মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: পুকুর প্রস্তুতকরণ
পুরনো পুকুর হলে এবং তা ভরাট হয়ে গেলে বা পাড় ভেঙে গেলে আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নিতে হবে। সাধারণত কাজগুলো দুইভাবে করা হয়—
১) তলার কাদা উত্তোলন
পুকুর ভরাট হয়ে থাকলে তলার কাদা তুলে ফেলতে হবে। এতে—
বিষাক্ত গ্যাস কমে
ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও পোকা-মাকড় দূর হয়
পুকুরের পরিবেশ উন্নত হয়
২) পাড় মেরামত
পুকুরের পাড় ভেঙে গেলে বর্ষায় মাছ ভেসে যেতে পারে। তাই পুরনো পুকুরে পাড় ভেঙে থাকলে তা মেরামত করা জরুরি।
৩) জলজ আগাছা দমন
পুকুর প্রস্তুতির শুরুতেই পুকুরের পাড়ে ও ভেতরে থাকা সব আগাছা শিকড়সহ পরিষ্কার করতে হবে। উপায়—
(ক) কায়িক শ্রমে পরিষ্কার
নিজেরা বা শ্রমিক লাগিয়ে কচুরীপানা, কলমিলতা, হেলেঞ্চা ইত্যাদি ভাসমান আগাছা পরিষ্কার করা যায়। এতে খরচ ও সময় কম লাগে।
(খ) পুকুর সেচে পরিষ্কার
পুকুর সেচে তলার/কিনারের/শিকড়গাড়া সব আগাছা পরিষ্কার করা সুবিধাজনক। তলার সামান্য মাটিসহ আগাছাও তুলে ফেলা যায়।
(গ) জৈবিক পদ্ধতি
চাষকালীন আগাছা দমনে গ্রাসকার্প ও সরপুঁটি (নরম জলজ উদ্ভিদভোজী মাছ) মজুদ করলে আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: রাক্ষুসে ও অবাঞ্চিত মাছ/প্রাণী দূরীকরণ
১) পানি নিষ্কাশন করে শুকানো
পুকুরে সেচ দিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে রাক্ষুসে মাছ ও ক্ষতিকর প্রাণী অপসারণ করা যায়। এতে তারা কাদায় লুকিয়ে থাকতে পারে না। শুকালে পরে আবার পানি ঢোকানো যায়।
২) জাল টেনে ধরা (যদি পুকুর শুকানো না যায়)
ঘন ফাঁসের জাল দিয়ে রাক্ষুসে মাছ ও ক্ষতিকর প্রাণী ধরে ফেলতে হবে।
জালের নিচ দিয়ে যাতে বেরিয়ে না যায়, তাই জালের নিচের অংশে ইট/ভারী বস্তু বেঁধে ধীরে ধীরে জাল টানতে হবে।
৩) রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার
নির্ধারিত তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগে সুফল পাওয়া যায় এবং রোগজীবাণুও ধ্বংস হতে পারে।
রাক্ষুসে মাছ ও ক্ষতিকর প্রাণী দমনে রাসায়নিক (টেবিল)
| রাসায়নিক দ্রব্য | প্রয়োগ মাত্রা | প্রয়োগ পদ্ধতি | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| সুমিথিয়ন | প্রতি ঘনমিটার পানিতে ০.৪ গ্রাম | রোদের সময় পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে | কয়েক মিনিটের মধ্যে রাক্ষুসে মাছ/ক্ষতিকর প্রাণী ভেসে ওঠে |
| রোটেনন পাউডার | প্রতি ১ ফুট পানির গভীরতায় প্রতি শতাংশে ২০–২৫ গ্রাম | মোট রোটেননের ১/৩ অংশ দিয়ে বল বানিয়ে + ২/৩ অংশ বালতিতে গুলে রোদের সময় সারা পুকুরে ছিটিয়ে প্রয়োগ | — |
মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: চুন
প্রকার: পাথুরে চুন, কলি চুন
পরিমাণ: প্রতি শতাংশে ১.০–১.৫ কেজি
প্রয়োগ: চুন গুঁড়া করে পানিতে/পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে
পানি ভরাট: চুন প্রয়োগের পরে পুকুরে পানি প্রবেশ করাতে হবে
মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: সার
প্রকার: গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি
পরিমাণ (শতাংশ প্রতি):
গোবর ৮.০ কেজি
ইউরিয়া ২০০ গ্রাম
টিএসপি ২০০ গ্রাম
প্রয়োগ: চুন প্রয়োগের ৪–৫ দিন পরে পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে
মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ
পোনা মজুদের আগে পুকুরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য (প্ল্যাঙ্কটন) হয়েছে কিনা পরীক্ষা করতে হবে। কয়েকটি পদ্ধতি—
১) সেকিডিস্ক পদ্ধতি
সেকিডিস্ক: ব্যাস ৮ ইঞ্চি, সাদা-কালো রঙের চাকতি; সুতার সাথে ঝুলানো থাকে। সুতার প্রথম ১০ সেমি লাল, পরের ১৫ সেমি সবুজ, বাকিটা সাদা (৮০–১০০ সেমি)।
ব্যবহার:
লাল দাগ পর্যন্ত ডুবিয়ে চাকতির সাদা অংশ না দেখা গেলে ⇒ প্রাকৃতিক খাদ্য অতিরিক্ত (ঘন সবুজ পানি)। এই অবস্থায় পোনা মজুদ/সার/সম্পূরক খাদ্য নয়।
সবুজ দাগ পর্যন্ত ডুবিয়ে চাকতির সাদা অংশ না দেখা গেলে ⇒ প্রাকৃতিক খাদ্য পরিমিত। পোনা ছাড়া যাবে, তবে অবস্থা বজায় রাখতে নিয়মিত কিছু সার ও খাদ্য দিতে হবে।
সবুজ দাগ পর্যন্ত ডুবিয়েও চাকতির সাদা অংশ দেখা গেলে ⇒ প্রাকৃতিক খাদ্য কম। আরো সার দিতে হবে এবং সম্পূরক খাদ্যও অব্যাহত রাখতে হবে।
কখন ব্যবহার করবেন: সূর্য ওঠার পর (সকাল ১১–১২টা)। একই ব্যক্তি একই স্থানে ব্যবহার করবেন।
বিবেচ্য: ঘোলা পানিতে সেকিডিস্ক কার্যকর নয়।
২) কাঁচের গ্লাস পদ্ধতি
স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে পুকুরের পানি নিয়ে আলোতে ধরলে পানির রং সবুজ/বাদামী দেখা যাবে এবং ছোট ছোট কণা দেখা যায়—
সবুজ কণা = উদ্ভিদকণা
বাদামী কণা = প্রাণীকণা
এগুলোই মাছ/চিংড়ির প্রাকৃতিক খাদ্য।
৩) হাতের কনুই ডুবানো পদ্ধতি
পানিতে হাত কনুই পর্যন্ত ডুবিয়ে হাতের তালু না দেখা গেলে ⇒ পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য আছে। (শর্ত: পানি কাদার কারণে ঘোলা যেন না থাকে।)
৪) ফিল্টার পদ্ধতি
পুকুরের ২৫টি জায়গা থেকে মোট ২৫ লিটার পানি সংগ্রহ করে ফিল্টার করলে যদি ১ ঘন সেন্টিমিটার পরিমাণ উদ্ভিদকণা/প্রাণীকণা পাওয়া যায় ⇒ পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য আছে।
মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা ও পানিশোধন
পুকুরে আগে ব্যবহৃত বিষাক্ত দ্রব্য বা অন্য কারণে পানিতে বিষক্রিয়া থাকতে পারে। তাই পোনা মজুদের আগের দিন—
একটি হাঁড়িতে পুকুরের পানি নিয়ে
কয়েকটি মাছের পোনা ছেড়ে ১২–১৩ ঘণ্টা রাখুন
পোনা সুস্থ থাকলে ⇒ বিষক্রিয়া নেই ⇒ পোনা মজুদ করা যাবে
মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা: জলজ পোকা দমন
সার প্রয়োগের পর হাঁস পোকা, ব্যাঙাচী ইত্যাদি জন্ম নিতে পারে। এরা রেণু খায় এবং খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা করে—ফলে রেণুর মড়ক বাড়ে। নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
ডিপটারেক্স/সুমিথিয়ন কার্যকর (তবে কপিপড থাকলে সুমিথিয়ন কার্যকর নয়)
ক্লাডোসেরা ও কপিপড থাকলে রটিফার খেয়ে ফেলে, কপিপড রেণুও খেয়ে ফেলে
ডিপটারেক্স
রেণু ছাড়ার ২৪ ঘণ্টা আগে
৬–১২ গ্রাম/শতাংশ/১ ফুট পানি হারে
হাঁস পোকা, ক্লাডোসেরা, কপিপড মারা যায়; রেণুর খাদ্য রটিফার বেঁচে থাকে
সুমিথিয়ন
রেণু ছাড়ার ১২–১৫ ঘণ্টা আগে
২–৩ মি.লি./শতাংশ/১ ফুট পানি
হাঁস পোকা মারা যায় এবং কপিপড ছাড়া অন্য ক্ষতিকর জলজ পোকাও মারা যায়
ব্যবহারবিধি (কমন রুল)
প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য ১০ লিটার পানিতে গুলে সারা পুকুরে সমানভাবে ছিটিয়ে দিন।
কম তাপমাত্রা/মেঘ/বৃষ্টিতে ব্যবহার না করে দুপুর রোদে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ: রেণু ছাড়ার আগে জাল বা হররা টানা—তলদেশের বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে যাবে।
বিশেষ নোট:
রটিফার প্রচুর থাকলে ডিপটারেক্স রেণু ছাড়ার আগে ব্যবহার করবেন।
যদি রটিফার না থেকে কপিপড/ক্লাডোসেরা থাকে, ডিপটারেক্স দিয়ে ২৪ ঘণ্টা পরে রেণু ছাড়লে খাদ্য সংকট হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ডিপটারেক্স ৬–৭ দিন আগে ব্যবহার করে রটিফার উৎপাদনের সুযোগ দিতে হবে।
পরে হাঁস পোকা জন্মালে সুমিথিয়ন বা ডিজেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডিজেল বালির সাথে ঝুরঝুরে করে সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে।
মজুদ ব্যবস্থাপনা: পোনা মজুদ
ঘনত্ব (কৈ মাছ)
শতাংশ প্রতি ৪–৫ সেমি আকারের ২০০–২৫০টি কৈ মাছের পোনা মজুদ করলে ভালো উৎপাদন পাওয়া যায়।
পোনা মজুদকরণ (সময়/মৌসুম)
সকালে বা বিকালে তাপমাত্রা কম থাকে—এ সময় পরিবহন/ছাড়া ভালো
মার্চ–এপ্রিল থেকে কৈ মাছ চাষ শুরু করলে ভালো উৎপাদন পাওয়া যায়
মজুদ-পূর্ববর্তী বিশেষ ব্যবস্থাপনা: বাঁশের বানা/জালের প্রাচীর
পোনা মজুদের আগে পুকুরের চারপাশে ৮০–৯০ সেমি উচ্চতার বাঁশের বানা বা কড জালের প্রাচীর দিতে হবে।
কারণ কৈ মাছ বৃষ্টির সময় পুকুর থেকে উঠে কানকোর ওপর ভর করে ডাঙায় চলে যেতে পারে।
মজুদ ব্যবস্থাপনা: খাদ্য
খাদ্যের উপকরণ (কম্পোজিশন)
ফিশ মিল ৩০%
মিট ও বোন মিল ১০%
সরিষার খৈল ১৫%
চালের কুড়া/ভুট্টা ২০%
তিল/সয়াবিন খৈল ২০%
আটা বা চিটাগুড় ৪%
ভিটামিন ও খনিজ মিশ্রণ ১%
খাদ্য প্রয়োগ
মাছের দেহের ওজনের ৪–৫% হারে উপকরণগুলো একত্রে মিশিয়ে বলের মতো করে দিনে ২ বার দিতে হবে।
মজুদ ব্যবস্থাপনা: সার (চাষ চলাকালীন)
প্রকার: গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি
পরিমাণ (শতাংশ প্রতি): গোবর ৪–৬ কেজি, ইউরিয়া ১০০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম
প্রয়োগ: প্রতি ১৫ দিন অন্তর পানিতে গুলে প্রয়োগ করতে হবে
মজুদ ব্যবস্থাপনা: নমুনায়ন (Growth & Health Check)
মাঝে মাঝে মাছের নমুনা সংগ্রহ করে দেখুন—
মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা
শরীর ও মাথা সমভাবে বেড়েছে কিনা
ওজন আশানুরূপ বেড়েছে কিনা
যদি না বেড়ে থাকে—কোন প্রজাতি/কেন বাড়েনি—কারণ খুঁজে ব্যবস্থা নিন
রোগের লক্ষণ আছে কিনা, মাছ সুস্থ কিনা
রোগ দেখা দিলে দ্রুত প্রতিকার নিন
মজুদ ব্যবস্থাপনা: পুকুরের পানির গুণাগুণ (রুটিন চেক)
পানি দ্রুত কমে গেলে অন্য উৎস থেকে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা
পানি বেড়ে উপচে পড়লে অতিরিক্ত পানি বের করে দিন
পানির স্বচ্ছতা ৮ সেমি-এর নিচে নামলে সার ও খাবার বন্ধ রাখুন
মাঝে মাঝে হররা টেনে তলদেশের বিষাক্ত গ্যাস দূর করুন
বিক্রি/খাওয়ার উপযোগী মাছ ধরে ফেলুন—ছোট মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাবে
রোগ হলে সনাক্ত করে প্রতিকার নিন
মজুদ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা: আহরণ ও বাজারজাতকরণ
সঠিক পরিচর্যা করলে ৬ মাসের মধ্যে দেশি কৈ মাছ আহরণ সম্ভব
এ সময় গড়ে ৩০–৩৫ গ্রাম ওজন বৃদ্ধি পায়
শতাংশ প্রতি ৮–১০ কেজি পর্যন্ত আহরণ করা সম্ভব










0 comments:
মন্তব্য করুন