মাছ চাষে বায়োটেকনোলজি

মাছ চাষে বায়োটেকনোলজি

আমাদের দেশীয় রুই মাছ সাধারণভাবে প্রথম বছরে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে বড় হয়। সে কারণে অনেক খামারি এক বছর বয়সী রুই মাছের পোনা দিয়ে চাষ শুরু করেন। তবে রুই মাছকে নির্দিষ্ট বায়োটেকনোলজিক্যাল পদ্ধতিতে ট্রিপ্লয়েড করা গেলে এর বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে—অনেক ক্ষেত্রে আনুমানিক দেড়গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলা হয়।

রুই মাছের ট্রিপ্লয়েড পোনা: ধারণা ও প্রক্রিয়া

রুই মাছের ট্রিপ্লয়েড পোনা উৎপাদনে সাধারণত স্ত্রী মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করে স্পার্ম মিশিয়ে নিষেক (ফার্টিলাইজেশন) করানো হয়। এরপর নিষিক্ত ডিমকে নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ তাপ/চাপ-শক (Temperature/Pressure shock) প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রিপ্লয়েড রেণু/পোনা তৈরি করা হয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এই পদ্ধতিতে সব পোনাই ট্রিপ্লয়েড হয় না। তাই একটি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর কোনটি ট্রিপ্লয়েড আর কোনটি ডিপ্লয়েড—তা শনাক্ত করে আলাদা (সিলেকশন) করার ব্যবস্থা রাখতে হয়। সঠিকভাবে শনাক্তকরণ ও বাছাই করা গেলে প্রথম বছরের ট্রিপ্লয়েড পোনা দিয়েই এক বছরে ভালো ওজনের রুই উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

স্ত্রী মাছ বনাম পুরুষ মাছ: কে বেশি বড় হয়?

জন্মগতভাবে অধিকাংশ মাছের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অর্ধেক পুরুষ আর অর্ধেক স্ত্রী হয়ে থাকে। তবে প্রজাতিভেদে বৃদ্ধির গতি একরকম নয়—

  • অনেক প্রজাতিতে স্ত্রী মাছ তুলনামূলকভাবে বড় হয় (যেমন: শিং, কৈ, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস ইত্যাদি)।

  • আবার কিছু প্রজাতিতে পুরুষ মাছ তুলনামূলকভাবে বড় হয় (যেমন: তেলাপিয়া, দেশি মাগুর ইত্যাদি)।

যেসব মাছ এক বছরে বা তারও কম সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, সেগুলোতে বায়োটেকনোলজি প্রয়োগ করে সেক্স কন্ট্রোল/সেক্স রিভার্সাল (Sex control / Sex reversal) কাজ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।

সব স্ত্রী মাছ উৎপাদনের কৌশল: “সুপার পুরুষ” নির্বাচন

স্ত্রী মাছ উৎপাদনের একটি ধারণাগত কৌশল হলো—প্রজনন করিয়ে রেণু উৎপাদনের পর খাদ্য গ্রহণের শুরুতেই নির্দিষ্ট সময়সীমায় বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধানে হরমোন/ডায়েটারি ট্রিটমেন্ট দিয়ে কিছু মাছকে কার্যকরভাবে পুরুষ হিসেবে গড়ে তোলা (Functional male)। পরে সেই পুরুষ মাছকে প্রজননে ব্যবহার করে বাচ্চাগুলোর সেক্সিং টেস্ট (Sexing test) করা হয়। যদি ফলাফল হিসেবে সব/অধিকাংশ স্ত্রী মাছ পাওয়া যায়, তাহলে যে পুরুষ মাছটি ব্যবহার করা হয়েছিল তাকে “সুপার পুরুষ” হিসেবে নির্বাচন করা যায়। এভাবে বারবার পরীক্ষা ও নির্বাচনের মাধ্যমে উপযুক্ত ব্রিডার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

উৎপাদন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ গুরুত্ব

এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কিছু ক্ষেত্রে (যেমন থাই কৈ) সব/অধিকাংশ স্ত্রী মাছ উৎপাদনের সক্ষমতার কথা বলা হয়। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিং, পুটি, পাবদা, পাঙ্গাসসহ অন্যান্য প্রজাতিতেও উন্নত উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। মাঠপর্যায়ের কিছু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উন্নত স্টক/স্ত্রী মাছ সাধারণ মাছের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি উৎপাদন দিতে পারে—তবে ফলাফল স্থান, পানি মান, খাদ্য, ব্যবস্থাপনা, জেনেটিক স্টক ও প্রয়োগ-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রোটিন চাহিদা পূরণে আগামী দিনে উন্নত বীজ উৎপাদন, ব্রিডিং এবং বায়োটেকনোলজি-ভিত্তিক মাছ চাষের গুরুত্ব আরও বাড়বে। তবে এসব প্রযুক্তি বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ, নীতিমালা অনুসরণ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।