প্লাস্টিক পণ্যে স্বনির্ভরতায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক শিল্প: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

প্লাস্টিক পণ্য আধুনিক সভ্যতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, গৃহস্থালি—সবখানেই প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো ধাতব ও উদ্ভিদজাত অনেক উপকরণের তুলনায় প্লাস্টিক সাশ্রয়ী, টেকসই, হালকা ও আকর্ষণীয়

বাংলাদেশে প্লাস্টিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। নানা সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার মধ্যেও এই শিল্প আজ দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে। ফলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্লাস্টিক খাত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


১) দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানিতে প্লাস্টিক শিল্পের অবস্থান

বাংলাদেশের প্লাস্টিক খাত বর্তমানে দেশীয় বাজারে বড় একটি চাহিদা মেটাচ্ছে এবং একই সঙ্গে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। আপনার তথ্য অনুযায়ী—

  • প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রী রপ্তানি করে প্রতিবছর প্রায় ৮শ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা অর্জিত হয় এবং রপ্তানি পণ্যে ১২তম স্থানে অবস্থান করে।

  • দেশীয় বাজারে প্রতিবছর প্রায় ৯শ কোটি টাকার প্লাস্টিক ক্রয়-বিক্রয় হয়।

এই শিল্পে সরাসরি–পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ জড়িত—যা কর্মসংস্থানের দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


২) প্লাস্টিকের ব্যবহার: বিশ্ব বনাম বাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে ইস্পাত ও বস্ত্রশিল্পের মতো প্লাস্টিকও বড় একটি শিল্পখাতে পরিণত হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে—

  • যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার প্রায় ১২০ কেজি (আপনার তথ্য অনুযায়ী)।

  • বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার মাত্র দেড় থেকে দুই কেজি

অর্থাৎ, বাংলাদেশে ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও—জনসংখ্যা, নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে চাহিদা আরও বাড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।


৩) এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বার্ষিক প্লাস্টিক উৎপাদন (আপনার দেওয়া তথ্য)

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি যুক্ত করার মাধ্যমে এশিয়ার বহু দেশ প্লাস্টিক উৎপাদনে এগিয়েছে। আপনার তথ্য অনুযায়ী—

  • ভিয়েতনাম: ৭,৫০,০০০ মেট্রিক টন

  • থাইল্যান্ড: ২০,৪০,০০০ মেট্রিক টন

  • মালয়েশিয়া: ১০,০৬,০০০ মেট্রিক টন

  • সিঙ্গাপুর: ১,১৯,০০০ মেট্রিক টন

  • জাপান: ৬০,৪৭,০০০ মেট্রিক টন

  • চীন: ১,১৫,০০০ মেট্রিক টন

  • ভারত: ৩১,৫৭,০০০ মেট্রিক টন

এই তুলনা থেকে বোঝা যায়—প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং নীতিগত সহায়তা থাকলে বাংলাদেশও বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে পারে।


৪) কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা: বড় সুযোগের জায়গা

বাংলাদেশে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত পলি প্রোপাইলিন, পলি ইথাইলিন, এইচআইপিএস/এইচএপিএফ, জিপিপিএস ইত্যাদি কাঁচামাল অনেকাংশে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ নীতিগত সহায়তা, বড় বিনিয়োগ এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা গেলে—এই কাঁচামালের একটি অংশ দেশেই উৎপাদন সম্ভব

এক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগকারী এগিয়ে এলে এবং প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল যোগান নিশ্চিত হলে, বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান আরও শক্ত করা “অলৌকিক কিছু নয়”—এটাই আপনার লেখার মূল বার্তা।


৫) রপ্তানি বাজার ও প্রধান পণ্যসমূহ

আপনার লেখায় উল্লেখিত অনুযায়ী বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিক পণ্যের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে আছে—

  • যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া

  • সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ

  • ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো

রপ্তানিযোগ্য ও দেশীয় বাজারে প্রচলিত পণ্যের পরিধি অনেক বড়, যেমন—

  • পলিব্যাগ, হ্যাঙ্গার, ওভেন-সেফ ব্যাগ

  • হাউসহোল্ড আইটেম, ফার্নিচার

  • খেলনা ও শোপিস

  • গৃহনির্মাণ সামগ্রী (জানালা, দরজা ইত্যাদি)

  • চিকিৎসা উপকরণ (ওষুধ কনটেইনার, রক্তের ব্যাগ, ইনজেকশন, স্যালাইন ব্যাগ)

  • কৃষিখাতের প্লাস্টিক পাইপ, বড় চৌবাচ্চা

  • গাড়ি/সাইকেলের যন্ত্রাংশ (বাম্পার, হ্যান্ডেল কভার, ব্যাকলাইট/স্পোক লাইট ইত্যাদি)

  • পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতের পট, জার, মাছের জাল, বল, ঝুড়ি

  • ভিডিও/অডিও ক্যাসেট ও কম্পিউটার উপকরণসহ নানাবিধ সামগ্রী


৬) ওয়েস্ট প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ও রিসাইক্লিং: পরিবেশ ও অর্থনীতির দ্বৈত লাভ

প্লাস্টিক বারবার ব্যবহার করা যায়। ব্যবহৃত প্লাস্টিক যদি আধুনিক প্রযুক্তির “ওয়েস্ট প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট” ব্যবস্থায় সংগ্রহ, বাছাই ও রিসাইক্লিং করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালে পরিণত করা যায়, তাহলে—

  • পরিবেশ দূষণ কমবে

  • কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা কমে প্রায় ৫০% পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে (আপনার লেখার বক্তব্য অনুযায়ী)

কিন্তু সমস্যাটি হলো—দেশে এই খাতে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো যথেষ্ট শক্ত ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।


৭) শিল্পনগরী ও এক্সপোর্ট-ফ্রেন্ডলি পরিবেশের ঘাটতি

আপনার লেখায় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা হলো—বাংলাদেশে এখনো প্লাস্টিক শিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী গড়ে ওঠেনি। ফলে—

  • বিদেশি ক্রেতারা এসে এক জায়গায় অনেক কারখানা, মেশিনারিজ ও প্রোডাকশন লাইন একসঙ্গে দেখতে পারেন না

  • মান যাচাই, সক্ষমতা যাচাই ও নতুন অর্ডার নিশ্চিত করা কঠিন হয়

যেসব দেশে প্লাস্টিক শিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী আছে, সেখানে ক্রেতারা সহজে একাধিক ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে তুলনামূলকভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এটা রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক।


৮) শিল্পের ভৌগোলিক বিস্তার (আপনার তথ্য অনুযায়ী)

বাংলাদেশে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুমানিক বিস্তার—

  • ঢাকায়: ৬৫%

  • চট্টগ্রামে: ২০%

  • নারায়ণগঞ্জে: ১০%

  • অন্যান্য: খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়া, বরিশাল, রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে

এ বিস্তার আরও ছড়িয়ে দেওয়া গেলে নতুন কর্মসংস্থান ও স্থানীয় শিল্পায়নের পথ খুলতে পারে।


৯) সবচেয়ে বড় সংকট: প্রশিক্ষিত জনবল ও শিল্প নিরাপত্তা

আপনার লেখার অন্যতম জোরালো বক্তব্য—প্লাস্টিক শিল্প শ্রমঘন এবং নিরাপত্তা নীতি (“Safety First”) অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও)-এর নির্দেশনার আলোকে দক্ষ টেকনিশিয়ান/প্রযুক্তিবিদ থাকা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে অনেক কারখানায়—

  • প্লাস্টিক প্রযুক্তিতে ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা/প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল নেই

  • ফলে প্রশিক্ষণহীন শ্রমশক্তির কারণে দুর্ঘটনা, আহত হওয়া, প্রাণহানি এবং যন্ত্রপাতি ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়

  • শিল্পের উৎপাদন খরচ, ডাউনটাইম, এবং গুণগত মানের ক্ষতি হয়

আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, ডিপ্লোমা ইন প্লাস্টিক প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হলে স্বল্প ব্যয়ে, অল্প সময়েই পণ্যের মান উন্নত হতে পারে এবং দুর্ঘটনা কমতে পারে।


১০) করণীয়: সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কী দরকার

এই শিল্পকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি—

  1. ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা/শক্তিশালী করা

  2. দক্ষ ডিপ্লোমা/টেকনিক্যাল জনবল তৈরি ও শিল্পে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নীতি বাস্তবায়ন

  3. প্লাস্টিক শিল্পনগরী/ক্লাস্টার গঠন (ফ্যাক্টরি–মেশিনারি–সাপ্লাই চেইন একই এলাকায়)

  4. রিসাইক্লিং ও ওয়েস্ট প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট নীতিমালা–অবকাঠামো–প্রশিক্ষণ

  5. বৈষম্যমূলক নীতি দূর করে রপ্তানিবান্ধব সহায়তা

  6. আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য শো-রুম/এক্সপো/ইন্সপেকশন সুবিধা তৈরি


উপসংহার

প্লাস্টিক শিল্প বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষ জনবল, পরিকল্পিত শিল্প অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা গেলে—বাংলাদেশ কেবল নিজস্ব চাহিদাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্লাস্টিক পণ্যে আরও বড় অংশীদার হতে পারে।


স্বাক্ষর (আপনার মূল লেখার সূত্র অনুযায়ী):
মোঃ আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহা সচিব
ডিপ্লোমা প্রযুক্তি শিক্ষা গবেষণা, বাংলাদেশ
৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম