পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে “তারাবাইন” মাছ চাষে নতুন দিগন্ত: কচুরীপানা পদ্ধতিতে কৃত্রিম প্রজননে সাফল্য
কৃত্রিম প্রজননে বারবার ব্যর্থতার কারণে এতদিন পুকুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তারাবাইন মাছ চাষ প্রায় অসম্ভবই ছিল। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)–এর মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একদল গবেষক সম্প্রতি সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। এর ফলে এখন থেকে পুকুরে তারাবাইন মাছের কৃত্রিম প্রজনন, রেণু উৎপাদন ও বাণিজ্যিক চাষ অনেক বেশি সহজ ও বাস্তবসম্মত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গবেষণা দল ও তত্ত্বাবধান
এই সাফল্য অর্জিত হয় ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রফেসর ড. মো: ইদ্রিস মিয়া–এর তত্ত্বাবধানে এবং অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের প্রফেসর ড. আহসান বিন হাবিব–এর সহ-তত্ত্বাবধানে।
গবেষণা দলে ছিলেন—
পি.এইচ.ডি ফেলো: এএম ফরিদ
এমএস ছাত্র: মো: মনিরুজ্জামান
আব্দুল্লাহ আল মামুন
মো: শহীদুর রহমান
উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তারাবাইন মাছ: দেশীয়, সুস্বাদু ও প্রায় বিলুপ্তপ্রায়
তারাবাইন আমাদের দেশেরই একটি প্রায় বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ—খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। মাছটি সাধারণত লম্বা, হলুদাভ ও সর্পিলাকার। লেজের দিকে গোলাকার কালো দাগ থাকায় এটি “তারাবাইন” নামে পরিচিত।
প্রকল্পের পটভূমি
জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে তথ্য, বিজ্ঞান ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ড. ইদ্রিস মিয়াকে প্রধান গবেষক করে তারাবাইন মাছের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা লালন ও চাষ–সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নেওয়া হয়।
ড. ইদ্রিস মিয়া জানান, ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জের কইলল্যার বিল থেকে ৫০ জোড়া তারাবাইন সংগ্রহ করে গবেষণা শুরু করা হয়। পরে বাকৃবির ফিশারিজ মাঠ গবেষণা কেন্দ্রের পুকুরে মাছগুলো ছাড়া হয় এবং সুষম খাবার সরবরাহের মাধ্যমে ব্রুড (আতর) মাছগুলোকে পরিপক্ক করা হয়।
“কচুরীপানা পদ্ধতি”–তে কৃত্রিম প্রজনন: ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
গবেষণায় সফলভাবে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তার মূল ধাপগুলো সংক্ষেপে—
ব্রুড পুকুর থেকে ব্রুড মাছ সংগ্রহ
মাছগুলোকে ১২ ঘণ্টা ঝরনার নিচে রেখে প্রস্তুত করা
স্ত্রী মাছকে ১ম ডোজ হরমোন দেওয়ার ৬ ঘণ্টা পর আবার ২য় ডোজ প্রয়োগ
পুরুষ মাছকে ১ম ডোজ হরমোন প্রয়োগ করে হাপাতে (জাল/মশারি দিয়ে ডিম ছাড়ার উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা) রাখা
হাপাতে কচুরীপানা দিয়ে পরিবেশ তৈরি করা
এ অবস্থায় প্রাকৃতিক উর্বরতা (Natural Fertilization) ঘটে এবং সাধারণত ১২ ঘণ্টা পর কচুরীপানার মধ্যে ডিম দেওয়া শুরু হয়
ডিম দেওয়ার ২৮–৩৬ ঘণ্টা পর ডিম ফুটে রেণু/বাচ্চা বের হয়
কেন এই উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ?
ড. ইদ্রিস মিয়ার মতে, আগে তিনি “চাপ পদ্ধতি”–তে তারাবাইনের কৃত্রিম প্রজনন সফল করেছিলেন। তবে নতুন উদ্ভাবিত কচুরীপানা পদ্ধতি তারাবাইন চাষকে আরও—
সহজ ও সরল করবে
কম খরচে সম্প্রসারণযোগ্য করবে
প্রাকৃতিক উর্বরতা হওয়ায় সারভাইভিলিটি (বেঁচে থাকার হার) তুলনামূলক বেশি হতে পারে
একজন চাষি চাইলে নিজ পুকুরেই স্বল্প ব্যয়ে কেবল কচুরীপানা ব্যবহার করে রেণু ফোটাতে পারবেন
এরপর নিজ পুকুরে চাষ করে এবং অন্যান্য চাষিদের কাছে পোনা বিক্রি করে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ড. ইদ্রিস মিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই প্রযুক্তি দেশের মাছ চাষিদের কাছে পৌঁছাতে পারলে বাণিজ্যিক মাছচাষে নতুন ধারার সূচনা হবে এবং একটি প্রায় বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশীয় জলাশয়ে আবারও জনপ্রিয়ভাবে চাষ হতে পারবে।
যোগাযোগ
আগ্রহী মাছ চাষিরা বিস্তারিত তথ্য জানতে যোগাযোগ করতে পারেন:
০১৭১২-৭৬২৯৫০










0 comments:
মন্তব্য করুন