থাই সরপুঁটির চাষ

লেখা: মাহবুব কামাল, কৃষিবিদ — আধুনিক মাঠ-গাইড (আপডেটেড ভার্সন)

থাই সরপুঁটি একটি সুস্বাদু, শক্ত প্রকৃতির এবং দ্রুতবর্ধনশীল মাছ। এটি তুলনামূলকভাবে কম অক্সিজেন, উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। রুইজাতীয় মাছের তুলনায় কম খরচে, কম সময়ে, সহজ ব্যবস্থাপনায় ভালো উৎপাদন পাওয়া যায়। একক চাষের পাশাপাশি মিশ্রচাষে (রুই–কাতলা–মৃগেল/পুঁটি জাতীয় অন্যান্য মাছের সাথে) চাষ করলেও ফল ভালো হয়।

সঠিক ব্যবস্থাপনায় ৫–৬ মাসে থাই সরপুঁটি সাধারণত ১২০–১৫০ গ্রাম ওজনে পৌঁছে যায় এবং অনেক এলাকায় বছরে দুইবার চাষ (ডাবল ক্রপ) সম্ভব।


১) পুকুর নির্বাচন ও উপযুক্ততা

পুকুরের আকার

  • আদর্শ: ৫–৩০ শতাংশ

  • বড় হলেও সমস্যা নেই, তবে ব্যবস্থাপনা সহজ রাখতে ১ একরের বেশি না হলে ভালো (আপনার লেখার সাথে মিল রেখে)।

পানির গভীরতা

  • ১.৫–২.০ মিটার (৩–৪ হাত) — ভালো ফলনের জন্য আদর্শ।

পুকুরের শর্ত

  • রোদ পড়ে এমন জায়গা (দিনে কমপক্ষে ৬–৮ ঘণ্টা আলো)

  • পানি ঢোকা–বের হওয়ার ব্যবস্থা

  • পাড় শক্ত ও লিকেজ কম

  • বন্যা/অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে মাছ বের হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে জাল/স্ক্রিন লাগানো


২) পুকুর প্রস্তুতি (আধুনিক ধাপে ধাপে)

ক) শুকনো মৌসুমে পুকুর শুকানো (সেরা পদ্ধতি)

  1. পুকুরের পানি পুরো নিষ্কাশন করুন

  2. তলদেশের কাদা ১০–১৫ দিন রোদে শুকান (মাটি ফেটে গেলে ভালো)

  3. শুকানোর পর চাষ/কোদাল দিয়ে তলদেশ আলগা করুন

খ) শুকানো সম্ভব না হলে (ভেজা পুকুর প্রস্তুতি)

  • রাক্ষুসে/অবাঞ্ছিত মাছ (শোল, টাকি, বোয়াল ইত্যাদি) ও ক্ষতিকর প্রাণী দূর করতে জাল টানা + প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নিন।

  • (খুব গুরুত্বপূর্ণ) অতি শক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে ঝুঁকি থাকে—স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ ছাড়া আগ্রাসী কেমিক্যাল ব্যবহারে না যাওয়াই নিরাপদ।


৩) চুন ও সার ব্যবস্থাপনা (আপডেটেড শিডিউল)

চুন প্রয়োগ (প্রথম ধাপ)

  • প্রতি শতাংশে ১ কেজি পাথুরে চুন (আপনার তথ্য অনুযায়ী)

  • চুন পানিতে গুলে পাড়সহ ছিটিয়ে দিন

কেন দরকার?

  • পানির pH স্থিতিশীল থাকে, রোগ জীবাণু কমে, প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন সহায়তা করে

৭ দিন পর সার প্রয়োগ (প্রাকৃতিক খাবার তৈরির জন্য)

প্রতি শতাংশে:

  • গোবর ৪ কেজি

  • টিএসপি ১৫০ গ্রাম

  • ইউরিয়া ১০০ গ্রাম

প্রয়োগ পদ্ধতি (আধুনিক টিপস):

  • সার তলায় ছিটিয়ে কোদাল দিয়ে হালকা মিশিয়ে দিন

  • এরপর দ্রুত পানি ভরুন

  • ৫–৭ দিনের মধ্যে পানি হালকা সবুজ/বাদামি হলে বুঝবেন প্ল্যাংকটন তৈরি হয়েছে (প্রাকৃতিক খাবার)


৪) পোনা নির্বাচন, আকার ও মজুদ

পোনার আকার

  • ১.৫–২ ইঞ্চি (আপনার তথ্য অনুযায়ী)

  • রোগমুক্ত, একই আকারের, সক্রিয় পোনা নিন

মজুদের হার (একক চাষ)

  • প্রতি শতাংশে ৬০–৬৫টি পোনা

পোনা ছাড়ার আগে “অ্যাক্লিমেশন” (অত্যন্ত জরুরি আধুনিক ধাপ)

  • পোনার পাত্র/ব্যাগ পুকুরের পানিতে ১৫–২০ মিনিট ভাসিয়ে রাখুন

  • এরপর ধীরে ধীরে পুকুরের পানি মিশিয়ে তাপমাত্রা ও পানির সাথে খাপ খাওয়ান

  • তারপর পোনা ছাড়ুন
    ✅ এতে “শক” কমে এবং মৃত্যুহার কমে।


৫) খাদ্য ব্যবস্থাপনা (সুষম ও হিসাবভিত্তিক)

দৈনিক খাবারের পরিমাণ

  • মোট মাছের ওজনের ৪–৬% (আপনার তথ্য অনুযায়ী)

  • দিনে ২ বার: সকাল + বিকেল

খাবার কী দেবেন?

  • চালের কুঁড়া বা গমের ভুসি

  • (আধুনিকভাবে ভালো ফলের জন্য) কুঁড়া/ভুসির সাথে অল্প পরিমাণ প্রোটিন উৎস যোগ করলে বৃদ্ধি আরও ভালো হয় (যেমন: সরিষার খৈল/ফিশমিল কম পরিমাণে) — তবে আপনি চাইলে “কম খরচ” মডেলে কেবল কুঁড়া/ভুসিও চলবে।

খাবার প্রয়োগ পদ্ধতি (সেরা)

  • “এক জায়গায় ঢেলে” না দিয়ে পুকুরজুড়ে ছিটিয়ে দিন

  • সম্ভব হলে নির্দিষ্ট ২–৩টি ফিডিং স্পট রাখুন—খাবার পর্যবেক্ষণ সহজ হবে


৬) মাসিক স্যাম্পলিং ও রেকর্ড (যুগোপযোগী অংশ)

প্রতি মাসে অন্তত ১ বার:

  • জাল টেনে ৩০–৫০টি মাছ দেখে গড় ওজন বের করুন

  • এরপর খাবার নতুন গড় ওজন অনুযায়ী বাড়ান/কমান

যে ৩টা রেকর্ড রাখলেই লাভ:

  1. পোনা ছাড়ার তারিখ + সংখ্যা

  2. প্রতি সপ্তাহে মোট খাবার কত দিলেন

  3. মাস শেষে গড় ওজন/মরার সংখ্যা


৭) প্রাকৃতিক খাদ্য কমে গেলে কী করবেন? (ফার্টিলাইজেশন রুল)

আপনার লেখায় আছে: খাদ্য ঘাটতি হলে ইউরিয়া+টিএসপি দিন—এটা ঠিক, তবে আধুনিকভাবে পর্যবেক্ষণভিত্তিক দেওয়া ভালো।

লক্ষণ (খাদ্য কম/প্ল্যাংকটন কম)

  • পানি খুব স্বচ্ছ হয়ে যাওয়া

  • মাছের বৃদ্ধি ধীর হওয়া

তখন প্রয়োগ (আপনার ডোজ ধরে)

প্রতি শতাংশে:

  • ইউরিয়া ১৫০–২০০ গ্রাম

  • টিএসপি ১৫০–২০০ গ্রাম

⚠️ সতর্কতা:

  • পানি যদি আগে থেকেই খুব সবুজ/দুর্গন্ধ হয়—সার না দিয়ে আগে পানি/তলদেশ ম্যানেজ করুন

  • অতিরিক্ত সার দিলে পানি নষ্ট ও অক্সিজেন কমে যেতে পারে


৮) সবুজ খাবার (গ্রিন ফিড) — উৎপাদন বাড়ানোর সহজ উপায়

থাই সরপুঁটি নরম ঘাস/সবুজ উপাদান পছন্দ করে। নিয়মিত অল্প দিলেও উপকার:

  • ক্ষুদিপানা/টোপাপানা (পরিমিত)

  • নেপিয়ার ঘাস কুচি

  • কলাপাতা কুচি

✅ টিপস:
খুব বেশি সবুজ একসাথে দিলে পচে পানি নষ্ট করতে পারে—তাই অল্প করে নিয়মিত দিন।


৯) পানি ও অক্সিজেন ম্যানেজমেন্ট (আধুনিক “রিস্ক কমানো” অংশ)

থাই সরপুঁটি সহনশীল হলেও ভালো উৎপাদনের জন্য—

  • ভোরে মাছ যদি পানির ওপরে উঠতে থাকে/“হাঁসফাঁস” করে → অক্সিজেন কম
    করণীয়:

  1. খাবার সাময়িক কমান/বন্ধ করুন

  2. পানিতে ঢেউ তৈরি (বাঁশ টানা/প্যাডেলিং)

  3. সম্ভব হলে নতুন পানি দিন

  4. ঘন কাদা/গ্যাস হলে হররা/তলদেশ নেড়ে গ্যাস বের করুন


১০) রোগ-ঝুঁকি কমানোর ৬টি সহজ নিয়ম

  1. পোনা ছাড়ার আগে পুকুর প্রস্তুতি ঠিক করা

  2. একই সাইজের পোনা ব্যবহার

  3. অতিরিক্ত খাবার না দেওয়া (পানি নষ্ট হয়)

  4. মাসে অন্তত ১ বার স্যাম্পলিং

  5. পানি দুর্গন্ধ/অতিরিক্ত সবুজ হলে সার বন্ধ

  6. হঠাৎ মাছ মরলে—দ্রুত স্থানীয় মৎস্য অফিস/ভেটের পরামর্শ


১১) আহরণ ও বাজারজাত

সময়

  • ৫–৬ মাস পালনের পর মাছ সাধারণত ১২০–১৫০ গ্রাম

  • তখন বাজারে বিক্রির উপযোগী

আহরণ পদ্ধতি (স্মার্ট হারভেস্ট)

  • একবারে সব ধরার বদলে চাইলে ধাপে ধাপে বড় মাছ তুলে বিক্রি করতে পারেন

  • এতে ছোট মাছ আরও বড় হওয়ার সুযোগ পায়

সম্ভাব্য বাজারদর (আপনার লেখার মতো)

  • সাধারণত ৭০–৮০ টাকা/কেজি বা স্থানীয় বাজার অনুযায়ী কম-বেশি


সংক্ষেপে “চাষ ক্যালেন্ডার” (মডেল)

  • দিন ১–১৫: পুকুর শুকানো/প্রস্তুতি + চুন

  • দিন ৮–১৫: সার দিয়ে পানি ভরা

  • দিন ১৫–২৫: পানি তৈরি হলে পোনা মজুদ

  • মাস ১–৬: খাবার ৪–৬% + মাসে ১ বার স্যাম্পলিং

  • মাস ৫–৬: বাজারজাত/হারভেস্ট