দেশি পাবদার চাষ প্রযুক্তি

পাবদা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি
লেখক: এ. কে. এম. নূরুল হক (ব্রহ্মপুত্র ফিস সিড কমপ্লেক্স/হ্যাচারি, ময়মনসিংহ)

পাবদা মাছ আমাদের দেশীয় সুস্বাদু ও জনপ্রিয় একটি মাছ। একসময় হাওড়-বাঁওড় ও বিলাঞ্চলে এ মাছ সহজেই পাওয়া যেত। কিন্তু প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার ফলে পাবদা মাছ দিন দিন বিলুপ্তির পথে। এই বিলুপ্তপ্রায় মাছকে ব্যাপকভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০০২ সালে পাবদা মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হওয়া সম্ভব হয়েছে।

পাবদা মাছ উৎপাদনের শুরুতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—হাওড়-বাঁওড় থেকে জীবিত ব্রুড মাছ সংগ্রহ, ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কৃত্রিম খাবারে ব্রুড মাছকে অভ্যস্ত করা। সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণার হাওড়-বাঁওড় থেকে ব্রুড সংগ্রহ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—মাত্র প্রায় ৫% ব্রুড মাছ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। এরপর কৃত্রিম খাবারে অভ্যস্ত করানো ছিল আরেক বড় সাধনা; কারণ পুষ্টিকর খাবার ছাড়া ব্রুড মাছ থেকে মানসম্মত ডিম/রেণু পাওয়া যায় না। অবশেষে ব্রুড মাছ কৃত্রিম খাবারে অভ্যস্ত হওয়ার পর ২০০০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সফলভাবে পোনা উৎপাদন করা যায়। এরপর ব্রুড থেকে রেণু, রেণু থেকে পোনা উৎপাদন এবং সারাদেশে পোনা বাজারজাত শুরু হয়।

বর্তমানে স্বল্প পরিসরে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিতে যে কেউ চাহিদামাফিক পাবদার পোনা উৎপাদন করতে পারবে—এটাই লেখকের বিশ্বাস।


১) প্রজননক্ষম মাছ সংগ্রহ ও পরিচর্যা

পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১০–১১ মাস বয়সেই পাবদা মাছ প্রজননে সক্ষম হয়। সুস্থ ও সবল পুরুষ-স্ত্রী মাছ ৫০:৫০ অনুপাতে শতাংশপ্রতি ৭০–৮০টি মজুদ করা যায়। নিয়মিতভাবে মাছের দেহ ওজনের ৫% হারে সম্পূরক খাবার দিতে হবে।

সম্পূরক খাবার (ফর্মুলা):

  • ৩০% ফিশ মিল

  • ৩০% সরিষার খৈল

  • ৩০% অটোকুড়া

  • ১০% ভূষি

  • সাথে ভিটামিন প্রিমিক্স

বিকল্প হিসেবে বাজারের কৈ মাছের ফিড দিলেও চলবে।


২) প্রজননের জন্য উপযোগী পুরুষ-স্ত্রী মাছ বাছাই

পাবদা মাছের প্রজননকাল সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট পর্যন্ত। এ সময় স্ত্রী মাছের পেটে ডিম ভর্তি থাকে।
এছাড়া স্ত্রী পাবদা মাছের পাখনার কাঁটার খাঁজগুলো পুরুষের মতো ততটা স্পষ্ট নয়। প্রজননের জন্য মাছ বাছাইয়ের মূল ভিত্তি হলো—স্ত্রী মাছের উদরে ডিম ভর্তি অবস্থায় পরিপক্ব মাছ নির্বাচন


৩) হরমোন ইনজেকশনের দ্রবণ তৈরি ও প্রয়োগ পদ্ধতি

কৃত্রিম প্রজননের জন্য বাছাইকৃত সমপরিমাণ পুরুষ ও স্ত্রী মাছ নিয়ে পি.জি. (PG) হরমোন প্রয়োগ করা হয়।

ধাপগুলো

১) প্রজননক্ষম স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সমান অনুপাতে হাপায় ছাড়তে হবে।
২) প্রথম ইনজেকশনে শুধু স্ত্রী মাছকে প্রতি কেজি ওজনে ২–৩ মি.গ্রা. (অনেক ক্ষেত্রে ৩ মি.গ্রা./কেজি) হারে পাখনার কাটার নিচে ইনজেকশন দিতে হবে।
৩) প্রথম ইনজেকশনের ৬ ঘণ্টা পর স্ত্রী মাছকে প্রতি কেজি ৪–৬ মি.গ্রা. হারে দ্বিতীয় ইনজেকশন দিতে হবে এবং একই সময়ে পুরুষ মাছকেও প্রতি কেজি ৪–৬ মি.গ্রা. হারে ইনজেকশন দিতে হবে।
৪) দ্বিতীয় ইনজেকশনের ৭–৮ ঘণ্টার মধ্যে সাধারণত মাছ প্রাকৃতিকভাবে প্রজননক্রিয়ায় ডিম দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ টিপস: ইনজেকশনের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন মাছগুলো গভীর রাতে ডিম দেয়—রাত যত গভীর, পাবদা মাছ তত স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম দেয়।


৪) ডিম সংগ্রহের ২টি পদ্ধতি

(ক) হাপা পদ্ধতি (লেখকের মতে বেশি উপযোগী)

  • ১ সেমি ফাঁকবিশিষ্ট পলিথিন জাতীয় জাল দিয়ে হাপা বানাতে হবে

  • হাপার মাপ: দৈর্ঘ্য ১২ ফুট × প্রস্থ ৪ ফুট

  • হাপাটি সিস্টার্ণে এমনভাবে বসাতে হবে যেন হাপার তলা সিস্টার্ণের তলা থেকে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি উপরে থাকে

  • ইনজেকশন দেয়া পুরুষ-স্ত্রী মাছ ১:১ অনুপাতে হাপায় ছাড়তে হবে

  • কৃত্রিম ঝর্ণা দিয়ে স্রোত সৃষ্টি করতে হবে

  • প্রতি হাপায় ৬০–৭০ জোড়া মাছ ছাড়া যায়

  • ডিম দেয়া শেষ হলে ব্রুড মাছসহ হাপা তুলে নিতে হবে

ডিম কোথায় যাবে?
হাপার জালে ১ সেমি ফাঁক থাকায় ডিমগুলো জালের ফাঁক দিয়ে সিস্টার্ণের তলায় পড়ে জমা হবে। পলিথিন জাতীয় জাল হওয়ায় ডিম আটকে থাকার সম্ভাবনা কম। এরপর সাইফন দিয়ে ডিম প্লাস্টিক গামলায় সংগ্রহ করতে হবে।

(খ) সিস্টার্ণ/সার্কুলার ট্যাংক পদ্ধতি

  • ইনজেকশনকৃত ব্রুড মাছ সরাসরি সার্কুলার ট্যাংক/হাউজে ছাড়তে হবে

  • ঝর্ণা দিয়ে স্রোত তৈরি করতে হবে

  • ডিম সাধারণত ট্যাংকের মাঝখানে জমা হবে

  • সাইফন দিয়ে ডিম গামলায় সংগ্রহ করতে হবে

কেন হাপা পদ্ধতি ভালো?
লেখকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—সিস্টার্ণ পদ্ধতিতে ডিম দেয়ার পর পুরুষ পাবদা কিছু ডিম খেয়ে ফেলতে পারে


৫) ডিম ফোটানো ও রেণু প্রতিপালন

  • ডিম সংগ্রহ করে শিটের ট্রে বা সিমেন্টের সিস্টার্ণে রাখতে হবে

  • পানির উচ্চতা: ৩–৪ ইঞ্চি

  • ছিদ্রযুক্ত পাইপ দিয়ে ঝর্ণার ব্যবস্থা রাখতে হবে

  • ২০ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবে

  • বাচ্চা হওয়ার ৩ দিনের মধ্যে ডিম্বথলী শোষিত হয়ে রেণু হয়

  • বাচ্চা বের হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর ডিম্বথলী থাকা অবস্থাতেই খাবার নিতে পারে

খাবার ও খাওয়ানোর নিয়ম

পাবদা রেণু স্বগোত্রভোজী, তাই প্রতি ৩ ঘণ্টা পরপর খাবার দিতে হয়।

  • খাদ্য: ক্ষুদ্র লাল কেঁচো ভালোভাবে ব্লেন্ড করে ১–২ দিন খাওয়াতে হবে

  • এরপর রেণু পোনাকে পুকুরে স্থানান্তর করতে হবে


৬) প্রচলিত কিছু কৌশল কেন কম কার্যকর (লেখকের মতামত)

কিছু গবেষক বলেন—রেণুকে ১০–১২ দিন সিস্টার্ণে রেখে ১ ইঞ্চি সাইজ হলে নার্সারিতে নিতে। লেখকের মতে এতে সমস্যা:

  • পাবদা স্বগোত্রভোজী হওয়ায় ১০–১২ দিনে সিস্টার্ণে একটি আরেকটিকে খেয়ে ফেলবে; উল্লেখযোগ্য পোনা অবশিষ্ট থাকবে না

  • বিজ্ঞানীদের কিছু ডিম সংগ্রহ পদ্ধতিতে পাবদা আশানুরূপ ডিম দেয় না


৭) নার্সারি/আতুর পুকুর প্রস্তুতি

১) ব্যাঙ, সাপ ও অবাঞ্ছিত প্রাণী ঠেকাতে পুকুর চারপাশে জাল দিয়ে ঘের দিতে হবে
২) নার্সারিতে অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগ করা যাবে না
৩) সপ্তাহে ২ দিন হররা টানতে হবে
৪) খাদ্য: ৫০% কুঁড়া + ৫০% শুঁটকি মাছের গুঁড়া

  • প্রতিদিন রেণুর মোট ওজনের ২০% হারে দিতে হবে
    ৫) পাবদা সাধারণত রাতে খেতে পছন্দ করে, তাই খাবার রাতে ২ বার দেয়া যেতে পারে


৮) চাষ পদ্ধতি ও মজুদ ঘনত্ব

পাবদা মাছের একক চাষে খুব বেশি বড় হয় না। মিশ্রচাষে যেকোনো মাছের সাথে দিলে ৯–১০ মাসে একটি পাবদা প্রায় ৫০ গ্রাম হতে পারে।

মিশ্রচাষে মজুদ ঘনত্ব:

  • শতাংশপ্রতি ৩০–৫০টি পাবদা

তেলাপিয়ার সাথে পাবদা ভালো কেন?
তেলাপিয়ার অবাঞ্ছিত বাচ্চা পাবদা খেয়ে দ্রুত বড় হতে পারে।