাড়াও বরিশাল, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের কিছু এলাকায়ও কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে চাষিরা নদী, সাগর, খাল-বিল, ডোবা থেকে কাঁকড়া আহরণ করে হ্যাচারিতে নিয়ে মোটাতাজা করে বাজারজাত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব এলাকায় বাণিজ্যিকভাবেও কাঁকড়ার চাষ বেড়েছে। খুলনা অঞ্চলে কাঁকড়ার অন্তত তিন হাজার হ্যাচারি গড়ে ওঠেছে। যেখানে কাজ করছে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক। একইভাবে দেশের অন্য এলাকাগুলোতেও আরও অন্তত এক হাজার হ্যাচারি গড়ে ওঠেছে। শুধু উপকূলীয় এলাকাতেই কাঁকড়া চাষ ও বিক্রির সঙ্গে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ দরিদ্র মানুষ জড়িত।
সম্ভাবনা প্রচুর সমস্যা অনেক : সম্ভাবনাময় এই খাতের সঙ্গে জড়িতদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রতি পদে পদে। চাষিরা কোনো রকম সরকারি সহযোগিতা কিংবা ব্যাংক ঋণ পান না। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের মৎস্য সম্পদের তালিকায় থাকলেও বাস্তবে এর জন্য মাঠপর্যায়ে মৎস্য বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। আবার উৎপাদিত বা আহরণ করে আনা কাঁকড়া রাজধানীতে পেঁৗছাতে প্রথম ধাক্কা সামাল দিতে হয় চাষিদেরকে। খুলনা, সাতক্ষীরা কিংবা কঙ্বাজার থেকে ট্রাক ভর্তি কাঁকড়া নিয়ে রাজধানীতে পেঁৗছতে পেঁৗছতে চাষিকে রাস্তায় গুনতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। রপ্তানিকারকরা বললেন, রপ্তানি ছাড়পত্র নিতে গিয়েই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। রপ্তানিকারক গাজী আবুল হাশেম বলেন, কাঁকড়া মৎস্য সম্পদ হলেও এটিকে দেওয়া হয়েছে বন বিভাগের অধীনে। আর বন বিভাগ থেকে ছাড়পত্র আনতে গেলে তারা নানা অজুহাতে সময় নষ্ট করে। তখন এই কাঁচামালটি নষ্ট হতে থাকে। তিনি বলেন, রপ্তানিকারকদের তখন বাধ্য হয়ে ঘুষের বিনিময়ে ছাড়পত্র আনতে হয়। অথচ প্রতি কেজি কাঁকড়া রপ্তানিতে সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছি তিন টাকা।
পুকুরে রুই-কাতলার পাশাপাশি গলদা চিংড়ি
পুরাতন পুকুরে চিংড়ি চাষ করতে হলে পুকুরের আবর্জনা, ময়লা, কচুরিপানা, কলমী লতা, হেলেঞ্চা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে। পুকুরপাড়, গাছপালা এবং আগাছামুক্ত হলে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ও বাতাস চলাচল অতিপ্রয়োজন। গলদা চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে পুকুরের গভীরতা সাধারণত ১-১.৫ মিটার (৩-৪ ফুট) হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুকুরপাড় এমনভাবে উঁচু করতে হবে যাতে পানি গড়িয়ে পুকুরে না আসতে পারে। কারণ, বৃষ্টির পানি গড়িয়ে এলে পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে পানির ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে বাধা সৃষ্টি করে, এতে পুকুরে প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হবে না। যে কোনো আকারের (সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ) পুকুরে চিংড়ি চাষ করা যায়। তবে ব্যবস্থাপনা সুবিধার জন্য আয়তকার পুকুরে চিংড়ি চাষ করা উত্তম।
পুকুর প্রস্তুতি
ক. চাষের শুরুতেই তৈরি করে নিতে হয়। পুকুর তৈরি করতে হলে প্রথমেই পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হবে। পুকুর শুকালে রাক্ষুসে মাছ দূর হবে। তাছাড়া পুকুরের তলদেশে জমে থাকা ক্ষতিকর বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে যাবে। পুকুর শুকালে পুকুরের তলদেশে সূর্যের আলো পড়বে। পুকুর শুকানো না গেলে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৩ গ্রাম হারে রোটেনন পাউডার পানিতে গুলে তা পুকুরের সব অংশে ছিটিয়ে দিতে হবে। রোটেনন ব্যবহারের আগে পানি কমিয়ে নিলে রোটেননের পরিমাণও আনুপাতিক হারে কম লাগবে।
খ. মাটির প্রকারভেদে চুন প্রয়োগের মাত্রা কম-বেশি হয়। নতুন পুকুর বা অম্লীয় মাটিযুক্ত (লাল মাটি) পুকুরে চুনের মাত্রা বেশি প্রয়োজন হয়। সাধারণত পুকুরে শতাংশপ্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিতে হয়।
গ. পুকুরে চুন দেয়ার ৬-৭ দিন পর শতাংশপ্রতি ৫-৭ কেজি পচানো গোবর বা ৩-৪ কেজি মুরগির বিষ্ঠা, ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি এবং ২০ গ্রাম এমপি সরবরাহ করতে হয়। পুকুরে সার দেয়ার পর অল্প পরিমাণ পানি সরবরাহ করলে তাতে সার পচে ক্ষতিকর গ্যাস বের হয়ে যাবে এবং মাছের খাদ্য তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপাদান বের হয়ে আসবে। এভাবে সার পচানোর পর পানির গভীরতা বাড়িয়ে ১-১.৫ মিটার (৩-৪ ফুট) করা যেতে পারে।
ঘ. পুকুরে সার দেয়ার ৭-৮ দিন পর চিংড়ির পোনা মজুদ করতে হবে। পুকুরের মাটির উর্বরতা, পানির গুণাগুণ সম্পূরক খাদ্য ও পুকুর ব্যবস্থাপনার সুযোগ-সুবিধার ওপর পোনা মজুদের হার নির্ভরশীল। পুকুরে এককভাবে গলদা চিংড়ির চাষে সাধারণত একরে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজারটি পোনা ছাড়া যাবে। যেসব পুকুরে উত্তম পানি ব্যবস্থাপনার সুযোগসহ উন্নতমানের খাবার ব্যবহার করা হবে, সেখানে আরও অধিক হারে চিংড়ির পোনা মজুদ করা যাবে। তা ছাড়া পুকুরের পানির পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য শতাংশে ৫টি সিলভার কার্প ও ৫টি কাতলার পোনা মজুদ করলে ভালো হয়।
সম্পূরক খাবার সরবরাহ : চাষের জন্য পুকুরে যে কম্পোষ্ট সার প্রয়োগ করা হয় তা থেকে উত্পন্ন খাবার মাছের মতো চিংড়িও খেয়ে থাকে। তবে এদের বৃদ্ধির জন্য আলাদাভাবে তৈরি খাবার দিলে খুবই সুফল পাওয়া যায়। নিম্নলিখিত উপাদান দিয়ে চিংড়ির সুষম সম্পূরক খাদ্য তৈরি করা যায়। যেমন—১. চালের কুঁড়া/গমের ভুসি, ২. খৈল (সরিষা/সয়াবিন/তিল/তিষি), ৩. ফিস মিল, ৪. শামুক-ঝিনুকের খোলসের গুঁড়া, ৫. লবণ, ৬. ভিটামিন মিশ্রণ।
খাদ্য ব্যবহারের পরিমাণ : পুকুরে মজুদকৃত চিংড়িকে দৈনিক ২ বার (সূর্যোদয়ের পর ও সূর্যাস্তের আগে) তাদের ওজনের শতকরা ৩-৫ ভাগ হারে খাবার দেয়াই যথেষ্ট।
সার ব্যবহার : পুকুরে সম্পূরক খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি সার দেয়া প্রয়োজন। রুই জাতীয় মাছ চাষের মতো একই নিয়মে পুকুরে সার ব্যবহার করতে হয়। একর প্রতি বছরে ১০০-১৫০ কেজি ইউরিয়া, ৫০-৭০ কেজি টিএসপি এবং ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কেজি গোবর ব্যবহার করতে হয়। এসব সার মাসিক ভাগ করে কিস্তিতে দুই সপ্তাহ পরপর পুকুরে সরবরাহ করতে হয়। শীতকালে সার দেয়ার প্রয়োজন নেই। পুকুরে সার প্রয়োগের মাত্রা, মাটির উর্বরতা শক্তি, পুকুরের জৈব অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই সার ব্যবহারের হার অবস্থাভেদে পরিবর্তনশীল। পুকুরে অতিরিক্ত প্লাঙ্কটন জন্মালে সার ও খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। চিংড়ির খোলস পাল্টানোর সময় অন্য কোনো প্রাণী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য পুকুরে কিছু পাতাবিহীন ডালপালা এবং বাঁশ পুঁতে দেয়া প্রয়োজন। এতে চিংড়ি আশ্রয় নিতে পারবে।
চিংড়ি ধরা ও বাজারজাতকরণ :













