মুরগি খামার গড়তে যা যা প্রয়োজন

দেশে উন্নত জাতের মুরগি পালনে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া মুরগি পালনের জন্য বেশ উপযোগী, আর সরকারও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে আমিষজাতীয় খাবারের ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি—ফলে বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টি ঘাটতির প্রভাব পড়তে পারে মানসিক ও শারীরিক বিকাশে।

একটি উন্নত জাতের ডিমপাড়া মুরগি সাধারণত ছয় মাস বয়সে ডিম দেওয়া শুরু করে এবং বছরে ২০০–২৫০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। অন্যদিকে ব্রয়লার (মাংস উৎপাদক) মুরগি প্রায় দুই মাসেই ১.৫–২ কেজি ওজনের হতে পারে। বসতবাড়িতে অল্প শ্রম ও কম খরচে মুরগি পালনে পরিবারের ডিম-মাংসের চাহিদা অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব।

পরিবারভিত্তিক মুরগি পালনের বড় সুবিধা হলো—বাড়ির ছোট-বড় সবাই অবসর সময়ে কাজে যুক্ত থাকতে পারে। লক্ষ্য ঠিক থাকলে আপনিও “এক মোরগের সংসার” গড়ে লাভবান হতে পারেন। তবে শুরু করার আগে আধুনিক কিছু নিয়ম-কৌশল জানা জরুরি।


থাকার ঘর (পোল্ট্রি শেড)

“এক মোরগের সংসার” গড়তে প্রথম কাজ হলো ঠিকঠাক ঘর তৈরি/ব্যবস্থা করা।

ঘরের মাপ (উদাহরণ হিসেবে):

  • উচ্চতা: ৪ ফুট

  • প্রস্থ: সাড়ে ৪ ফুট

  • দৈর্ঘ্য: ৬ ফুট

ঘরের ভেতরে রাখবেন—

  • ডিম পাড়ার খাঁচি/নেস্ট

  • খাবারের পাত্র

  • পানির পাত্র

খেয়াল রাখবেন:

  1. ঘর সব সময় শুকনা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

  2. খোলামেলা স্থানে ঘর বানানো ভালো।

  3. ঘরের মেঝেতে ৩ ইঞ্চি পুরু করে তুষ/কাঠের গুঁড়া/বালির সাথে আধা কেজি গুঁড়া চুন ভালোভাবে মিশিয়ে সমানভাবে বিছিয়ে দিন।

  4. মেঝের তুষ/কাঠের গুঁড়া ৭ দিন পরপর ওলট-পালট করে দেবেন। ভিজে গেলে বা জমাট বাঁধলে বদলে দিন।

চাইলে ঘরের মধ্যে আটকে না রেখে বাইরেও ছেড়ে পালন করতে পারেন (তবে নিরাপত্তা ও রোগ-ঝুঁকি মাথায় রাখতে হবে)।


সংগ্রহের স্থান (উন্নত জাতের মুরগি কোথায় পাবেন?)

উন্নত জাতের মুরগি সংগ্রহ নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। উদাহরণ হিসেবে—

  • ঢাকা: মণিপুর কেন্দ্রীয় মোরগ-মুরগি খামার বা কৃষি খামার সড়কের পশুসম্পদ অধিদপ্তরের বিক্রয় কেন্দ্র

  • চট্টগ্রাম: পাহাড়তলী আঞ্চলিক খামার

  • রাজশাহী: রাজবাড়ী হাট আঞ্চলিক খামার

এছাড়া দেশের অনেক জেলাতেই সরকারি মুরগি খামার/পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে—নিজ এলাকার কাছাকাছি খামার থেকে সংগ্রহ করা সুবিধাজনক।


খাদ্য (ডিম বেশি পেতে কী খাওয়াবেন?)

ভালো ডিম পেতে মুরগিকে প্রতিদিন সুষম খাবার + বিশুদ্ধ পানি + সবুজ খাবার দিতে হবে।

প্রতিটি মুরগির দৈনিক খাবার (গাইডলাইন):

  • সুষম খাদ্য: ১১৫ গ্রাম

  • বিশুদ্ধ পানি: পর্যাপ্ত

  • সবুজ শাক/কচি ঘাস: ২৫ গ্রাম (কুচি কুচি করে)

ঘরে তৈরি ১ কেজি সুষম খাদ্যের মিশ্রণ

  • গম/ভুট্টা ভাঙা বা চালের খুদ: ৪০০ গ্রাম

  • গমের ভুসি: ৫০ গ্রাম

  • চালের কুঁড়া (তুষ ছাড়া): ২৫০ গ্রাম

  • তিলের খৈল: ১২০ গ্রাম

  • শুঁটকি মাছের গুঁড়া: ১০০ গ্রাম

  • ঝিনুকের গুঁড়া: ৭৫ গ্রাম
    মোট = ১,০০০ গ্রাম (১ কেজি)


রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

মুরগিকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত টিকা জরুরি।

যা করবেন:

  • পশুসম্পদ বিভাগ থেকে রানীক্ষেত, কলেরা, বসন্ত রোগের টিকা সংগ্রহ/নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন (অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও পাওয়া যায়)।

  • মুরগি অসুস্থ হলে দ্রুত পশুচিকিৎসালয়ের পরামর্শ নিন।

  • অসুস্থ মুরগিকে তৎক্ষণাৎ আলাদা করে রাখুন।

  • রোগাক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা/লালা সতর্কভাবে সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে রাখুন।


আয়–ব্যয় (একটি নমুনা হিসাব)

প্রাথমিক খরচ (উদাহরণ):

  • ঘর (খাবার পাত্রসহ): প্রায় ২,০০০ টাকা (বছরের পর বছর ব্যবহার করা যায়)

  • ৬ মাস বয়সী ৯টি মুরগি + ১টি মোরগ: প্রায় ২,০০০ টাকা

  • ১ বছর পর প্রায় একই দামে বিক্রি করা যেতে পারে (পরিস্থিতিভেদে কমবেশি হতে পারে)

চলতি খরচ:

  • প্রতি মাসে খাবার: প্রায় ৮০০ টাকা
    (নিজে সুষম খাবার বানালে খরচ আরও কমতে পারে)

আয় (উদাহরণ):

  • ৯টি মুরগি থেকে গড়ে প্রতিদিন ৬টি ডিম

  • ডিম বিক্রি করে মাসে আনুমানিক আয়: ১,৪৪০ টাকা (দাম ও উৎপাদনভেদে পরিবর্তন হবে)

উৎপাদিত ডিমের কিছু অংশ বিক্রি করা যাবে, আবার কিছু অংশ খাবার ও বাচ্চা ফুটানোর কাজেও ব্যবহার করা যাবে। আপনি চাইলে ডিমের একটি অংশ দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে ভবিষ্যতে নিজের খামারও বড় করতে পারেন।


তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ (উল্লেখিত লেখার ভিত্তিতে সংকলিত)