Showing posts with label শিং-মাগুর মাছ. Show all posts
Showing posts with label শিং-মাগুর মাছ. Show all posts

মাছ চাষ পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড ও করনীয়

পুকুরের ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন দ্রুত হলে মাছ চাষে পুকুরের নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়, যা মাছ চাষের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে না। পুকুরের যে সকল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যমান তার মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড মাছ চাষ পুকুরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পুকুরের পানিতে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের উৎস্য: মাছ চাষ পুকুরে কার্বন ডাই অক্সাউডের প্রাথমিক উৎস হল -(১).মাছের ও কিছু অনুজ প্রাণির শ্বসন (২) পুকুরের তলদেশে ডিকম্পজিশন বা পচন (৩) সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে দূর্বল বাইকার্বনিক এসিডের রাসায়নিক ভাংগন ইত্যাদি। পুকুরের মাছ ২৪ ঘন্টা শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস ত্যাগ করে। দিনের বেলায় সূর্যালোকের উপস্থিতিতে পুকুরের সবুজ উদ্ভিদ কণা সালোকসংশ্লেসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করে থাকে। একই জলজ উদ্ভিদ কণা রাতের বেলায় শ্বসন প্রক্রিয়ার জন্য পুকুরের দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে থাকে। এই জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলে পুকুরে দিনের বেলায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমান বাড়তে থাকে এবং রাত্রে অক্সিজেনের পরিমান কমতে থাকে। সাধারনত দিনের বেলায় সূর্যের আলোর তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে অক্সিজেন উৎপাদনের পরিমান বাড়তে থাকে ফলশ্রুতিতে দুপুর ১ টা থেকে ৩ টার মধ্যে পুকুরের অক্সিজেনের মাত্রা সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয়। বিপরীতক্রমে রাতে পুকুরের অক্সিজেনের পরিমান কমতে থাকে এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বাড়তে থাকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পুকু
রের অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের বিপরীত মূখী অবস্থান। রাতে যখন পুকুরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বাড়তে থাকে বা কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব বেড়ে যায়, ঠিক সে সময় মাছের ফুলকার মাধ্যমে মাছের রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রবেশ ঘটে ফলশ্রুতিতে মাছের রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বৃদ্ধি পেতে থাকে। মাছের রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বৃদ্ধি রক্তে হিমোগ্লোবিনে আক্সজেন সরবরাহে বাধা প্রয়োগ করে ফলে চাষকৃত মাছ বড় ধরনের ধকলের সম্মুখীন হয়। মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হয়। মাছ চাষ পুকুরের ফাইটোপ্লাংটন বা উদ্ভিদ কণা কার্বন ডাই অক্সাইড ও অক্সিজেন চক্র নিয়ন্ত্রনে প্রধান সহায়ক ভূমিকা হিসাবে পালন করে। পুকুরের অতিরিক্ত ফাইটোপ্লাংটন বা ফাইটোপ্লাংটন ব্লুম কার্বন ডাই অক্সাইড ও অক্সিজেন চক্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে ফলে রাত্রে ও দিনে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড এর তারতম্য ব্যপক হারে পরিলক্ষিত হয় যা মাছ চাষ পুকুরের ক্ষতির কারণ হয়। সে জন্য চাষ পুকুরের ফাউটোপ্লাংটন ব্লুম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী।

গ্রীষ্ম কালে পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইডের সমস্যা: সাধারনত মাছ চাষ পুকুরে শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে কার্বন ডাই অক্সাইডজনিত সমস্যা বেশী দেখা দেয়। শীত কালে পুকুরের কম খাদ্য ব্যবহার ও ডাইজেশন প্রক্রিয়ায় কম অক্সিজেনের ব্যবহার সাধারনত কম হয়, কিন্তু গরমকালে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। বেশী তাপমাত্রায় (২৮-৩৪ ডি:সে:) মাছ সহ পুকুরের অন্যান্য অণুজীবের মেটাবলিজম ও রেসপ্রেরিয়েশন পাশাপাশি খাদ্য প্রয়োগ ও খাদ্য গ্রহণের হার বেড়ে যায়। গ্রীষ্মকালে পুকুরের তলদেশে খাদ্যে ও অন্যন্য পদার্থের পচন এর জন্য প্রচুর পরিমান অক্সিজেনের প্রয়োজনের ফলে পুকুরের দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমান কমে গিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইডের উৎপাদন বেড়ে যায়। মাছ চাষের ক্ষেত্রে গ্রীষ্মকালে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন জরুরী যাতে করে পুকুরে অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড ও পিএইচ এর সম্পর্ক: মাছ চাষ পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড ও পিএইচ এর সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। সাধারনত পুকুরের পানির কার্বন ডাই অক্সাইড এর মান বেড়ে গেলে পিএইচ এর মান কমতে থাকে, বিপরীতক্রমে কার্বন ডাই অক্সাইড এর মান কমে গেলে পিএইচ এর মান বেড়ে যায়। দিনের বেলায় ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ কণা সূর্যালোকের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করে অক্সিজেন উৎপন্ন করে, ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ায় ব্যপকহারে কার্বন ডাই অক্সাইডের ব্যবহারের ফলে পুকুরের পানিতে এসিডিটির পরিমান কমতে থাকে। বিধায় দিনের বেলায় পুকুরে পিএইচ এর মান স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই বাড়তে থাকে কিন্তু রাতের বেলায় এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়, রাতের বেলায় শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুকুরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বাড়তে থাকে যার ফলে পানিতে এসিডিটির পরিমান বাড়তে থাকে, ফলশ্রুতিতে রাতে পুকুরে পিএইচ মান কমতে থাকে। মাছ চাষ পুকুরে পিএইচ মানের ব্যাপক উঠা নামা মাছের উপর ধকলের সৃষ্টি করে বিধায় উৎপাদনে এর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ পুকুরের দিন ও রাত্রেও পিএইচ এর তারতম্য পরীক্ষা করা জরুরী।

মাছ চাষ পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড দূরীকরনের উপায়:- যেহেতু অধিক ঘনত্বের মাছ চাষ পুকুরে বেশী পরিমান কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয় সেহেতু সঠিক মাত্রায় কার্বন ডাই অক্সাইড এর মান বজায় রাখা মাছ চাষ পুকুরের জন্য অধিক সহায়ক। পুকুরের রাসায়নিক পক্রিয়ায় বা বিভিন্ন প্রকার চুন প্রয়োগের মাধ্যমে পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এতে যে সকল ফ্যাক্টর বিবেচনায় রাখতে হবে- (ক) পুকুরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমান বা কনসেনট্রেশন (মি.গ্রা./লি.) (খ) পুকুরের আয়তন(গ) পুকুরে পানির গভীরতা রাসায়নিক উপায়ে কার্বন ডাই অক্সাইড নিয়ন্ত্রণের পূর্বে অবশ্যই পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড এর পরিমান এবং পিএইচ এর মান নির্ণয় করা জরুরী। পুকুরের পানির পিএইচ মান ৮.৫ এর বেশী হলে লাইম এজেন্ট ব্যবহারে শতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, বিশেষ করে একবারে সমস্ত লাইম এজেন্ট ব্যবহার না করে ধাপে ধাপে ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি পুকুরের পানির পিএইচ মান ৯ বা তার উপরে হয় সে ক্ষেত্রে লাইম এজেন্ট ব্যবহার না করাই উত্তম। বর্তমানে বাজারে উন্নত মানের দানাদার জিওলাইট ব মেট্রিক্স পাওয়া যায়, তা নিয়ামত পুকুরে ব্যবহারে পুকুরের কার্বন ডাই অক্সাইড বা পানির পিএইচ মান নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উপসংহারে বলা যায় বানিজ্যিক ভাবে মাছ চাষ পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে পানির পিএইচ মান নিয়ন্ত্রণ করা অতিব জরুরী। অন্যথায় মাছের যে কোন সমস্যা দেখা দিলে আশাঅনুরুপ ফলাফল পাওয়া কষ্টসাধ্য। যেহেতু পানির পিএইচ মান নিয়নন্ত্রণে কার্বন ডাই অক্সাইড বিশেষ ভূমিকা পালন করে, সেহেতু পুকুরে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে নিন্মলিখিত পদক্ষপ নেয়া যেতে পারে-
১. পুকুরের পানির গভীরতা ৫ ফুটের বেশী রাখা।
২. পুকুরে যথা সম্ভব পানি পরিবর্তনের ব্যবস্থা রাখা বা করা।
৩. পুকুরের মাছের সঠিক ঘনত্ব বজার রাখা।
৪. সঠিক ভাবে খাদ্য ব্যবস্থাপনা করা।
৫. ভাল মানের খাদ্য প্রয়োগ কার ।
৬. পুকুরের তলদেশের পচন জনিত গ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখা (প্রয়োজনে বাজারে ব্যবহৃত জিওলাইট বা মেট্রিক্স জাতিয় পণ্য ব্যবহার করা)
৭. পুকুরের ফাইটোপ্লাংটন ব্লুম নিয়ন্ত্রণ করা (পুকুরের ব্লুম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে প্রো-বায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে, বাজারে বহুল ব্যবহৃত প্রোবায়োটিক প্রফস্ ব্যবহারে ভাল ফলাফল পাওয়া যায় বা ভাল অন্যান্য প্রোবায়োটিকও ব্যবহার করা য়েতে পারে)।

সর্বোপরি বলা যেতে পারে বাণিজ্যিক ভাবে মাছ চাষে পুকুরের উন্নত পরিবেশ, সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ভাল মানের পোনা ও খাদ্য মাছ চাষে লাভজনক ফলাফল এনে দিতে পারে।

দেশি শিং মাছের আধুনিক চাষ

মাছের বাজারে দেশি শিং বা জিয়ল মাছের চাহিদা ব্যাপক। সুস্থ-অসুস্থ সব শ্রেণীর মানুষের পছন্দের মাছ শিং। আমাদের খালবিলে এক সময় প্রচুর শিং মাছ পাওয়া যেত। বিভিন্ন কারণে এখন আর শিং মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না। আগে শিং মাছ পুকুরে চাষ করা হতো না। সে কারণে শিং মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আমাদের দেশের মৎস্য খামারিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে শিং মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধলার এলাকার মাছ চাষিরা দেশি শিং মাছ চাষ করে আর্থিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। এক শতাংশের ছোট একটি পুকুরে শিং মাছ চাষ করে প্রতি ছয় মাস পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। তাদের এ সফলতাকে সামনে রেখে আগ্রহী মাছ চাষিদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পথ সুগম হয়েছে। বর্তমান সময়ে শিং মাছ চাষ বেশি লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এ মাছ চাষের ব্যাপকতা। মাছ চাষকে কেন্দ্র করে ধলায় গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৎস্য হ্যাচারি। অন্তত ৫০০ পরিবার মাছ চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হয়েছে; কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার লোকের। দেশি ছোট ছোট পুকুর বা পরিত্যক্ত পুকুর শিং মাছের চাষের আওতায় আনা গেলে শিং মাছের চাষে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

শিং চাষের সুবিধা : শিং মাছ সুস্বাদু এবং বাজার চাহিদা অনেক বেশি।

ডোবা, ছোট ছোট পরিত্যক্ত পুকুর এবং পরিকল্পিত পুকুরে চাষ যোগ্য। অন্যান্য মাছের তুলনায় কম অঙ্েিজন এবং কম খাদ্যে বাঁচে। সাধারণ প্রতিকূল অবস্থা কাটাতে পারে। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন করা যায়। সম্পূরক খাবারে সহজে অভ্যস্ত। একক এবং মিশ্র চাষ করা যায়।পুকুর প্রস্তুতি : সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের পুকুরে শিং চাষ অধিক উপযোগী, তবে এক একরের পুকুরেও চাষ করা যায়। প্রথমে পুকুরের পানি সেচ দিয়ে শুকিয়ে পুকুরের তলদেশে রোদ লাগাতে পারলে ভালো হয়। এ সময় পাড় কাটা পুকুরের ক্ষেত্রে নিজেদের মনের মতো পুকুর প্রস্তুত করা যায়। শুকানো সম্ভব না হলে পানিপূর্ণ পুকুরে প্রথমে রোটেনন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যায়। ফসটঙ্নি (ম্যাজিক গোল্ড ট্যাবলেট প্রয়োগে অবাঞ্ছিত ও রাক্ষুসে মাছ অপসারণ বেশি কার্যকর। পরে প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে পুকুর প্রস্তুতির মূল কাজ শুরু করা হয়। প্রয়োগের পর প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম শিং ব্রাইট গোল্ড (দানাদার) প্রয়োগ করলে পানির ঢ়ঐ স্থির থাকবে। এরপর প্রতি শতাংশে পাঁচ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ৫০ গ্রাম টিএসপি একত্রে গুলে প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পাঁচ থেকে ছয় দিন পর শিং মাছের ২ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি সাইজের পোনা মজুদ করা যাবে।

পোনার পরিমাণ কত হবে : একক চাষে শিং মাছ প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১ হাজার পোনা ছাড়া যায়। এক্ষেত্রে পোনা ছাড়ার আগে এবং পরে পুকুরের পানির গুণাগুণ রক্ষা করতে হবে। পানি পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে পোনা কম ছাড়া ভালো। মিশ্র চাষে মাগুর এবং কৈ মাছের সঙ্গেও শিং মাছ ভালো হয়। এক্ষেত্রে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যবান পোনা অপরিহার্য।

কী খাবার দিতে হবে : শিং মাছের জন্য অধিক প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ ভালো। শিং মাছ পুকুরের তলদেশের জলজ কীট খেয়ে থাকলেও লাভজনক চাষে মানসম্মত সম্পূরক খাবার (কমপক্ষে ৩২ ভাগ প্রোটিনসমৃদ্ধ) অপরিহার্য। এক্ষেত্রে কারখানায় প্রস্তুতি মানসম্মত খাবার উত্তম, তবে মানসম্মত ভাসমান খাবার প্রয়োগেরও শিং চাষ করা যায়। এক্ষেত্রে পুকুরের তলদেশের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষা করা যায়।

চাষের মেয়াদকাল : মানসম্মত পোনা, সুষম খাবার এবং আদর্শ চাষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ছয় থেকে সাত মাসে প্রতিটি শিং মাছ ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম হয়ে থাকে। এ সময়ের মধ্যে নিয়মিত পানির গুণাগুণ আদর্শমাত্রায় রক্ষা করা গেলে আরও ভালো ফল প্রত্যাশা করা যায়।

চাষের আদর্শ সময় : এপ্রিল-মে মাস থেকে এ মাছ চাষ শুরু করা যায়। যারা আগের বছরের শেষ দিকে নার্সিংয়ে চাপে পোনা রাখেন, তারা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকে পরিকল্পিত চাষ শুরু করতে পারেন। তবে প্রতি বছরে মে-জুন থেকে পোনাপ্রাপ্তি সুবিধা হয়।
চাষ পরিচর্যা : শিং মাছ চাষে অনেক বেশি পানি দরকার হয় না। পোনা নার্সিংয়ের সময় ২ থেকে ২.৫ ফুট পানিই যথেষ্ট, পরে ৩ থেকে ৩.৫ ফুট পানিতে শিং মাছ চাষ করা যায়।

পোনা ছাড়ার পর নিয়মিত ও পরিমিত খাবার দিতে হবে। মোট খাবারকে দুই থেকে তিনবারে ভাগ করে দেয়া ভালো।
হ্যাচারি থেকে নেয়া ছোট পোনা সরাসরি চাষে না দিয়ে আলাদা নার্সিং করে ২ ইঞ্চি থেকে ৩ ইঞ্চি হলে চাষ পুকুরে দেয়া উত্তম।
পুকুরের পানির গুণাগুণ এবং তলদেশের পরিবেশের ওপর শিং মাছের বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই পানির গুণাগুণ রক্ষা করা আবশ্যক। প্রতি মাসে একবার শিঙাইট ও প্রোবায়োটিঙ্রে সমন্বয়ে অ্যাকোয়া ম্যাজিক প্লাস একবার প্রয়োগ করলে পুকুরের তলদেশ এবং পানির গুণাগুণ রক্ষা করতে সহায়ক হবে।

কখনও কখনও পোনার ত্বক ও ঠোঁটে তুলার মতো সাদা দাগ দেখা দিতে পারে। সেপ্রোলেগনিয়া নামক ছত্রাকের জন্য এমনটি হয়। এক্ষেত্রে প্রতি একরে প্রতি ৩ ফুট পানির জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার পলগার্ড প্লাস পরপর দুই দিন দুই ডোজ ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া ফরমালিন বা ম্যালাকাইট গ্রিনের মাধ্যমেও চিকিৎসা করা যায়। পরজীবী বা প্রোটোজোয়া কর্তৃক শিং মাছ আক্রান্ত হলে ডেলেটিঙ্ প্রয়োগে চমৎকার সুফল পাওয়া যায়। বেশি খাবার প্রয়োগ বা জৈব পদার্থের পচনের মাধ্যমে পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, এ অবস্থায় মাছ মারা যেতে পারে খুব দ্রুত। এ সমস্যা দূরীকরণে প্রতি একরে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম গ্যাসোনেঙ্ প্লাস সারা পুকুরে (বালির সঙ্গে মিশিয়ে) ছিটিয়ে দিলে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে পানি পরিবর্তন করে দিতে পারলে ভালো হয়। মূলত অ্যামোনিয়াজনিত সমস্যাই শিং মাছের চাষে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক।

মানসম্মত খাবার ছাড়া শিং চাষ লাভবান হয় না। প্রাণিজ প্রোটিন হিসেবে মিট অ্যান্ড বোন মিলের ব্যবহারের পরিবর্তে ভালো মানের ফিশমিল ব্যবহার করা আবশ্যক। খাবারের সঙ্গে দ্রুত হজমের জন্য বায়োজাইম এবং গ্রোথ প্রোমোটর (র‌্যাপিড গ্রো) প্রয়োগ করলে অত্যন্ত ভালো ফল লক্ষ করা যায়।

শিং মাছের পুকুরের মধ্যে বা একপাশে বাঁশের বেষ্টনীর মধ্যে কিছু কচুরিপানা রাখা গেলে পানির পরিবেশ এবং শিং মাছের জন্য উপযোগী হয়।

মাছে কখনও কোনো ক্ষত রোগ বা সমস্যা দেখা দিলে পানিতে শক্তিশালী ঝধহরঃরুবৎ হিসেবে পলগার্ড বা চড়হফ ঝধভব প্রয়োগ করা আবশ্যক। তাছাড়া এসব ক্ষেত্র পুকুরের তলদেশের পানি কমিয়ে নতুন পানি প্রয়োগ মাছের জন্য সুবিধাজনক।

রোগ প্রতিরোধ করার জন্য চাষকালীন সময়ে দ্বিতীয় মাস থেকে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পলগার্ড প্লাস অথবা পন্ড সেফ, দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাসোনেঙ্ প্লাস এবং তৃতীয় সপ্তাহে অ্যাকোয়া ম্যাজিক প্লাস প্রয়োগ করলে রোগমুক্ত মাছ চাষ করা সম্ভব। মাঝে মধ্যে মাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক।


বিস্তারিত পরামর্শের জন্য লেখকের সাথে যোগাযোগ ০১৯২৬৯৯০৫০০ করতে পারেন।

পুকুরে মাগুর মাছ চাষের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপত্র

মাগুর মাছ চাষে সুবিধা

ছোট-বড় সব ধরনের জলাশয়ে শিং ও মাগুর মাছ চাষ করা যায়। এসব মাছ বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন নিতে পারে বলে চাষে ঝুঁকি কম। অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায়। তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা বেশি। বাজারমূল্য ভালো। সুষ্ঠু খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাগুর মাছ ২০০–২৫০ গ্রাম ওজনে উন্নীত করা যায়।


পুকুরের আয়তন ও গভীরতা

  • ব্যবস্থাপনা সুবিধার জন্য পুকুর আয়তাকার হলে ভালো।

  • পুকুরের আয়তন ২০–৫০ শতাংশ হলে ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।

  • তবে পুকুরের আয়তন ১০০ শতাংশের বেশি না হওয়াই ভালো।

  • পুকুরের গড় গভীরতা ৪.৫–৫.৫ ফুট হলে ভালো হয়।


নিরাপত্তা বেষ্টনী (ঘের) তৈরি

পুকুর প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিরাপত্তা বেষ্টনী/ঘের দেওয়া। পুকুরের চার পাড়ে বর্ষাকালের পানির লেভেলের অন্তত ২ ফুট উপরে শক্ত করে ঘের দিতে হবে। ঘের না দিলে বৃষ্টির সময় কানকো দিয়ে পরিভ্রমণ করে মাগুর/শিং মাছ পাড় বেয়ে পুকুরের বাইরে চলে যেতে পারে।

সাধারণত কৈ মাছ পানিতে ১.৫ ফুট পর্যন্ত লাফ দিতে পারে—তাই ১–১.৫ ফুট উঁচু ঘের দিলেও চলে। তবে সাপ, ব্যাঙ প্রভৃতি শত্রু থেকে রক্ষার জন্য ঘের কমপক্ষে ২.৫ ফুট উঁচু দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

ঘের তৈরির উপকরণ হিসেবে টিন, ঘন ফাঁসের নাইলন জাল, বাঁশের বানা ব্যবহার করা যায়। কেস কালচারের প্লাস্টিক নেট বেশ কার্যকর। স্থায়ীভাবে করতে চাইলে ইটের গাঁথুনি দিয়েও ঘের দেওয়া যায়। ঘের দেওয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে—নীচে যেন কোনো ফাঁকা না থাকে এবং ঘের যেন মজবুত ও টেকসই হয়। ঘেরে গাফিলতি করলে পরবর্তী পর্যায়ে চাষি বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

ঘের তৈরির সামগ্রী

নাইলনের জাল, বাঁশের খুঁটি/গাছের ডালের খুঁটি, সুতলি, কোদাল ইত্যাদি।

ঘের তৈরির পদ্ধতি

  • পুকুর পাড়ের উপর চারদিকে ৬ ইঞ্চি গভীর করে পরিখা খনন করতে হবে।

  • পরে ৮–১০ ফুট পরপর বাঁশের খুঁটি/ডাল শক্ত করে পুঁতে দিতে হবে।

  • এরপর নাইলনের নেট দিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলতে হবে।

  • পরিখার ভেতর নেট ঢুকিয়ে পরিখার মাটি দিয়ে নেটকে শক্ত করে আটকে দিতে হবে।

  • কিছু খামারে কমদামের টিন দিয়েও বেষ্টনী করা হয়; নিম্নমানের টিন ৩–৪ বছর ব্যবহার করা যায়।

ঘের তৈরির সময়

পুকুর শুকানোর পর ঘের তৈরি করা উত্তম। পুকুরে পানি না থাকলে ব্যাঙ, সাপ ইত্যাদি ক্ষতিকর প্রাণী সাধারণত থাকে না। পানি ভর্তি করার পর পানিতে বসবাসকারী প্রাণী ঢুকে পড়ে। তাই পুকুর সেচ দেওয়ার পরপরই ঘের তৈরি করে পরে পুকুর প্রস্তুতির অন্যান্য কাজ করা ভালো।

ঘের পর্যবেক্ষণ

ঘের পর্যবেক্ষণ প্রতিদিনের রুটিন কাজ হওয়া উচিত। বাতাস, বন্য প্রাণী ইত্যাদি ঘের উঠিয়ে/ভেঙে ফেলতে পারে। বাণিজ্যিক খামারে বেশি ঘনত্বে মাছ চাষ হয় বলে কুকুর-শিয়ালকে বড় মাছ ধরে খেতে দেখা যায়—তাই এরা ঘের ক্ষতি করতে পারে।


পানির স্বচ্ছতা ও ঘোলাত্ব

পুকুরের পানি ঘোলা হলে সূর্যালোক নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে না—ফলে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য (উদ্ভিদ-প্ল্যাঙ্কটন) উৎপাদন কমে যায়। আবার পানির উপরিভাগে অতিরিক্ত উদ্ভিদ-প্ল্যাঙ্কটন তৈরি হলেও স্বচ্ছতা কমে যেতে পারে, এতে অক্সিজেনের অভাবে মাছের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

পানির স্বচ্ছতা ২৫ সেন্টিমিটার হলে পুকুরের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হয়। ঘোলা পানি মাছের খাদ্য চাহিদাকে প্রভাবিত করে। ঘোলা পানিতে দ্রবীভূত কণা মাছের ফুলকায় আটকে ফুলকা বন্ধ করে দেয়—ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং খাদ্য চাহিদা কমে যায়।

ঘোলাত্ব কমানোর উপায়

  • প্রতি শতকে ১.০–১.৫ কেজি জিপসাম প্রয়োগ করে ঘোলাত্ব দূর করা যায়।

  • পুকুরের কোণায় খড়ের ছোট ছোট আটি রেখে দিলেও ভালো ফল পাওয়া যায়।


অক্সিজেনের ঘাটতি হলে করণীয়

  • পানির উপরিভাগে ঢেউ সৃষ্টি করে/পানি আন্দোলিত করে

  • সাঁতার কেটে বা বাঁশ পিটিয়ে বা হাত দিয়ে পানি ছিটিয়ে

  • পাম্প দিয়ে নতুন পানি সরবরাহ করে


পুকুর প্রস্তুতি

পোনা মজুদের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পুকুরকে চাষ উপযোগী করা। প্রথমে পুকুর সেচ দিয়ে শুকানো প্রয়োজন। পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে প্রতি শতাংশে প্রতি ফুট গভীরতার জন্য ২৫–৩০ গ্রাম রোটেনন পাউডার পানিতে গুলিয়ে সমভাবে ছিটিয়ে সব ধরনের মাছ অপসারণ করা যায়।

এরপর পুকুরের তলায় শতাংশ প্রতি ১ কেজি চুন ছিটিয়ে ৪–৫ দিন রোদে শুকিয়ে ২–৩ ফুট পানি ভর্তি করা উচিত। চুনের পাশাপাশি জিওলাইট (প্রতি শতকে ১–২ কেজি) পুকুর প্রস্তুতির সময় ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক খাদ্য বৃদ্ধির জন্য সার প্রয়োগ করা হয়। পুকুর প্রস্তুতির শেষ ধাপে সার প্রয়োগ করা হয়। চুন প্রয়োগের ৩–৪ দিন (হক, ২০০৬) বা ৭–১০ দিন (মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০২) পর নিম্নোক্ত মাত্রায় সার প্রয়োগ করা হয়।

সার প্রয়োগ মাত্রা (শতাংশ প্রতি)

সারশতাংশ প্রতি সারের মাত্রা
গোবর৫–৭ কেজি
কম্পোস্ট৮–১০ কেজি
হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা৩–৫ কেজি
ইউরিয়া১০০–১৫০ গ্রাম
টিএসপি৫০–৭৫ গ্রাম
এমপি সার২০ গ্রাম

নোট:

  • মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে সার প্রয়োগ ঠিক নয়।

  • অতিরিক্ত সার কখনোই ব্যবহার করা ঠিক নয়।


প্রাকৃতিক খাদ্য পর্যবেক্ষণ

পোনা ছাড়ার আগে প্রাকৃতিক খাদ্য ঠিকমতো তৈরি হয়েছে কিনা পরীক্ষা করা দরকার। পানির রং দেখে প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণ আন্দাজ করা যায়।

  • ভালো পানি: সবুজাভ/লালচে/বাদামী সবুজ

  • ভালো নয়: হালকা সবুজ, ঘন সবুজ, তামাটে লাল বা একেবারে পরিষ্কার পানি

সূর্য ওঠার পর (সকাল ১১–১২টার দিকে) নিচের পরীক্ষাগুলো করা যেতে পারে—

সেকিডিস্ক দিয়ে পরীক্ষা

সেকিডিস্ক হলো লোহা/টিনের তৈরি থালা, উপরে সাদা-কালো ডোরা দাগ থাকে। থালার সঙ্গে নাইলনের সুতা থাকে—গোড়া থেকে ৮ ইঞ্চি লাল, এরপর ৪ ইঞ্চি সবুজ, তারপর ৩.৫–৪ ফুট সাদা সুতা।

  • লাল সুতা পর্যন্ত ডুবানোর পরও থালার সাদা অংশ দেখা না গেলে → প্রাকৃতিক খাদ্য অতিরিক্ত, পোনা/সার/খাদ্য কিছুই নয়।

  • সবুজ সুতা পর্যন্ত ডুবানোর পর থালার সাদা অংশ দেখা না গেলে → প্রাকৃতিক খাদ্য পরিমিত, পোনা ছাড়া যাবে; নিয়মমতো সার ও খাদ্য চালাতে হবে।

  • সবুজ সুতা পর্যন্ত ডুবানোর পরও সাদা অংশ দেখা গেলে → প্রাকৃতিক খাদ্য কম, আরও সার দিতে হবে।

হাত দিয়ে পরীক্ষা

হাত কনুই পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে তালু দেখা হয়।

  • পানি বাদামী সবুজ/লালচে সবুজ/হালকা সবুজ এবং তালু দেখা না গেলে → প্রাকৃতিক খাদ্য ঠিক আছে

গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা

সার প্রয়োগের ৫–৭ দিন পর স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে পানি তুলুন।

  • গ্লাসের পানিতে ৫–১০টি ক্ষুদ্র প্রাণীকণা দেখা গেলে → প্রাকৃতিক খাদ্য ঠিক আছে


পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা

পোনা ছাড়ার ১–২ দিন আগে বিষক্রিয়া পরীক্ষা করা উচিত।

  • পুকুরে একটি হাপা টাঙিয়ে ১০–১৫টি পোনা ১ দিন রেখে দেখুন।

  • পোনা না মরলে → বিষক্রিয়া কেটে গেছে, পোনা ছাড়া যাবে।

  • পোনা মরলে → এখনও বিষ আছে, পানি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


চুন প্রয়োগ

চুন প্রয়োগে মাটি-পানির অম্লতা কমে, সারের কার্যকারিতা বাড়ে এবং পানির ঘোলাত্বও কমে। পুকুর শুকানোর ২–৩ দিন পর বা বিষ প্রয়োগের ৭–৮ দিন পর নিচের হারে চুন ব্যবহার করতে হবে—

মাটির pH অনুযায়ী চুনের মাত্রা

মাটির pHপাথুরে চুন (কেজি/শতাংশ)কলি চুন (কেজি/শতাংশ)পোড়া চুন (কেজি/শতাংশ)
৩–৫১২
৫–৬
৬–৭

pH মাপা সম্ভব না হলে গড়ে প্রতি শতাংশে ১–২ কেজি চুন ব্যবহার করা যায়।

  • পুকুর শুকানো না গেলে: চুন পানিতে ভিজিয়ে রেখে গুলে ঠান্ডা করে ছিটাতে হবে।

  • পুকুর শুকানো গেলে: গুঁড়ো চুন সরাসরি তলদেশে সমানভাবে ছিটাতে হবে।

চুন ব্যবহারে সতর্কতা

  • চুন ব্যবহারের সময় নাক-মুখ গামছা দিয়ে ঢেকে নেওয়া উচিত।

  • বাতাসের অনুকূলে চুন ছিটানো উচিত।

  • কড়া রোদে চুন বেশি কার্যকর।

  • মাছ থাকা অবস্থায় চুন দিলে অবশ্যই গুলে ঠান্ডা করে দিতে হবে।

  • প্লাস্টিকের বালতিতে চুন গুলানো যাবে না; মাটির চাড়ি/ড্রাম ব্যবহার করতে হবে।

  • চুন শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।


পুকুরে পানি ভরাট

  • পুকুর শুকানো হলে চুন প্রয়োগের ২–৩ দিন পর পানি দিতে হবে।

  • পানি সরবরাহকালে রাক্ষুসে মাছ ও অবাঞ্ছিত মাছ যেন না ঢোকে, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।


পুকুর প্রস্তুতির সময় সার প্রয়োগ

  • পানি ভরাটের ৩–৪ দিনের মধ্যে সার প্রয়োগ করতে হবে।

  • জৈব সার: গোবর/হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা/কম্পোস্ট

  • অজৈব সার: ইউরিয়া/টিএসপি ইত্যাদি

সার প্রয়োগ পদ্ধতি

  • পুকুর শুকনো থাকলে জৈব সার সমানভাবে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

  • পানি ভরাটের পর অজৈব সার পানিতে গুলে ছিটাতে হবে।

  • পুকুর আগেই পানি ভর্তি থাকলে জৈব-অজৈব সার একত্রে ৩ গুণ পানিতে গুলে ১২–২৪ ঘণ্টা রেখে সমানভাবে ছিটাতে হবে।


জিওলাইট, গ্যাসোনেক্স প্লাস ও প্রোবায়োটিক

সার দেওয়ার ৫–৭ দিন পর যখন পুকুরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হবে, তখন পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের নিরাপদ মাত্রা রক্ষা করতে নিয়মিত জিওলাইট এবং গ্যাসের উপস্থিতিতে ‘গ্যাসোনেক্স প্লাস’ ব্যবহার করলে চাষি উপকৃত হবেন। প্রতি মাসে একবার ‘গ্যাসোনেক্স প্লাস’ ব্যবহার করলে নিরাপদে থাকা যায়।

মাগুর মাছের দেহ স্বাভাবিক না থাকলে বাজার মূল্য ভালো পাওয়া যায় না। এ কারণে পুকুরে ‘প্রোবায়োটিক্স’ (অ্যাকোয়া ম্যাজিক) ব্যবহার করলে পুকুরের তলদেশের পরিবেশ এবং মাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।


রাক্ষুসে মাছ ও আগাছা দূর করতে বিষ প্রয়োগ

অনেক এলাকায় পুকুর সম্পূর্ণ শুকানো সম্ভব হয় না। তখন বিষ প্রয়োগ করে রাক্ষুসে মাছ ও আগাছা/অবাঞ্ছিত প্রাণী দূর করা যায়।

বিষ প্রয়োগ মাত্রা ও পদ্ধতি 

ঔষধের নামশতাংশ প্রতি মাত্রাপানির গভীরতাপ্রয়োগ পদ্ধতি (সংক্ষেপে)বিষাক্ততার মেয়াদ
রোটেনন (০.১% শক্তি)১৬–১৮ গ্রাম / ৩–৪ ম্যাচ বক্স১ ফুটের বেশি নাকাই তৈরি → বল + তরল দুইভাবে ছিটানো → জাল টেনে পানি ওলট-পালট৭ দিন
রোটেনন (৭% শক্তি)১৮–২৫ গ্রাম / ৪–৫ ম্যাচ বক্স১ ফুটের বেশিএকই পদ্ধতি৭ দিন
তামাকের গুঁড়া৮০০ গ্রাম–১ কেজি ৬০০ গ্রাম১ ফুটের বেশিএক রাত ভিজিয়ে রৌদ্রজ্জ্বল দিনে ছিটানো৭–১০ দিন
চা বীজের খৈল১ কেজি১ ফুটের বেশি না৩–৪ গুণ পানিতে গুলে রৌদ্রজ্জ্বল দিনে ছিটানো৩–৪ দিন

পানির pH এবং চুন-সার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা

pH হলো এসিড/অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের পরিমাপক (০–১৪)। ৭ নিরপেক্ষ।

  • pH ৭-এর বেশি হলে ক্ষারত্ব

  • pH ৭-এর কম হলে অম্লত্ব
    পানির pH দ্রুত ওঠানামা মাছ চাষে ক্ষতিকর। আদর্শ pH ৭–৯

pH কম হলে শতাংশে ১–২ কেজি চুন দিতে হবে। pH ৯-এর বেশি হলে রাসায়নিক সার দিতে হয়।
পানির pH মাছের খাদ্য চাহিদায় বড় প্রভাব ফেলে। অম্ল পানিতে মাছের ক্ষুধা কমে, বৃদ্ধি কমে, উৎপাদন হ্রাস পায়। pH ৯-এর বেশি দীর্ঘদিন থাকলে বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। pH ৭.০–৮.৫ হলে খাদ্য চাহিদা বেশি থাকে ও উৎপাদন ভালো হয়।


মাগুর মাছের পোনা (স্বাস্থ্য পরীক্ষা)

পুকুরে পোনা ছাড়ার আগে বা কেনার সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি—বেঁচে থাকা বাড়ে, রোগ কমে, উৎপাদন বাড়ে।

ভালো/খারাপ পোনা চেনার উপায়

পর্যবেক্ষণের বিষয়ভালো পোনাখারাপ পোনা
চলাফেরাচঞ্চলভাবে চলাচল করেস্থির/অলসভাবে চলে
পিচ্ছিলতাশরীর পিচ্ছিলশরীর খসখসে
স্রোত তৈরি করলেস্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটেপাত্রের মাঝখানে জমা হয়
শরীর/ফুলকাদাগ নেইদেহ/পাখনা/ফুলকায় লাল দাগ থাকতে পারে

পোনা পরিবহন পদ্ধতি

কৈ/শিং/মাগুর পোনা পরিবহন রুইজাতীয়ের মতো হলেও কিছু ভিন্নতা আছে—কাঁটা থাকায় বড় পোনাকে অক্সিজেন ব্যাগে নেওয়ার সময় সতর্কতা দরকার। শিং-মাগুরের ছোট পোনা অক্সিজেন ব্যাগে পরিবহন উত্তম।

সাধারণত ৬৬ সেমি × ৪৬ সেমি পলিথিন ব্যাগে পরিবহন করা হয়। প্রতি প্যাকেটে দুটি ব্যাগ ব্যবহার ভালো—একটি ছিদ্র হলে দ্বিতীয়টি রক্ষা করবে।

২৫/৩০ দিনের মাগুর ৩০০–৪০০ গ্রাম (১৫/১৬ শত) পোনা ১৫–১৮ ঘণ্টা দূরত্বে পরিবহন করা যায়। ৪–৬ ঘণ্টার ভ্রমণে প্রতি ব্যাগে ১–১.৫ কেজি পর্যন্ত পোনা পরিবহন করা যায়। ব্যাগ ছিদ্র না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং সম্ভব হলে বস্তায় ভরে পরিবহন করা উচিত।

অন্যান্য পদ্ধতি: ইনসুলেটেড ট্যাংকে এরেটর, ক্যানভাস ট্যাংক, ভ্যানে পলিথিন কাগজ দিয়ে ট্যাংক ইত্যাদি।


পোনা শোধন

রোগজীবাণু যেন পোনার সাথে না ঢোকে, তাই ছাড়ার আগে শোধন দরকার।

  • ১০ লিটার পানিতে ১ চা চামচ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট অথবা ১০ লিটার পানিতে ২০০ গ্রাম (দুই মুঠ) লবণ

  • এতে পোনাকে ৩০ সেকেন্ড গোসল করিয়ে ছাড়তে হবে

  • ১০ লিটারের দ্রবণে একবারে ৩০০–৫০০টি পোনা শোধন করা যায়

  • একই দ্রবণে ৪–৫ বার ব্যবহার করে নতুন দ্রবণ বানাতে হবে

পোনা ছাড়ার পর Oxysaytin, Lenocide ইত্যাদি ব্যবহার সম্পর্কিত অংশও আপনার লেখামতো থাকল।


পোনা অভ্যস্তকরণ (কন্ডিশনিং)

পোনা শক না খাওয়ার জন্য ব্যাগ/পাত্রটি পুকুরে ৩০ মিনিট ভাসিয়ে তাপমাত্রা সমতা আনতে হবে। পরে পাত্র কাত করে বাইরে থেকে ভেতরে স্রোত তৈরি করলে সুস্থ পোনা স্রোতের বিপরীতে ধীরে ধীরে পুকুরে চলে যায়।

পোনা ছাড়ার সময়: সাধারণত মৃদু ঠান্ডা আবহাওয়ায়, সকাল বা বিকাল ভালো; মেঘলা/ভ্যাপসা আবহাওয়ায় নয়।


পোনা ছাড়ার পরে করণীয়

  • পোনা ছাড়ার ৬–৮ ঘণ্টা পর পাড়ের কাছে চলাফেরা দেখুন

  • প্রতিদিন ভোরে পুকুর পর্যবেক্ষণ করে পোনা মারা যাচ্ছে কিনা দেখুন

  • পোনা মারা গেলে একই জাতের সমসংখ্যক পোনা পুনরায় ছাড়ুন

  • ৩০ দিন পরপর শতাংশে ১৫০ গ্রাম জিওলাইট অথবা ২৫০ গ্রাম চুন

  • ১৫ দিনে একবার প্রোবায়োটিক

  • ১৫ দিন অন্তর তাপমাত্রা/অক্সিজেন/pH/অ্যামোনিয়া/মোট ক্ষারকত্ব পরীক্ষা

  • এক মাস পরপর শতাংশে ১ কেজি চুন (১ কেজি চুনে ৩০ লিটার পানি) ছিটানো + আধা কেজি লবণ ছিটানো

  • অক্সিজেন অভাব হলে শতকে ২০০ গ্রাম জিওলাইট ছিটানো


চাষ চলাকালে সার প্রয়োগ (দৈনিক নমুনা মাত্রা)

সারপ্রতি শতাংশে
গোবর২০০–২৫০ গ্রাম
কম্পোস্ট৩০০–৪০০ গ্রাম
হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা১৫০–২০০ গ্রাম
ইউরিয়া৪–৫ গ্রাম
টিএসপি৩ গ্রাম
চুন২০০ গ্রাম (মাসিক)

সতর্কতা: রৌদ্রউজ্জ্বল দিনে সকাল ১০–১১টার মধ্যে ছিটাতে হবে; মেঘলা/বৃষ্টিতে নয়।


সম্পূরক খাদ্য

প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি বাইরে থেকে অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগকেই সম্পূরক খাদ্য বলা হয়। ঘনত্ব বেশি হলে প্রাকৃতিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারে না—তাই পুষ্টিগুণসম্পন্ন সম্পূরক খাদ্য দিতে হয়।

খাদ্যের উপকরণ (দেশি মাগুর)

চালের কুঁড়া, গমের ভুসি, সরিষা/তিলের খৈল, ফিশমিল, চিটাগুড়, রক্তের গুঁড়া, হাঁস-মুরগির নাড়িভুঁড়ি, শামুক-ঝিনুকের মাংস ইত্যাদি।

খাদ্য তৈরির কয়েকটি ফর্মুলা

  • চালের কুঁড়া ২০ ভাগ + গমের ভুসি ১৫ ভাগ + খৈল ২০ ভাগ + ফিশমিল ৪০ ভাগ + চিটাগুড় ৫ ভাগ

  • অথবা খৈল ৩৫ ভাগ + চালের কুঁড়া ৩৫ ভাগ + রক্তের গুঁড়া ৩০ ভাগ
    বল আকারে বানিয়ে প্রয়োজনে রোদে একটু শুকিয়ে খাদ্যদানীতে প্রয়োগ করা যায়।

খাদ্য প্রয়োগের পদ্ধতি

  • সব পুকুরে সমানভাবে ছিটিয়ে

  • নির্ধারিত স্থানে

  • খাদ্যদানীতে (খরচ ও অপচয় কমে)
    খাদ্যদানী: ৩×৩ ফুট বাঁশের ফ্রেমে মশারির জাল, পানির উপরিভাগ থেকে ১ ফুট নিচে, পাড় থেকে ১–২ মিটার দূরে স্থাপন।
    ৩০ শতাংশে ২টি, ৬০ শতাংশে ৪টি—এই হারে।

বৃষ্টি হলে বা পানি অতিরিক্ত সবুজ/দূষিত হলে খাদ্য কমাতে হবে।


শিং মাছের খাদ্য প্রয়োগ

প্রথম ১০ দিন দৈনিক মাছের ওজনের ২০% (সন্ধ্যার পর ও ভোরে ভাগ করে)
পরের ১০ দিন ১৫%
এর পরের ১০ দিন ১০%
এক মাস পর ৫%
৩ ইঞ্চি হলে ধীরে ধীরে দিনে খাবারে অভ্যস্ত করতে হবে। ১৫ গ্রাম হলে ৩%-এর বেশি খাবার ঠিক নয় এবং বিক্রি পর্যন্ত এই নিয়ম বজায় রাখতে হবে। বেশি খাবার দিলে পানি নষ্ট হতে পারে।

শিং/মাগুরের ওজন অনুযায়ী খাদ্য মাত্রা

গড় ওজন (গ্রাম)দৈনিক খাদ্য (%)
১–৩১৫–২০
৪–১০১২–১৫
১১–৫০৮–১০
৫১–১০০৫–৭
>১০১৩–৫

উদাহরণ অংশ (৪০ শতাংশে ২০০০০ মাছ × ৩ গ্রাম = ৬০ কেজি; ২০% = ১২ কেজি খাদ্য) — একই রাখা হলো।


৩৫ শতক পুকুরে ২০০০০ পোনার ৪ মাসের সম্ভাব্য মোট খাদ্য (টেবিল সাজানো)

সময়গড় ওজন ধরেমোট খাদ্য (কেজি)
১ম ১০ দিন (১০%)১ গ্রাম২০
২য় ১০ দিন (৫%)৮ গ্রাম৮০
৩য় ১০ দিন (৪%)১৫ গ্রাম১২০
৪র্থ ১০ দিন (৪%)২৫ গ্রাম২০০
৫ম ১০ দিন (৪%)৩৫ গ্রাম২৮০
৬ষ্ঠ ১০ দিন (৪%)৪৫ গ্রাম২৭০
৭ম ১০ দিন (৩%)৫৫ গ্রাম৩৩০
৮ম ১০ দিন (৩%)৬৫ গ্রাম৩৯০
৯ম ১০ দিন (৩%)৭৫ গ্রাম৪৫০
১০ম ১০ দিন (৩%)৮৫ গ্রাম৫১০
১১তম ১০ দিন (৩%)৯৫ গ্রাম৫৭০
১২তম ১০ দিন (৩%)১০৫ গ্রাম৬৩০
মোট৩৮৫০

(এখানে “ঌম” → “৯ম” করে ঠিক করা হয়েছে।)


রোগ, ঝুঁকি ও প্রতিকার

বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি/বন্যায় মাছ ভেসে যেতে পারে—তাই বেষ্টনী জরুরি। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে অক্সিজেন ঘাটতি হতে পারে—পানি সেচে গভীরতা বাড়াতে হবে। শীতে রোগ বেশি হয়—শীতের ২–৩ মাস চাষ না করাই ভালো; তবে সংরক্ষণে ভোরে ডিপটিউবওয়েল পানি দিয়ে তাপমাত্রা বাড়ানো যায়। তলদেশে ক্ষতিকর গ্যাস জমলে ২–৩ দিন পরপর দুপুরে তলদেশ নাড়িয়ে/হররা টেনে গ্যাস ছাড়াতে হবে; শতকে ২৫০ গ্রাম চুন বা জিওলাইটে উপকার। বেশি ঘনত্বে মাছের রং স্বাভাবিক না হলে বাজারজাতের ১৫ দিন আগে পুকুরের ১/৪ অংশে কচুরীপানা/টোপাপানা দেওয়া যেতে পারে।

শীতে ও পানির পরিবেশ খারাপ হলে গায়ে সাদা দাগ/ক্ষত হতে পারে—শতকে ২৫০ গ্রাম চুন বা ৫০০–৭৫০ গ্রাম জিওলাইট, আংশিক পানি পরিবর্তন, শীতের শুরুতে চুন+লবণ প্রয়োগ প্রতিরোধে সহায়ক।


Pond Plus ও Aqua Magic (যেমন ছিল তেমন সাজানো)

  • Pond Plus: প্রতি ৩৫ শতাংশে ৫০ গ্রাম, প্রতি ১০ দিন অন্তর।

  • Aqua Magic: প্রতি একরে (১ মিটার গভীরতা) ৫ কেজি; ৩০ শতাংশের জন্য ১.৫ কেজি। সাথে ১৫০ গ্রাম চালের কুঁড়া + ৫০ গ্রাম চিনি ৫ লিটার পানিতে ৫ ঘণ্টা ভিজিয়ে পুকুরে ছিটাতে হবে।


মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ

দেশি মাগুর বাজার আকারে পৌঁছালে সাধারণত সব মাছ একবারে ধরতে হয়। প্রথমে জাল টেনে অধিকাংশ মাছ ধরে ফেলতে হবে, পরে পুকুরের তলদেশ শুকিয়ে অবশিষ্ট মাছ ধরতে হবে। শুধু জাল দিয়ে ধরলে ৪০–৫০% মাছ থেকে যেতে পারে—তাই চূড়ান্ত আহরণে পুকুর শুকিয়ে ধরা উত্তম।
মাগুর ৮–১০ মাসে, শিং ৪–৬ মাসে ধরার উপযোগী হয় (হক, ২০০৬)। ১০০–১৫০ গ্রাম হলে আংশিক আহরণও করা যায়। উল্লেখিত ব্যবস্থাপনায় এক শতাংশে ৬–৮ মাসে ১৬–১৮ কেজি শিং/মাগুর পাওয়া সম্ভব; আংশিক আহরণের পর সমসংখ্যক পোনা পুনরায় মজুদ করলে বছরে ২৪–২৫ কেজি পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব।


এক নজরে–১

  • পুকুর সেচের পর প্রয়োজনীয় জৈব সার সমান ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

  • পুকুর শুকানোর ২–৩ দিন পর বা বিষ প্রয়োগের ৭–৮ দিন পর চুন দিতে হবে।

  • পুকুর শুকানো সম্ভব হলে শুকনো চুন, সম্ভব না হলে চুন তরল করে দিতে হবে।

  • পুকুর শুকানো হলে চুনের ৪–৫ দিন পর ২–৩ ফুট পানি দিতে হবে; জিওলাইট (প্রতি শতকে ১–২ কেজি) দিলেও ভালো ফল।

  • পানি ভরাটের ৫–৭ দিন পর সার প্রয়োগ (মেঘলা/বৃষ্টিতে নয়)।

  • সার প্রয়োগের ৩–৫ দিন পর প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হলে পোনা মজুদ।

  • পোনা ছাড়ার আগে ৩০ মিনিট ব্যাগ ভাসিয়ে অভ্যস্ত করতে হবে।

  • ৩০ সেকেন্ড লবণ পানিতে শোধন করে সকালে/বিকেলে মৃদু ঠান্ডায় পোনা ছাড়তে হবে (মেঘলা/ভ্যাপসায় নয়)।


এক নজরে–২ (জিনিসপত্র)

(তোমার তালিকা 그대로 রেখে সাজানো—পরিমাণ একই)

  • রোটেনন পাউডার: প্রতি শতাংশে প্রতি ফুট গভীরতায় ২৫–৩০ গ্রাম (পুকুর না শুকালে)

  • চুন: শতাংশে ১ কেজি (৩৫ শতকে ৩৫ কেজি) / অথবা সমান জিওলাইট

  • ৫০% চুন + ৫০% জিওলাইট একত্রেও

  • জৈব সার (৩৫ শতক): গোবর ১৭৫ কেজি / কম্পোস্ট ২৮০ কেজি / হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ১৭৫ কেজি

  • ইউরিয়া ৪ কেজি, টিএসপি ৩ কেজি, এমপি ১ কেজি

  • সেকিডিস্ক, pH মিটার

  • পোনা শোধন: বালতি, ঘন জাল, লবণ ৮ কেজি, Lenocide ২৫০ সিসি

  • বড় ২টি পাতিল (পোনা ছাড়ার জন্য)

  • খাদ্যদানী: মশারীসহ বাঁশের ফ্রেম ১ বর্গমিটার (২টি)

  • সম্পূরক খাদ্যের কাঁচামাল তালিকা (আপনার মতোই)


৩৫ শতাংশ পুকুরের আয়-ব্যয়ের হিসাব

ক) মজুদ পূর্ব ও মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা

আইটেমমোট পরিমাণএকক দর (টাকা)মোট ব্যয় (টাকা)নোট
চুন৪২ কেজি২৫১,০৫০১ কেজি হারে
জিওলাইট৩৫ কেজি২৫৮৭৫১ কেজি হারে
গোবর১৭৫ কেজি৩৫০
ইউরিয়া১০ কেজি২০২০০শতকে ২০০ গ্রাম
টি এস পি৬ কেজি২৫১৫০শতকে ১০০ গ্রাম
এমপি সার১ কেজি২৫২৫শতকে ২০ গ্রাম
পোনা২০,০০০ টি২.৫০৫০,০০০১০% মৃত্যুহার ধরে; ৮০% মাগুর পোনা ধরে ঘনত্ব নির্ধারণ

খ) খাদ্য ব্যয়

আইটেমমোট পরিমাণ (কেজি)একক দর (টাকা)মোট ব্যয় (টাকা)
ফিসমিল৮০০৭৪৫৯,২০০
সরিষার খৈল৮০০৩৪২৭,২০০
গমের ভুসি৪৮০৩২১৫,৩৬০
সয়াবিন চূর্ণ৩২০৬০১৯,২০০
অটোকুঁড়া১,২০০১৮২১,৬০০
ভুট্টা চূর্ণ২০০১৫৩,০০০
চিটাগুড়২০০৪০৮,০০০
ভিটামিন প্রিমিক্স২৮০১,৮০০
মোট খাদ্য৪,৩২০২,০৮,০১০

গ) পরিচালনা ও অন্যান্য

আইটেমমোট ব্যয় (টাকা)
পরিচালনা, শ্রমিক মজুরী, মাছ ধরা ও অন্যান্য১০,০০০

মোট ব্যয় (সারসংক্ষেপ)

বিবরণটাকা
মোট ব্যয় (খাদ্যসহ)২,০৮,০১০
পরিচালনা ও অন্যান্য১০,০০০
সর্বমোট ব্যয়২,১৮,০১০

উৎপাদন ও বিক্রয়

বিবরণপরিমাণ/দরটাকা
৮ মাসে গড়ে ৯৫ গ্রাম ধরে (১৮,০০০ মাছ) মোট উৎপাদন১,৭১০ কেজি
বিক্রয়মূল্য৫০০ টাকা/কেজি৮,৫৫,০০০
সর্বমোট বিক্রয়৮,৫৫,০০০
সর্বমোট ব্যয়২,১৮,০১০
নিট মুনাফা৬,৩৬,৯৯০

দেশী মাগুরের চাষ

দেশী মাগুরের বৈশিষ্ট্য
অতিরিক্ত শ্বাসনালী থাকায় পানি ছাড়াও বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। তাই মজা ও পচাপুকুর, ছোট ছোট ডোবা ইত্যাদি জলাশয়ের দূষিত পানিতেও মাগুর মাছের বেঁচে থাকতে কোনো সমস্যা হয় না।
পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে যে প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি হয়, সে অবস্খায়ও ছোট ছোট গর্ত করে এ মাছ দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে।
পানি থেকে উত্তোলনের পর দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার কারণে জীবন্ত মাগুর বাজারজাত করা সম্ভব।

দেশী মাগুরের চাষ পদ্ধতি:

পুকুর নির্মাণ :
পুকুরের আয়তন ১০ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশ এবং গভীরতা ৮০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার (৩ থেকে ৪ ফুট) হওয়া বাঞ্ছনীয়।
অধিক গভীরতা উৎপাদনের দিক থেকে অসুবিধাজনক। কেননা, মাগুর মাছকে শ্বাস নেয়ার জন্য সবসময় উপরে আসতে হয়। এতে অতিরিক্ত শক্তি ক্ষয়ের কারণে মাছের বৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট বিঘí ঘটে।

পুকুর তৈরি :
পাড়ের ঊর্ধ্বসীমা অবশ্যই সর্বোচ্চ বন্যার লেভেল থেকে ৩০ সেন্টিমিটার (১ ফুট) উপরে রাখা আবশ্যক। এতে বৃষ্টির সময় মাছ বুকে হেঁটে বাইরে যেতে পারবে না। তদুপরি বাইরে থেকে সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি মৎস্যভুক প্রাণীও পুকুরে প্রবেশের কোনো সুযোগ পাবে না।
এ ছাড়া পুকুরের চারদিকের পাড়ের উপর ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু নেটের বেড়া দেয়া বাঞ্ছনীয়।

চুন প্রয়োগ :
পুকুরের তলদেশ শুকিয়ে হালকাভাবে চাষ দিয়ে তলার মাটির পিএইচ পরীক্ষা সাপেক্ষে প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে।
চুন প্রয়োগের পর পুকুর ১৫ সেন্টিমিটার (৬ ইঞ্চি) পরিমাণ পানি ঢুকিয়ে সপ্তাহখানেক ধরে রাখা অত্যাবশ্যক।

জৈব সার প্রয়োগ :
চুন প্রয়োগের ৭ থেকে ১৫ দিন পর প্রতি শতাংশে ১০ কেজি হারে গোবর সার অথবা ৫ কেজি হারে মুরগির বিষ্ঠা ছিটিয়ে দিতে হবে।

অজৈব সার প্রয়োগ :
জৈব সার প্রয়োগের সাত দিন পর পানির উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বজায় থাকা অবস্খায় প্রতি শতাংশে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি সার ব্যবহার করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পানির রঙ বাদামি সবুজ, লালচে বাদামি, হালকা সবুজ, লালচে সবুজ অথবা সবুজ থাকাকালীন অজৈব সার (রাসায়নিক) প্রয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই।

পোনা মজুদ :
৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যরে সুস্খ সবল পোনা প্রতি বর্গমিটারে ৫০ থেকে ৮০টি হারে পুকুরে ছাড়া যেতে পারে। মে থেকে জুন মাস মাগুরের পোনা ছাড়ার যথার্থ সময়।

মাগুরের খাদ্য ব্যবস্খাপনা :
প্রাকৃতিক পরিবেশে মাগুর মূলত জলাশয়ের তলদেশের খাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করে। প্রাকৃতিক এই খাদ্যগুলো হচ্ছেন্ধ জলাশয়ের তলার আমিষজাতীয় পচনশীল দ্রব্যাদি, প্রাণী প্লাঙ্কটন ও কেঁচোজাতীয় ক্ষুদ্রাকার প্রাণী ইত্যাদি।

সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ :
অধিক ঘনত্বে চাষের ক্ষেত্রে পুকুরে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ অপরিহার্য। সহজলভ্য দেশীয় উপকরণ সমন্বয়ে মাগুর মাছের সম্পূরক খাদ্য প্রস্তুত করা যায়।
এ ক্ষেত্রে চালের কুঁড়া ৪০ শতাংশ, তৈলবীজের খৈল ৩০ শতাংশ এবং শুঁটকি ৩০ শতাংশ একত্রে মিশিয়ে গোলাকার বল তৈরি করে মাছকে সরবরাহ করা যেতে পারে। তা ছাড়া শামুক ও ঝিনুকের মাংস মাগুরের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। এগুলোও অবাধে খাওয়ানো যায়।

খাদ্যের প্রয়োগমাত্রা :
পুকুরে মজুদকৃত মাছের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে দৈনিক খাদ্যের এক-চতুর্থাংশ সকালে এবং বাকি তিন-চতুর্থাংশ সìধ্যায় প্রয়োগ করতে হবে।

একাধিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উপরোক্ত প্রযুক্তি মোতাবেক পুকুরে চাষকৃত দেশী মাগুরের ওজন অনধিক ৪ থেকে ৫ মাসে ১৭৫ থেকে ২০০ গ্রামে উন্নীত করা সম্ভব।

পুকুরে শিং মাছের চাষ পদ্ধতি


এক সময় আমাদের খাল-বিল-হাওর-বাঁওড়ে প্রচুর শিং মাছ পাওয়া যেত। বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক এই সব অভয়াশ্রম নষ্ট ও সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে এখন আর শিং মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না। সে সব দিনে শিং মাছ পুকুরে চাষ হত না। যে কারণে বছর কয়েক আগে শিং মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আশার কথা হল এই যে, আমাদের দেশের মৎস্য খামারিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে শিং মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে।
পুকুর নির্বাচন:শিং মাছ চাষের জন্য পুকুর নির্বাচনের সময় কয়েকটা দিক লক্ষ্য রাখতে হবে-
১. পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে।
২. পুকুরের পাড় মজবুত হতে হবে। কোন প্রকার ছিদ্র থাকলে সমস্ত- শিং মাছ চলে যাবে।
৩. বর্ষাকালে বৃষ্টির সময় পানির উচ্চতা ৪ ফুটের বেশি হবে না এই জাতীয় পুকুর নির্বাচন করতে হবে।
৪. চাষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, শিং মাছের পুকুর আয়তাকার হলে ভাল ফল পাওয়া যায়। বর্গাকার একটি পুকুরের চেয়ে আয়তাকার পুকুরে একই হারে খাদ্য ও ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশি উৎপাদন হয়।
৫. পুকুরের আয়তন ৪০/৫০ শতাংশের মধ্যে হতে হবে এবং পুকুরের এক প্রান্ত- অন্য প্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখতে হবে যাতে মাছ ধরার সুবিধাসহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা যায়।

পুকুর প্রস্তুত:
নতুন ও পুরাতন উভয় ধরনের পুকুরে শিং মাছ চাষ করা যায়। তবে নতুন পুকুরের চেয়ে পুরাতন পুকুরে শিং মাছ চাষ ভাল হয়। নতুন পুকুরে শিং মাছ চাষ করলে পুকুর ভালভাবে চাষ দিয়ে প্রতি শতাংশে কমপক্ষে ২০ কেজি গোবর ও ভালভাবে মই দিয়ে তারপর চুন দিতে হবে। তাতে মাটির উর্বরতা বাড়বে। শিং মাছের পুকুর উর্বর না থাকলে অনেক সময় শিং মাছ মজুতের পর পোনা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়।
পুরাতন পুকুরে শিং মাছ চাষের জন্য প্রথমেই সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। পুকুরের তলায় বেশি কাদা থাকলে উপরের স্তরের কিছু কাদা উঠিয়ে ফেলতে হবে। এরপর চুন দিতে হবে শতাংশ প্রতি ১ কেজি। তারপর পুকুরের চারদিকে জাল দিয়ে ভালভাবে ঘের দিতে হবে। এতে কোন সাপ বা ব্যাঙ পুকুরে ঢুকতে পারবে না। ব্যাঙ বেশি ক্ষতিকর না হলেও সাপ শিং মাছের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
শিং পোনার চলার ধীর গতির কারণে সাপ অনেক পোনা খেয়ে ফেলতে পারে। চারপাশে জাল দেয়ার পর পুকুরে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পরিষ্কার পানি দিতে হবে। পানি দেয়ার ২/৩ দিনের মধ্যে পোনা ছাড়তে হবে। পোনা ছাড়ার পর এক ইঞ্চি ফাঁসের একটি জাল পেতে রাখতে হবে তাতে পুকুরের ভেতর কোন সাপ থাকলে ওই জালে আটকা পড়বে।


পোনা মজুদ:পুকুর প্রস্তুতের পর গুণগতমানের পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি সাইজের পোনা মজুদ করতে হবে। আজকাল পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেক হ্যাচারিই শিং মাছের পোনা উৎপাদন করে। কিন্তু পোনাকে কীভাবে মজুদ করলে পোনার মৃত্যহার কম হবে বা আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থাপনা কি হবে তা অধিকাংশ হ্যাচারিই না জানার কারণে শিং মাছের পোনা মজুদের পর ব্যাপকহারে মড়ক দেখা দেয়। প্রথমে যা করতে হবে তা হল, হ্যাচারিতে পোনা তোলার পর কন্ডিশন করে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পোনা ডেলিভারি দিতে হবে। পোনা পরিবহনের পর এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। আর তা না হলে পুকুরে ছাড়ার পর পোনা ক্ষতরোগে আক্রান্ত- হতে পারে। পুকুরে পোনা ছাড়ার ২/৩ দিন পর আবার একই জাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। এতে শিং মাছের পোনা মজুদের পর আর কোন রোগবালাই আসবে না।

মজুদ ঘনত্ব :শিং মাছ এককভাবে বা মিশ্রভাবে চাষ করা যায়। মিশ্রভাবে চাষ করতে হলে কার্প জাতীয় মাছের সাথে প্রতি শতাংশে ৩০টি পর্যন্ত- আঙ্গুল সাইজের শিং মাছের পোনা ছাড়তে হবে। পোনা মজুদের সময় পোনাকে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পুকুরে ছাড়তে হবে। কার্প জাতীয় মাছ ছাড়া তেলাপিয়া এবং পাঙ্গাসের সাথেও শিং মাছের মিশ্রচাষ করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫০টি পর্যন্ত- শিং মাছের পোনা মিশ্রভাবে ছাড়া যায়। কার্প জাতীয়, তেলাপিয়া বা পাঙ্গাসের সাথে শিং মাছ চাষ করলে বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। পুকুরের তলায় উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়েই এরা বড় হয়ে থাকে। উপরোন্ত- এই জাতীয় মাছের পুকুরে শিং মাছ মিশ্রভাবে চাষ করলে পুকুরে অ্যামোনিয়াসহ অন্যান্য গ্যাসের কম হয়।

একক চাষে শিং মাছ প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১০০০ টি পর্যন্ত ছাড়া যায়।


খাবার প্রয়োগ পদ্ধতি :পুকুরে শিং মাছের পোনা মজুদের পর প্রথম ১০ দিন দৈনিক মাছের ওজনের ২০% খাবার প্রয়োগ করতে হয়। ছোট থাকা শিং মাছ সাধারণত রাতের বেলায় খেতে পছন্দ করে; তাই ২০% খাবারকে দু’বেলায় সমান ভাগ করে সন্ধ্যার পর অর্থাৎ ভোরের দিকে একটু অন্ধকার থাকতে পুকুরে প্রয়োগ করতে হয়। মাছ মজুদের পরের ১০ দিন ১৫% হারে এবং এর পরের ১০ দিন মাছের ওজনের ১০% হারে পুকুরে খাবার প্রয়োগ করতে হয় একই নিয়মে। এভাবে এক মাস খাবার প্রয়োগের পর ৫% হারে পুকুরে খাবার দিতে হবে। শিং মাছ ছোট থাকা অবস্থায় রাতে খাবার খেলেও ৩ ইঞ্চির মত সাইজ হওয়ার সাথে সাথে দিনের বেলাতে খাবার দিতে হবে। সন্ধ্যার পর যে খাবার দেয়া হত সেটি সন্ধ্যার একটু আগে এগিয়ে এনে আস্তে আস্তে বিকেলে দিতে হবে। অন্যদিকে ভোর বেলার খাবারও এমনি করে সকাল ৯/১০ টার দিকে পিছিয়ে নিতে হবে। শিং মাছের ওজন ১৫ গ্রাম হলে ৩% এর অধিক খাবার দেয়া মোটেই ঠিক নয় এবং বিক্রির আগ পর্যন্ত এই নিয়মই বজায় রাখতে হবে। পুকুরে বেশি পরিমাণ খাবার দিলে পানি নষ্ট হয়ে যেতে পারে যা শিং মাছ চাষের একটি বড় অন্তরায়।

শীতকালে শিং মাছ চাষের জন্য করণীয় :শীতকালে শিং মাছের রোগবালাই থেকে রক্ষার জন্য প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হয়। সাথে প্রতি মাসে একবার এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিন দেয়া দরকার। পানির উচ্চতা ২ ফুটে রাখা বাঞ্চনীয়। গ্যাস দূর করতে কোন অবস্থাতেই শিং মাছের পুকুরে হররা টানা যাবে না। এতে শিং মাছ খাবার ছেড়ে দিয়ে আরো বেশি গ্যাসের সৃষ্টি করবে। নিচের অ্যামোনিয়া গ্যাস দূর করতে গ্যাসোনেক্স ব্যবহার করা যেতে পারে।

শিং মাছ আহরণ পদ্ধতি :অন্যান্য মাছ জাল টেনে ধরা গেলেও শিং মাছ জাল টেনে ধরা যায় না। শিং মাছ ধরতে হলে শেষ রাতের দিকে পুকুর সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। শিং মাছ ধরার উত্তম সময় হল ভোর বেলা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। রোদের সময় মাছ ধরলে মাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাছ ধরার পর মাছ থেকে গেলে শ্যালো দিয়ে কমপক্ষে ২ ফুট ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পুকুর ভরে রাখতে হবে। পরের দিন আবার একই নিয়মে মাছ ধরতে হবে। শিং মাছ ধরতে একটা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। একহাতে নুডুল্সের প্লাস্টিক ছাকনী আর অন্য হাতে স্টিলের ছোট গামলা দিয়ে মাছ ধরে প্লাস্টিকের বড় পাত্রে রাখতে হবে। এরপর মাছগুলো হাপায় নিয়ে ছাড়তে হবে।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, শিং মাছের পুকুর এক পাশে ঢালু রাখা দরকার। এতে পুকুর সেচ দেয়ার পর সমস্ত মাছ একপাশে চলে আসবে। তা না হলে সমস্ত পুকুর জুড়ে মাছ ছড়িয়ে থাকবে। মাছ ধরায় খুব সমস্যা হবে। সাধারণত শিং মাছ ধরার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।
মাছের কাঁটা বিঁধলে সেখানে খুবই ব্যথা হয়। কাঁটা বিঁধানো জায়গায় ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে গরম পানি দিলে সাথে সাথে কিছুটা উপশম হয়। এছাড়া মলম লাগিয়ে গরম বালির ছ্যাক দিলেও আরাম পাওয়া যায়। তাই শিং মাছ ধরার আগে এমন ব্যবস্থা রাখলে মন্দ হয় না। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে এসবের কিছুরই প্রয়োজন হয় না।

শিং মাছ বাজারের একটি দামি মাছ। ডাক্তাররা বিভিন্ন রোগির পথ্য হিসেবে শিং মাছ খাবার উপদেশ দিয়ে থাকেন। কথায় আছে, শিং মাছে গায়ে দ্রুত রক্ত বৃদ্ধি করে থাকে।
পুকুরে শিং মাছের কীভাবে চাষ করতে হয় তা আলোচনা করা হল। আলোচিত পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করলে ১০ মাসে এক একরে প্রায় ৪ টন শিং মাছ উৎপাদন সম্ভব যা নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বিলুপ্তির হাত থেকেও রক্ষা পাবে এই শিং মাছ।

লেখক: এ.কে.এম. নূরুল হক, চর পুলিয়ামারী,শম্ভুগঞ্জ, ময়মনসিংহ

এক হেক্টর আয়তনের পুকুরে শিং-মাগুর চাষের জন্য বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব
(১) পুকুর শুকানো/মাছ মারার ওষুধ ৪,০০০ টাকা,
(২) চুন ২৫০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা,
(৩) জৈব সার ২,০০০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা,
(৪) ইউরিয়া ২৫০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা,
(৫) টিএসপি ১২৫ কেজি মূল্য ১,৮৭৫ টাকা,
(৬) এমপি ১০০ কেজি মূল্য ৭০০ টাকা
(৭) সম্পূরক খাদ্য ৩,৬০০ কেজি মূল্য ৫৪,০০০ টাকা,
(৮) মাছের পোনা (৪-৬ সে.মি.) ২৫০০০ টি মূল্য ৩৭,০০০ টাকা,
(৯) ওষুধ ও রাসায়নিক গুচ্ছ মূল্য ১,০০০ টাকা,
(১০) মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ গুচ্ছ মূল্য ৪,৫০০ টাকা,
(১১) বিবিধ ১,৪০০ টাকা। মোট ব্যয় ১,১০,৪৭৫ টাকা।
পুকুর ভাড়া এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষ করলে ২৮,০০০ টাকা বেশি ব্যয় হবে।
উত্পাদন ও আয় : উত্পাদন : ১,৮০০ কেজি মাছ। আয় : প্রতি কেজি ১২৫ টাকা হিসেবে ১,৮০০ কেজির মূল্য ২,২৫,০০০ টাকা।
মুনাফা : ২,২৫,০০০ থেকে ১,১০,৪৭৫ টাকা = ১,১৪,৫২৫/- টাকা।