বর্ষায় পোল্ট্রি খামার ব্যবস্থাপনা

বর্ষাকালে পোল্ট্রি খামার ব্যবস্থাপনা: করণীয়

লেখক: কৃষিবিদ বকুল হাসান খান

আষাঢ়ের অবিরল বৃষ্টি শুরু হলে পোল্ট্রি খামারিদের আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে একটানা বা থেমে থেমে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওঠানামা, কোথাও ঝড়–সাইক্লোন—এসব কারণে খামার ব্যবস্থাপনা অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে মানতে হবে—


১) শেড ও আশপাশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা

  1. পোল্ট্রি শেডের চারপাশে অন্তত ৫ মিটার খালি জায়গা রাখা/বাড়ানো ভালো।

  2. বাড়তি জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার, ঘাস ও ঝোপঝাড়মুক্ত রাখতে হবে।

  3. বাড়তি জায়গার উপরে ভালো ছাউনি দিন, যাতে বৃষ্টির পানি সরাসরি ঢুকতে না পারে।

  4. শেডের ছাদের যে কোনো ছিদ্র/চুইয়ে পড়া অংশ বৃষ্টি শুরুর আগেই ঠিক করতে হবে।

  5. অতিরিক্ত ছাউনি সম্ভব না হলে পলিথিন/আচ্ছাদনের ব্যবস্থা রাখুন। তবে খেয়াল রাখতে হবে—

    • অতিবৃষ্টিতে সামনে ও পেছনে চট/আবরণ থাকবে,

    • বৃষ্টি না থাকলে বড় মুরগির ক্ষেত্রে আচ্ছাদন উঠিয়ে দিন যেন আলো–বাতাস ঢোকে।

  6. বাচ্চা তোলার আগে শেডের পাকা মেঝে রিপেয়ারিং করে যতটা সম্ভব শুষ্ক রাখার ব্যবস্থা করুন।

  7. খামারের আশপাশে যেন বৃষ্টির পানি জমে না থাকে, প্রয়োজন হলে ড্রেনেজ তৈরি করুন। পানি জমে থাকলে রোগবালাই শেডে ঢোকার ঝুঁকি বাড়ে।


২) লিটার ব্যবস্থাপনা (Deep litter)

  1. জানালা/দেয়ালের পাশ দিয়ে পানি ঢোকে—এমন সব ফাঁক-ফোকর বন্ধ করতে হবে, যাতে লিটার ভিজে না যায়।

  2. লিটার শক্ত/চাপা হয়ে গেলে ভেঙে নরম করে নতুন শুকনা লিটার ছড়িয়ে দিন।

  3. লিটার শুকনা রাখতে লাইম পাউডার বা অন্যান্য শুকনা শোষক পদার্থ ব্যবহারে সতর্কতা রাখুন (মাত্রা ও ব্যবহার পদ্ধতি স্থানীয় প্রাণিসম্পদ/ভেটের পরামর্শ অনুযায়ী)।

  4. ভেজা লিটার কক্সিডিওসিস, এন্টারাইটিস, কৃমি সংক্রমণ বাড়াতে পারে—তাই ভেজা অংশ দ্রুত সরিয়ে নতুন শুকনা লিটার দিন।

  5. লিটারের অবস্থা ঠিক রাখতে সপ্তাহে অন্তত ১ দিন নেড়ে দিন

  6. লিটারের আর্দ্রতা বোঝার সহজ পরীক্ষা: একমুঠো লিটার হাতে নিয়ে হালকা চাপ দিয়ে ছেড়ে দিন—

    • যদি বলের মতো না হয় এবং ঝুরঝুরে থাকে → অবস্থা ভালো।

  7. যারা আখের ছোবড়া লিটার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে—ভিজে গেলে দ্রুত বদলে ফেলুন।


৩) খাবার ও খাদ্য সংরক্ষণ (বর্ষায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ)

  1. বর্ষার সময় পরিবহনে খাদ্য আর্দ্রতা শোষণ করে দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই সম্ভব হলে বৃষ্টি শুরুর আগেই ভালো মানের খাদ্য কিনে মজুদ করুন।

  2. খাদ্যের বস্তা কাঠের মাচায় রাখুন—

    • মেঝে থেকে এবং দেয়াল থেকে অন্তত ১ ফুট দূরে থাকবে।

  3. পাকা ঘরে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য আলাদা স্টোররুম থাকলে ভালো—যাতে কোনোভাবেই পানি ঢোকে না, আর্দ্রতা কম থাকে।

  4. আর্দ্রতা বেশি হলে খাদ্যে ফাংগাস/মোল্ড হতে পারে—এ থেকে আফলাটক্সিন (B1, B2, G1, G2) তৈরি হয়। এর মধ্যে B1 সবচেয়ে ক্ষতিকর। সম্ভাব্য ক্ষতি—

    • ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া

    • বৃদ্ধি ব্যাহত

    • ফিড কনভার্সন খারাপ

    • লিভার সমস্যা/টিউমার

    • এমনকি মৃত্যু

  5. তাই বর্ষায় খাদ্যে ভালো মানের টক্সিন বাইন্ডার ব্যবহার (লেবেল/ভেটের নির্দেশনা অনুযায়ী) এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেওয়া আছে এমন খাদ্য বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

  6. মজুদ করার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে—ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি খাদ্য একসাথে সংরক্ষণ করবেন না।


৪) ঝিনুক/ক্যালসিয়াম উৎস মজুদ

বর্ষাকালে অনেক এলাকায় ঝিনুকের ঘাটতি হয়। যেহেতু এটি তুলনামূলক সস্তা এবং দীর্ঘদিন রাখা যায়, তাই সম্ভব হলে আগেই কিনে মজুদ রাখা ভালো। তবে সংরক্ষণস্থলের তাপ–আর্দ্রতা বিবেচনায় নিয়ে মজুদ করবেন।


৫) পানি নিরাপত্তা (বর্ষায় পানি সহজে দূষিত হয়)

বর্ষায় পুকুর, নদী, টিউবওয়েল, এমনকি ট্যাপের পানিও অনেক সময় জীবাণু দ্বারা দূষিত হতে পারে। তাই পানির মান নিশ্চিত করা জরুরি।

  • এলাম দিয়ে পরিশোধন করে ২৪ ঘণ্টা বসিয়ে (অধঃক্ষেপণ) ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • ক্লোরিন/ব্লিচিং পাউডার দিয়ে বিশুদ্ধকরণও করা হয়—তবে মাত্রা, মিশ্রণ ও প্রয়োগ অবশ্যই প্রশিক্ষিত ব্যক্তি/ভেটের নির্দেশনা ও লেবেল অনুযায়ী করতে হবে, কারণ ভুল মাত্রায় ক্ষতি হতে পারে।


৬) মল ব্যবস্থাপনা ও বায়োসিকিউরিটি

  1. পোল্ট্রি মল রোগ বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখে—তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর মল অপসারণ করুন।

  2. বর্ষায় মশা, মাছি ও পোকামাকড় বেড়ে যায়—শেডের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখুন, দরজা/ভেন্টিলেশনে নেট দিন।

  3. জীবাণুনাশক স্প্রে/ব্যবহার করলে লেবেল নির্দেশনাভেটের পরামর্শ মেনে চলুন (যাতে পাখি, মানুষ ও পরিবেশ নিরাপদ থাকে)।