হাঁসের জাত

উন্নত জাতের হাঁস পরিচিতি ও খামার ব্যবস্থাপনা গাইড

১) পিকিং / বেজিন হাঁস

উৎপত্তি: চীন

বৈশিষ্ট্য:

  • পালকের রং: সাদা

  • ডিমের রং: সাদা

  • দেহের আকার: বড়

উপযোগিতা:

  • মাংসের জন্য প্রসিদ্ধ

  • প্রাপ্তবয়স্ক ওজন: হাঁসা প্রায় ৪.৫ কেজি, হাঁসী প্রায় ৪ কেজি

  • বছরে গড়ে প্রায় ১৫০টি ডিম দেয়


২) মাসকোভি হাঁস

উৎপত্তি: দক্ষিণ আমেরিকা

বৈশিষ্ট্য:

  • পালকের রং: সাদা ও কালো

  • মাথায় লাল ঝুটি (কারাঙ্কল) থাকে

  • ডিমের রং: সাদা

  • দেহের আকার: বড়

উপযোগিতা:

  • মাংসের জন্য প্রসিদ্ধ

  • প্রাপ্তবয়স্ক ওজন: হাঁসা প্রায় ৫ কেজি, হাঁসী প্রায় ৪ কেজি

  • বছরে গড়ে প্রায় ১২০টি ডিম দেয়


৩) খাকী ক্যাম্পবেল হাঁস

উৎপত্তি: ইংল্যান্ড

বৈশিষ্ট্য:

  • পালকের রং খাকী—এই কারণে “খাকী ক্যাম্পবেল” নামকরণ

  • ডিমের রং: সাদা

  • ঠোঁট: নীলাভ/কালো

উপযোগিতা:

  • ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়

  • বার্ষিক ডিম উৎপাদন গড়ে ২৫০–৩০০টি

  • প্রাপ্তবয়স্ক ওজন: ২–২.৫ কেজি


৪) জিনডিং হাঁস

উৎপত্তি: চীন

বৈশিষ্ট্য:

  • হাঁসীর পালক: খাকীর মাঝে কালো ফোটা

  • হাঁসার পালক: কালো ও সাদা মিশ্রিত

  • ডিমের রং: নীলাভ

  • ঠোঁট: নীলাভ/হলদে

উপযোগিতা:

  • ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়

  • বার্ষিক ডিম উৎপাদন গড়ে ২৭০–৩২৫টি

  • প্রাপ্তবয়স্ক ওজন: ২–২.৫ কেজি


হাঁসের বাসস্থানের জন্য স্থান নির্বাচন

হাঁসের ঘর/শেড তৈরির আগে স্থান নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিবেচ্য বিষয়গুলো—

  1. উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে যেন বন্যার সময় পানিতে ডুবে না যায়।

  2. বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকতে হবে।

  3. ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

  4. মাংস ও ডিম বাজারজাত করার সুবিধা থাকতে হবে।

  5. পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

  6. পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

  7. চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে।

  8. খোলামেলা ও নিরিবিলি পরিবেশ হতে হবে।


ঘরের প্রকৃতি (House Types)

হাঁস পালনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ঘর বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন—

  • হ্যাচারি ঘর

  • বাচ্চার ঘর

  • গ্রোয়ার ঘর

  • ডিমপাড়া ঘর

ঘরের ডিজাইন/কাঠামো হতে পারে—

  • একচালা বা শেড টাইপ

  • দোচালা বা গ্যাবল টাইপ (‘অ’ টাইপ)

  • কম্বিনেশন টাইপ

  • মনিটর বা সেমিমনিটর টাইপ


ঘরের পরিচর্যা ও জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি

  • ঘরের লিটার পরিষ্কার রাখতে হবে এবং জীবাণুনাশক (যেমন চুন) দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

  • ঘরের দেয়াল-মেঝে ভালোভাবে পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে; কস্টিক সোডা দিয়ে পরিষ্কার করলে আরও ভালো।

  • ফিউমিগেশন শুরুর আগে দরজা, জানালা, ভেন্টিলেটর বন্ধ করতে হবে যাতে ঘরে বাতাস ঢুকতে না পারে।

  • ঘরের প্রতি ২.৮ ঘন মিটার জায়গার জন্য:

    • ৬ গ্রাম পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট

    • ১২০ মি.লি. ফরমালিন (৪০%)
      ব্যবহার করে ফিউমিগেট করতে হবে।


বাচ্চা পালন (Duckling Management)

  • বাচ্চা রাখার ঘর/শেড উঁচু জায়গায় (সমতল ভূমি থেকে ১–১.৫ ফুট উঁচু) নির্মাণ করতে হবে, যেন ভিটি ভেজা/স্যাঁতস্যাঁতে না হয়।

  • ঘরের মেঝে পাকা হলে ভালো।

  • মেঝেতে ২–৩ ইঞ্চি পুরু করে ধানের শুকনো তুষ/কাঠের গুঁড়া বিছিয়ে দিতে হবে।

  • মেঝে নিচ থেকে ভিজে উঠতে পারে—তাই প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ২–৩ বার লিটার উল্টে চুন মিশাতে হবে। এতে লিটার শুকনো থাকবে, জীবাণু ধ্বংস হবে এবং দুর্গন্ধ কমবে।

  • কোনো অবস্থাতেই বৃষ্টির পানি ঘরের মেঝেতে পড়তে দেওয়া যাবে না।

  • লিটার ভিজে গেলে তা ফেলে দিয়ে সাথে সাথে শুকনো লিটার দিতে হবে।

  • ড্রিংকার থেকে পানি যেন মেঝেতে না পড়ে—এ দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

খাওয়ানো (প্রথম দিকের নিয়ম):

  • বাচ্চা সংগ্রহের পর প্রথমে ভিটামিন মিশ্রিত পানি খেতে দিতে হবে।

  • এরপর শুকনো খাবার সামান্য পানিতে ভিজিয়ে খাওয়াতে হবে।

  • প্রতিদিন কমপক্ষে ৩–৪ বার খাবার দিতে হবে।

  • প্রতি বাচ্চাকে ৫–১০ গ্রাম করে সুষম খাবার খাওয়াতে হবে।

  • ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে খাবার দেওয়ার সময় আগে পানির পাত্রে পানি দিতে হবে, তারপর খাবার দিতে হবে—নইলে শুকনো খাবার গলায় আটকে বাচ্চা মারা যেতে পারে।

ব্রুডিং/তাপ ব্যবস্থাপনা:

  • ১ দিন বয়স থেকে ব্রুডিং প্রয়োজন।

  • প্রথম সপ্তাহে ঘরের তাপমাত্রা থাকবে ৯৫°F

  • এরপর প্রতি সপ্তাহে ৫°F করে কমাতে হবে

  • সাধারণভাবে:

    • গ্রীষ্মকালে ৩–৪ সপ্তাহ

    • শীতকালে ৬–৮ সপ্তাহ
      পর্যন্ত তাপ দিতে হয় (আবহাওয়াভেদে কম-বেশি হতে পারে)।

  • বিদ্যুৎ না থাকলে/কম থাকলে হ্যারিকেন, হ্যাজাকলাইট, কেরোসিন অথবা মাটির চুলা ব্যবহার করে তাপ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়।


হাঁসের খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা

হাঁসের খাদ্য

  • দেশী হাঁস জলাশয় ও ক্ষেতখামারে চরে জীবনধারণ করতে পারে।

  • উন্নত জাতের হাঁস পালনে বাড়তি যত্ন দরকার।

  • জলাশয়ে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাবার (শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, কেঁচো, শাপলা, ক্ষুদেপানা, ছোট মাছ, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ) থাকলে সকাল ও বিকালে পরিমিত দানাদার খাবার দিলেই চলবে।

  • হাঁসের খাবারের সাথে প্রচুর পরিমাণ পানি দিতে হয়।

  • হাঁসকে শুষ্ক খাদ্য দেওয়া ঠিক নয়; সবসময় ভেজা ও গুঁড়ো খাদ্য দেওয়া উচিত।

  • প্রথম ৮ সপ্তাহ ইচ্ছামত খেতে দেওয়া ভালো, পরে দিনে দু’বার দিলেই চলে।

সুষম খাদ্য তৈরির নির্দেশনা

সুষম খাদ্য তৈরির আগে নিশ্চিত করতে হবে—

  • প্রতিটি উপাদান সহজলভ্য, সস্তা, টাটকা এবং পুষ্টিমান ঠিক আছে।

  • কোনো অবস্থাতেই বাসি-পঁচা বা নিম্নমানের ফাংগাসযুক্ত খাবার দেওয়া যাবে না।

  • খাদ্যের প্রকৃতি, মিশ্রণ পদ্ধতি, হাঁসের জাত, ওজন, ডিম উৎপাদনের হার এবং শামুক-ঝিনুক/ধান/শেওলা/শাকসবজীর প্রাপ্যতা অনুযায়ী খাদ্য কর্মসূচি ঠিক করতে হবে।


খাবার পাত্র ও পানির পাত্র

বয়স অনুযায়ী খাবার ও পানির পাত্রের পরিমাণ (লিনিয়ার ইঞ্চি):

  • ১ দিন – ৩ সপ্তাহ: খাবার ২.০ | পানি ২.৫

  • ৪ সপ্তাহ – ৮ সপ্তাহ: খাবার ৩.০ | পানি ৩.০–৪.০

  • ৮ সপ্তাহ – ১৬ সপ্তাহ: খাবার ৪.০ | পানি ৪.০–৫.০


খামার ব্যবস্থাপনা ও দৈনিক কার্যক্রম সূচি

ক) সকাল ৭ – ৯ টা

  1. জীবাণুমুক্ত অবস্থায় শেডে প্রবেশ করে হাঁস-মুরগির সার্বিক অবস্থা ও আচরণ পরীক্ষা।

  2. মৃত বাচ্চা/বাড়ন বাচ্চা/মুরগি থাকলে তৎক্ষণাৎ অপসারণ।

  3. ডিম পাড়া বাসার দরজা খুলে দেওয়া।

  4. পানির পাত্র ও খাবার পাত্র পরিষ্কার করা।

  5. পাত্রে খাবার/পানি না থাকলে পরিষ্কার করে খাদ্য ও পানি সরবরাহ।

  6. লিটারের অবস্থা পরীক্ষা ও প্রয়োজন হলে পরিচর্যা।

  7. খাবার দেওয়ার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আচরণ পরীক্ষা।

খ) সকাল ১১ – ১২ টা

  1. খাদ্য নাড়াচাড়া করে দেওয়া।

  2. পানি গরম/ময়লা হলে পরিবর্তন করে পরিষ্কার ও ঠান্ডা পানি দেওয়া।

  3. ডিম সংগ্রহ করা।

গ) বিকাল ৪ – ৫ টা

  1. পাত্রে খাদ্য/পানি না থাকলে সরবরাহ করা।

  2. ডিম সংগ্রহ করা।

  3. ডিম পাড়ার বাসা/বাক্সের দরজা বন্ধ করা।

  4. আচরণ পরীক্ষা করা।

সাপ্তাহিক কাজ

  1. খাদ্য তৈরি করা।

  2. বাচ্চা/ডেকী মুরগী/মুরগীর নমুনা ওজন গ্রহণ।

  3. ঘর পরিষ্কার করা।

  4. ঘরের বাতি সপ্তাহে ২ দিন পরিষ্কার করা; খাদ্য ও পানির পাত্র পরিষ্কার এবং লিটার পরিচর্যা করা।


যদি তুমি চাও, আমি এটাকে গুগল পেজে কপি-পেস্টের জন্য HTML ফরম্যাট (Heading, bold, list) করে দিতে পারি—তাহলে পোস্ট করলে একদম সুন্দর দেখাবে।