পুকুরে গলদা চিংড়ির চাষে প্রচুর লাভ

স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ: লাভজনক চাষের পূর্ণাঙ্গ গাইড (একক ও মিশ্রচাষ)

আমিষভোজী মানুষের প্রিয় খাদ্য মাছ—আর মাছের পাশাপাশি চিংড়িও প্রায় একই কাতারে উচ্চারিত হয়। নানা ধরনের চিংড়ির মধ্যে গলদা চিংড়ি (Freshwater Giant Prawn) সবসময়ই বাজারে চাহিদাসম্পন্ন এবং দামও তুলনামূলক বেশি থাকে। অনেক সময় দাম এত বেশি হয় যে তা মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়—কিন্তু মাছচাষির কাছে এটি সুখবর, কারণ সঠিক প্রযুক্তি মেনে চাষ করতে পারলে গলদা চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি

স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চাষ এককভাবেও করা যায়, আবার রুই–কাতলা–গ্রাস কার্পের মতো উপরস্তরের মাছের সাথে মিশ্রচাষও করা যায়। তবে লাভ পেতে হলে মূল কথা একটাই—সঠিক পুকুর নির্বাচন, বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতি, সঠিক ঘনত্বে পোনা ছাড়ানো, নিয়মিত পানির গুণমান দেখা এবং খাবার ব্যবস্থাপনা।

নিচে স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চাষের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলো ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।

সতর্কতা: চুন/ইউরিয়া/এসএসপি/মহুয়া খোল প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ, পানির গভীরতা ও পুকুরের অবস্থাভেদে মাত্রা সামান্য ওঠানামা করতে পারে। প্রয়োগের সময় হাতে গ্লাভস/মাস্ক ব্যবহার এবং নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা উত্তম।


১) পুকুর নির্বাচন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)

গলদা চাষের জন্য উপযোগী পুকুরের বৈশিষ্ট্য—

  • আয়তন: সাধারণত ২–৩ বিঘা মাপের পুকুর সুবিধাজনক
  • আকার: আয়তাকার হলে ব্যবস্থাপনা সহজ
  • তলদেশ: পাঁক/অতিরিক্ত কাদা কম, তলদেশ সমতল হওয়া ভালো
  • পানির গভীরতা: প্রায় ১.৫–২.০ মিটার
  • পানির স্থায়িত্ব: পানি একেবারে শুকিয়ে যায় কি না—এটা জানা জরুরি (কারণ প্রস্তুতি পদ্ধতি ভিন্ন হবে)


২) পুকুর প্রস্তুতি (দুই রকম পরিস্থিতি)

ক) যেসব পুকুর শুকিয়ে যায় (Dryable Pond)

১) পুকুর প্রস্তুতির শুরুতে—

  • একরপ্রতি ১০০–২০০ কেজি চুন ছিটিয়ে
  • পুকুরের তলদেশে চাষ/কোদাল দিয়ে নেড়ে দিন

২) কয়েকদিন রোদ খাইয়ে—

  • প্রথমে ১ ফুট গভীরতায় পানি ঢোকান

৩) সার প্রয়োগ (প্রাথমিক উৎপাদন/শ্যাওলা তৈরিতে):

  • ৩০–৩৫ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট (SSP)
  • ১৫ কেজি ইউরিয়া (একরপ্রতি)

৪) এরপর ১০–১৫ দিন পুকুর ফেলে রাখুন

  • এতে পর্যাপ্ত শ্যাওলা/প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হবে

৫) শেষে প্রয়োজনীয় উচ্চতা পর্যন্ত পানি ভরে মজুদ (স্টকিং) করুন।


খ) যেসব পুকুর শুকায় না (Perennial Pond)

১) অবাঞ্ছিত মাছ/জীব নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতি:

  • প্রতি একরে প্রতি ফুট পানির গভীরতার জন্য ৩০০ কেজি মহুয়া খোল প্রয়োগ

২) ৫–৭ দিন পর

  • একরপ্রতি ১০০–২০০ কেজি চুন প্রয়োগ

৩) মহুয়া খোল দেওয়ার ১০–১৫ দিন পরে

  • ৩০ কেজি SSP

  • ১০ কেজি ইউরিয়া (একরপ্রতি)

৪) মহুয়া খোল দেওয়ার ২০–২২ দিন পরে

  • প্রয়োজনীয় উচ্চতায় পানি দিন এবং পোনা ছাড়ুন




৩) পোনা মজুদ (একক চাষ ও মিশ্রচাষ)

✅ একক চাষ (Only Golda)

  • একরপ্রতি ১০–১২ হাজার পোস্ট-লার্ভা (PL) ছাড়তে হবে

  • পোনার দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০–১৫ মিমি হলে ভালো

এরিয়েটর থাকলে (অতি-ঘন চাষ)

  • একরপ্রতি ২০–২৫ হাজার পর্যন্ত মজুদ করা যায়

  • তবে পানির অক্সিজেন, খাবার ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে


✅ মিশ্রচাষ (Golda + কার্প)

  • একরপ্রতি ৬,০০০টি গলদা চারা

  • এবং ১,৫০০–১,৮০০টি পোনা মাছ (দৈর্ঘ্য ১০–১৫ সেমি হলে ভালো)

এরিয়েটর থাকলে

  • এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা যায় (ব্যবস্থাপনা শক্ত হতে হবে)

কোন মাছ দেবেন?

  • গলদার সাথে রুই, কাতলা, গ্রাস কার্প দেওয়া ভালো

  • তলদেশে বসবাসকারী মাছ (বটম ফিডার) না দেওয়াই উত্তম
    কারণ গলদা নিজেই তলদেশে থাকে—প্রতিযোগিতা/ধাক্কাধাক্কি বাড়তে পারে


৪) পোনা ছাড়ার পর পরিচর্যা ও পানির মান

✅ জৈব সার কেন দেবেন না?

গলদা চাষের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে জৈব সার (গোবর/কম্পোস্ট ইত্যাদি) দেওয়া ঠিক নয়, কারণ—

  • এতে পানি ঘোলা হয়
  • দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) কমে যেতে পারে
  • ফলে গলদা মড়ক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়

✅ নিয়মিত চুন ও রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনা

  • প্রতি মাসে একবার একরপ্রতি ২৫ কেজি চুন প্রয়োগ

  • চুন দেওয়ার এক সপ্তাহ পরে

    • একরপ্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া

    • একরপ্রতি ২০ কেজি SSP
      পানিতে গুলে ছিটিয়ে দিন

✅ পানি পরিবর্তন

  • প্রতি ২–৩ সপ্তাহ অন্তর

  • পুকুরের ১০–১৫% পানি বের করে নতুন/শুদ্ধ পানি ঢোকান
    এতে গ্যাস কমে, পানি সতেজ থাকে

✅ স্বাস্থ্য পরীক্ষা

  • প্রতি ১৫ দিন অন্তর জাল টেনে

    • গলদার বৃদ্ধি, খোলস বদল, দাগ/ক্ষত, দুর্বলতা

    • মাছের স্বাস্থ্য
      পর্যবেক্ষণ করুন


৫) খাদ্য ব্যবস্থাপনা (লাভের চাবিকাঠি)

✅ গলদা চিংড়ির খাবার

  • পেলেট ফিড দেওয়া সবচেয়ে ভালো

  • খাবারে কমপক্ষে ৩০% প্রোটিন থাকা উচিত

খাবারের হার (স্টক অনুযায়ী)

  • শুরুর দিকে: মোট মজুদ গলদার ওজনের ১০%

  • ধীরে ধীরে কমিয়ে: ৫% পর্যন্ত আনুন

দিনে কখন দেবেন?

খাবার ২ ভাগে দিন—

  • সন্ধ্যায়: মোট খাবারের ৩/৪ অংশ

  • সকালে: মোট খাবারের ১/৪ অংশ
    (গলদা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে—তাই সন্ধ্যায় বেশি দেওয়া হয়)


✅ পোনা মাছের খাবার

  • মোট মাছের ওজনের ২% হারে দিন
  • সম পরিমাণ চালের কুঁড়া + সরিষা/বাদাম খোল মিশিয়ে খাদ্য বানানো যায়
  • মাছের খাবার সাধারণত সকালে একবারে দেওয়া হয়


৬) অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা (বিশেষ সতর্ক সময়)

মাঝরাতের পরে ও মেঘলা দিনে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যেতে পারে। লক্ষণ হতে পারে—

  • গলদা/মাছ পানির উপর ঘেঁষে ঘোরাঘুরি
  • অস্বাভাবিক নড়াচড়া
  • খাবার গ্রহণ কমে যাওয়া

✅ এসব হলে এরিয়েটর চালানো দরকার।


৭) উৎপাদন ও লাভের সম্ভাবনা 

একক চাষ (৬ মাসে)

  • একরপ্রতি ১২,০০০ গলদা মজুদ করলে
  • ৬ মাসে প্রতি গলদা ৪০–৬০ গ্রাম হতে পারে
  • ৮০% বাঁচার হার হলে ফলন ≈ ৪৮০ কেজি/একর

এরিয়েটরসহ অতি-ঘন চাষ

  • একরপ্রতি ২৪,০০০ গলদা মজুদ করলে ফলন ≈ ৯৬০ কেজি/একর
  • আয় হতে পারে ≈ ৬,৭২,০০০ টাকা

মিশ্রচাষ

  • একরপ্রতি ৬,০০০ গলদা + ১,৮০০ পোনা মাছ মজুদ করলে

    • গলদা ≈ ৩৩৬ কেজি

    • মাছ ≈ ৭ কুইন্টাল

  • এরিয়েটর থাকলে ঘনত্ব বাড়িয়ে দ্বিগুণ ফলন সম্ভব (ভালো ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষে)

খরচ–লাভ

  • মোট আয়ের ৩৫–৪০% ব্যয়
  • ফলে প্রকৃত লাভ ৬০–৬৫% পর্যন্ত হতে পারে
  • নিবিড় ব্যবস্থাপনায় ৬ মাসে একবার, বছরে ২টি ফলন নেওয়ার সুযোগও থাকে


শেষ কথা

স্বাদু জলের পুকুরে গলদা চিংড়ি চাষ নিঃসন্দেহে লাভজনক—কিন্তু লাভ নিশ্চিত করতে হলে পুকুর প্রস্তুতি, ঘনত্ব, অক্সিজেন ও খাবার ব্যবস্থাপনা—এই চারটি জায়গায় নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। একক চাষ হোক বা মিশ্রচাষ—সঠিক প্রযুক্তি মেনে চললেই কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া সম্ভব।