শীতকালীন লাউ চাষ

বাংলাদেশের জলবায়ুতে লাউ চাষের উন্নত পদ্ধতি (বারি লাউ-১ ও জনপ্রিয় হাইব্রিড)

বাংলাদেশের শীতকালীন জলবায়ু লাউ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে উপযুক্ত জাত, পরিচর্যা ও রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে বছরের অন্যান্য সময়েও চারা রোপণ করে ফলন পাওয়া যায়।

উপযুক্ত মাটি

লাউ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জন্মে। তবে দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ মাটি লাউ চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো।

  • জমিতে পানি যেন জমে না থাকে

  • জৈব পদার্থ থাকলে গাছ দ্রুত বাড়ে ও ফলন ভালো হয়


১) জাত নির্বাচন

✅ অনুমোদিত/উদ্ভাবিত জাত

  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বারি লাউ–১ একটি উচ্চফলনশীল জাত।

  • এটি সাধারণভাবে সারা বছর চাষ করা যায় (যথাযথ পরিচর্যা থাকলে)।

✅ বাণিজ্যিক হাইব্রিড (বাজারে জনপ্রিয়)

বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির হাইব্রিড লাউও ব্যাপকভাবে আবাদ হয় (যেমন: মার্টিনা, জুপিটার ইত্যাদি)।

হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য উৎস, মেয়াদ ও প্যাকেটের নির্দেশনা দেখে বীজ কিনুন।


২) বীজ বপন ও চারা তৈরি

লাউ চাষে সাধারণত দুইভাবে বীজ বপন করা যায়—

ক) পলিব্যাগে চারা উৎপাদন (নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পদ্ধতি)

  1. মাটি মিশ্রণ

    • ৫০% পচা গোবর/জৈবসার + ৫০% বেলে/ঝুরঝুরে মাটি ভালোভাবে মিশিয়ে নিন

  2. পলিব্যাগের সাইজ

    • ব্যাস: প্রায় ৭.৫ সেমি

    • উচ্চতা: ১২–১৫ সেমি

  3. পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা

    • ব্যাগের তলায় ২–৩টি ছিদ্র করে দিন

  4. বপন

    • প্রতি ব্যাগে ১–২টি বীজ বপন করে হালকা পানি দিন

  5. রোপণের উপযোগী চারা

    • চারা সুস্থ, সবল, পাতায় দাগ/পোকা নেই—এমন চারা বেছে নিন

খ) সরাসরি জমির মাদায় বপন

  1. মাদা তৈরি

    • মাদার মাপ: প্রায় ৩০×৩০×৩০ সেমি

    • মাদায় সার দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিন

  2. বীজ বপন

    • প্রতি মাদায় ৪–৫টি বীজ বপন করুন

  3. চারা পাতলা করা (থিনিং)

    • বীজ বপনের ১০–১৫ দিন পর প্রতি মাদায় ২টি সুস্থ চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলুন


৩) বীজ বপনের সময় (শীতকালীন মৌসুম)

  • শীতকালীন লাউ চাষের জন্য সাধারণত সেপ্টেম্বর–অক্টোবর বীজ বপন উপযুক্ত।

  • আগাম শীতকালীন ফসল পেতে চাইলে আগস্টের মাঝামাঝি সময়েও বীজ বপন করা যায়।


৪) চারা রোপণ ও মাচা ব্যবস্থা

রোপণের দূরত্ব

  • সাধারণভাবে ২ মিটার × ২ মিটার দূরত্বে

  • প্রতি মাদায় ২টি সুস্থ চারা রোপণ করুন

মাচা/ট্রেলিস

  • লাউ গাছ লতানো হওয়ায় মাচা দেওয়া সবচেয়ে ভালো (ফল পরিষ্কার থাকে, রোগ কমে, ফলন বাড়ে)

  • তবে রবি মৌসুমে অনেক জায়গায় মাচা ছাড়াও চাষ করা হয়—তবে ফলের মান ও পরিচ্ছন্নতা কমতে পারে

বারি লাউ–১ এর ক্ষেত্রে মাচা দিলে সাধারণত ফলন ও গাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।


৫) অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা (যা নিয়মিত করবেন)

লাউ গাছ প্রচুর পানি শোষণ করে—তাই পরিচর্যা ঠিক রাখা খুব জরুরি।

সেচ: নিয়মিত প্রয়োজন অনুযায়ী গাছের গোড়ায় পানি দিন (পানি যেন জমে না থাকে)
মাটির চটা ভাঙা: উপরের শক্ত স্তর ভেঙে দিন—শিকড় সহজে বাতাস/পানি পায়
বাউনি/গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া: গাছের গোড়ার শক্তি বাড়ে
অপ্রয়োজনীয় নিচের শাখা/ডগা নিয়ন্ত্রণ: বাতাস চলাচল ভালো হয়, রোগ কমে


৬) পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা (নিরাপদ IPM পদ্ধতি)

লাউয়ে সাধারণত জাবপোকাফলমাছি বেশি দেখা যায়। রোগের মধ্যে পাউডারি মিলডিউডাউনি মিলডিউ উল্লেখযোগ্য।

ক) জাবপোকা

লক্ষণ: কচি পাতা/ডগায় বসে রস শুষে খায় → গাছ দুর্বল, বৃদ্ধি কমে যায়

ব্যবস্থাপনা (IPM):

  • আক্রান্ত ডগা/পাতা কেটে নষ্ট করুন

  • আগাছা পরিষ্কার রাখুন

  • গাছের ডগায় পানির হালকা স্প্রে/সাবান পানি (খুব অল্প) দিয়ে ধুয়ে দিতে পারেন

  • প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক কেবল লেবেল নির্দেশনাকৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করুন

খ) ফলের মাছি পোকা (ফ্রুট ফ্লাই)

লক্ষণ: কচি ফলে ডিম → ভেতরে লার্ভা ঢুকে ফল নষ্ট/পচা → ফল ঝরে যায়

ব্যবস্থাপনা (খুব কার্যকর):

  • আক্রান্ত ফল দ্রুত সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলুন/নষ্ট করুন

  • ফেরোমন ট্র্যাপ/বেইট ট্র্যাপ ব্যবহার করুন

  • ফল ছোট থাকতেই নেট/কাগজ ব্যাগ দিয়ে ফল ঢেকে দিলে আক্রমণ অনেক কমে

  • প্রয়োজন হলে অনুমোদিত দমনপদ্ধতি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিন

গ) পাউডারি মিলডিউ

লক্ষণ: পাতার উপর সাদা সাদা গুঁড়ার মতো আবরণ → পাতা শুকিয়ে যায়
ব্যবস্থাপনা:

  • গাছের ভেতর বাতাস চলাচল বাড়ান (শাখা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক দূরত্ব, মাচা)

  • পানি সেচ গোড়ায় দিন—পাতায় বারবার পানি না লাগানো ভালো

  • প্রয়োজন হলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক লেবেল ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শে

ঘ) ডাউনি মিলডিউ

লক্ষণ: পাতা ধূসর/ফ্যাকাসে, পাতায় দাগ/আবরণ দেখা যায়
ব্যবস্থাপনা:

  • আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলুন

  • জমিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা/পানি জমা বন্ধ করুন

  • প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের নির্দেশনায় ব্যবস্থা নিন

বারি লাউ–১ সাধারণভাবে এই দুই রোগের বিরুদ্ধে ভালো সহনশীলতা/প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখাতে পারে—তাই অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমে।


৭) ফসল সংগ্রহ

  • বীজ বোনার ৬০–৭০ দিনের মধ্যে (বারি লাউ–১) ফল ধরা শুরু করতে পারে

  • খুব কচি অবস্থায় ২–৩ দিন পরপর লাউ সংগ্রহ করলে ফলন ও মান ভালো থাকে

  • কাটার সময় ফলের ডাঁটা সামান্য রেখে কেটে নিন—গাছে আঘাত কম লাগে


৮) ফলন (সম্ভাব্য)

  • বারি লাউ–১ এ সাধারণভাবে প্রতি গাছে ১০–১২টি ফল হতে পারে

  • উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে

    • শীতকালে: হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪২–৪৫ টন

    • গ্রীষ্মকালে: হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০–২২ টন ফলন হতে পারে
      (ফলন জমি, পরিচর্যা, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ, জাত ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে কম-বেশি হতে পারে।)