Showing posts with label যন্ত্রপাতি. Show all posts
Showing posts with label যন্ত্রপাতি. Show all posts

কৃষি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের এক বিষ্ময়কর প্রতিকৃতি: আমির হোসেন

একের পর এক বিভিন্ন যান্ত্রিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে চলেছেন বগুড়ার রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ এর সত্ত্বাধিকারী আলহাজ্ব আমির হোসেন। যা দেখেন অবিকল তাই বানিয়ে ফেলতে জুড়ি নেই আমির হোসেনের। অথচ কোন পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার নন তিনি। নেই কোন তাত্ত্বিক কারিগরি জ্ঞান। স্রেফ হাতে-কলমের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী মেধা কাজে লাগিয়ে তিনি একের পর এক বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করে যাচ্ছেন। তার এই কারিগরি কারখানার প্রতিষ্ঠাতা তার বাবা আব্দুল জব্বার ওরফে ধলু মেকার যিনিও উদ্ভাবনী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি একটি সাইরেন যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। আমির হোসেন এরই মধ্যে কৃষিকাজে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।


১৯৭৮ সালে এসএসসি পাশ করে আমির বাবার ব্যবসায় যোগ দেন। তিনি ১৯৮৮ সালের ১৩ নবেম্বর মাসে মারা যাওয়ার পর রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের দায়িত্ব নেন তার ছেলে আমির হোসেন। ধলু মেকারের ৮ ছেলে- মেয়ের মধ্যে আমির হোসেন চতুর্থ। পিতার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় গবেষণা। শুরু হয় বিভিন্ন মেশিন তৈরির কল্পনা। প্রকৌশলী আমির হোসেন ২০০৩ সালে বুয়েট থেকে বিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী ও জিটিজেড থেকে কৃষি সামগ্রী উদ্ভাবনের উপর প্রশিক্ষণ নেন। এ কাজে আমির হোসেনকে সাহায্য করেন তার দ্বিতীয় মেয়ে আসমা খানম আশা ও তৃতীয় মেয়ে তাহিয়া খানম। তার প্রথম মেয়ে আমনিরা খানম এলএলবিতে লেখাপড়া করলেও মাঝে মাঝে তিনিও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আমিরের মেয়ে আসমা খানম আশা বুয়েট থেকে এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর পদকও পেয়েছেন। আমির হোসেন পাথর ভাঙা মেশিন উদ্ভাবন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একের পর এক আবিস্কার তাকে নিয়ে গেছে অনেক উচ্চাসনে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নতুন নতুন আবিস্কারের জন্য তাগাদা দেয়া হয়। এতে তিনি আরও উৎসাহিত হয়ে নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারে সক্ষম হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন আমির হোসেন। 
তার উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো হল:

১.     জৈবসার ও মিশ্র সার তৈরির মেশিন
২.     ইট তৈরির স্বয়ংক্রিয় মেশিন
৩.     জমি নিড়ানি যন্ত্র
৪.     ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র
৫.     ইট ভাঙ্গার মেশিন
৬.     শস্য ঝাড়াই যন্ত্র
৭.     বীজ বপন যন্ত্র
৮.     ধান কাটা মেশিন
৯.     চিকন সেমাই তৈরির মেশিন
১০.     গুটি ইউরিয়া সার তৈরির মেশিন
১১.     জ্বালানিবিহীন গাড়ি

তার এমন, সব আবিষ্কারের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারপদবী পেয়েছেন। আমির হোসেনের বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তার চিকন সেমাই মেশিনের তৈরি সেমাই বগুড়ার চিকন সেমাই হিসেবে বাংলাদেশের সর্বত্র বিক্রি হচ্ছে। আমির হোসেন তার গাড়ির নাম দিয়েছেন রফ-রফ তাহিয়াবা সুন্দর ও দ্রুততম যান। ২৫০ কেজি ওজনের এই গাড়ি পরিবেশ সহায়ক। চালকাসহ পাঁচজন আরোহী নিয়ে ঘণ্টায় ৭০-৮০ কিলোমিটার বেগে চলবে জ্বালানিবিহীন এ গাড়ি। গাড়িটি অচিরেই বাজারে আনায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আমির হোসেন।

যোগাযোগ : ০১৭১৪-৪২২৪৬৭

সৌরচালিত পানির পাম্প : সমস্যা ও সম্ভাবনা

কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষি জমিতে সেচ একটি গুর্বত্বপূর্ন কাজ। মোট আমদানিকৃত ২৬-২৭ লাখ মে.টন ডিজেলের এক পঞ্চমাংশ সেচকাজে ব্যবহৃত হয়। ডিজেলচালিত মোট ১১ লাখ অগভীর এবং এলএলপি পাম্পের মাধ্যমে সারাদেশে প্রায় ৭৭ ভাগ কৃষি জমিতে সেচ প্রদান করা হয়। অন্যদিকে বিদ্যুতের মাধ্যমে ২৩ শতাংশ জমিতে সেচ দেয়া হয় যাতে প্রায় ৪০০-৫০০ মেঘাওয়াট বিদ্যুত খরচ হয়। যেহেতু পর্যাপ্ত শক্তি অপ্রতুল তাই প্রতিবছর বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচকার্যের মারাত্নক ব্যাঘাত ঘটে। তাই যদি সৌর চালিত পাম্প চালু করা যায় তা হবে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন যাতে বিদ্যুত ও ডিজেল নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।

অব্যাহতভাবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিও দরিদ্র কৃষকদের সেচখরচ অনেকাংশে বৃদ্ধি করে (যদিও বর্তমান সরকার ৰমতা গ্রহনের অব্যবহিত পরেই ডিজেলের মূল্য ৰানিক হৃাস করে এবং কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি প্রদানের প্রতিশ্র্বতি দেয়)। 

তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে মোট বিদ্যুত উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা অনেক বেশি থাকায় স্বাভাবিক সেচ কার্যক্রম ব্যহত হয়। সময়মত সেচ প্রদান করতে না পারায় ফসলের ফলনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এ পরিসি'তিতে সৌর চালিত পাম্প বিদ্যূত ও ডিজেলের বিকল্প হিসেবে শক্তির চাহিদা মিটাতে সৰম হবে। ৫,৬০০-৪৫,০০০ লিটার পানি সরবরাহে সৰম ৩০০-২,৪০০ ওয়াট ৰমতা সম্পন্ন সৌর পানির পাম্পের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন সৌদি আরব, চীন, জাপানে সেচ প্রদান করা হয়। উদাহরণস্বরূপ ১,৮০০ ওয়াট ৰমতাসম্পন্ন একটি সৌরচালিত পানির পাম্পের মাধ্যমে ২০ মিটার গভীর থেকে দৈনিক ৮২,০০০ লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০.২৭ লাখ টাকা। এ মূল্যের সহিত ১০ বছর পরে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা দিয়ে একটি পাম্প পূন:স'াপন করতে হবে যার ২০ বছর পরে মূল্য দাড়ায় ১২.২৭ লাখ টাকা। এ হিসেবে ১ লিটার পানির উত্তোলনের খরচ দাড়ায় ০.২৫ পয়সা। অন্যদিকে ৫ অশ্বশক্তি ৰমতা সম্পন্ন একটি ডিজেলচালিত পাম্প একই পরিমান পানি উত্তোলনে শুধু ডিজেল খরচ বাবদ ২০ বছরে খরচ হবে ১৩.২৮ লাখ টাকা (প্রতি লিটার ডিজেল ৪০ টাকা হিসেবে)। 
এর মাধ্যমে প্রতি লিটার পানি উত্তোলনে খরচ হবে ০.২৭ টাকা।

সৌরচালিত পানির পাম্পের সুবিধা: 

১. সৌর চালিত পানির পাম্প চালু করলে প্রতি পাম্পে প্রায় ২৫,০০০ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে পরিবেশ রৰা পাবে।
২. যদি প্রায় ১৩ লাখ ডিজেল চালিত পাম্পকে সৌর চালিত পাম্পে রূপান্তর করা হয় তাহলে প্রতিবছর প্রায় ১৪ লাখ ডিজেলের সাশ্রয় হবে যা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ থেকে দেশকে রৰা করবে।
৩. শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুত ও ডিজেলের অভাবে সেচ কার্য বাধাগ্রস' হবে না।

সমস্যা:
আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষক প্রান্তিক শ্রেণীর তাই তাদের পৰে একক ভাবে বিপুল পরিমান টাকা যোগান দিয়ে সৌর পাম্প স'াপন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সৌর পাম্পের রৰণাবেৰণ করার জন্য যে কারিগরি দৰতা প্রয়োজন তা আমাদের অধিকাংশ কৃষকেরই অনুপসি'ত। সৌর বিদ্যুত স'াপনের জন্য কৃষি ঋণের অপর্যাপ্ততা এ খাতে অন্যতম বড় সমস্যা।

সম্ভাবনা:
সরকারি সহায়তার মাধ্যমে কৃষকদের সংগঠিত করে কমিউনিটি ভিত্তিতে সৌর পাম্প চালু করা সম্ভব। ইতোমধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে প্রতি উপজেলায় অনেক আইপিএম কৃষক ক্লাব প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ ক্লাবগুলোকে সংগঠিত করে সেখানে কার্যকরভাবে সৌর চালিত পানির পাম্প অনায়াসে স'াপন করা সম্ভব। আমাদের দেশের আবহাওয়া বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পরিষ্কার সূর্যের আলো অনুকুল থাকায় সৌর পাম্প কার্যকারিতা অটুট থাকবে। বাংলাদেশের যে সমস্ত এলাকায় বিদ্যুৎসরবরাহ নেই অথবা ডিজেল সরবরাহেরও যথাযথ ব্যবস'া নেই যেমন পার্বত্য ও দ্বীপ এলাকার বিস্তীর্ন কৃষি জমিকে সৌর চালিত পানির পাম্পের সাহায্যে চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
সুত্রঃ মো. আবদুলৱাহীল বাকী ভূইয়া, প্রভাষক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ও প্রাক্তন এইও (এল আর), এআইএস।

বারি কম্পোস্ট সেপারেটর

মাটির ভাল স্বাস্থ্য ও টেকসই উর্বরা ব্যবস্থাপনা নির্ভর করে মাটিতে বেশি পরিমাণ জৈব পদার্থ ব্যবহার করা ও কম পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহারের উপর। ক্রমবর্ধমান মাটির উর্বরা ঘাটতি বর্তমানে একটি কঠিন সমস্যা। ৬০ ভাগেরও বেশি আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১.৭ ভাগেরও নিচে নেমে গেছে। তাই বেশি পরিমাণ জৈব সারের ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের প্রয়োগ হ্রাস করতে হবে। ভার্মিকম্পোস্ট এমন এক ধরনের সার যা ব্যবহারে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৫০ ভাগ পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। কিছু নির্বাচিত প্রজাতির কেঁচো রয়েছে যা গোবর, বায়োস্লারি, খড়, পচনশীল আবর্জনা, লতাপাতা ইত্যাদি খেয়ে মলত্যাগ করে ও তার দেহ হতে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হবে। এগুলো জৈব পদার্থের সাথে মিশে পুষ্টিমান বাড়িয়ে দেবে। বর্জ্য পদার্থ যখন চায়ের গুঁড়ার মত ঝুরঝুরে হয় তখন বুঝতে হবে সার তৈরি হয়ে গেছে। কেঁচো সার তৈরি হতে ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। প্রকৃতপক্ষে কেঁচোর মলই হল এ সার। এ অবস্থায় চালুনি দিয়ে চেলে কোকুন (কেঁচোর ডিম) এবং ঝরঝরা অংশ আলাদা করতে হবে। ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার তৈরিতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য কাজ হল কম্পোস্ট থেকে কেঁচো আলাদা করা ও ছেঁকে নির্দিষ্ট সাইজের গুঁড়া প্যাকেটজাত করার জন্য আলাদা করা। চালনির মাধ্যমে হাতে চেলে কাংখিত আকারের সার পাওয়ার জন্য দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। হাতে চেলে কেঁচো আলাদা করা যেমন কষ্টের তেমনি কেঁচোর স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। তাছাড়া এভাবে সার কমপক্ষে দু’বার হাতে চালতে হয়। ভার্মিকম্পোস্ট তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি প্রাকৃতিক হলেও চালার কাজটির বেশ কঠিন। এসব সমস্যা মাথায় রেখেই বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এফএমপি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিজ্ঞানীরা একটি চালুনি যন্ত্র উদ্ভাবন করে। যা দিয়ে একই সাথে কেঁচো আলাদা করে আশানুরূপ সার পাওয়া সম্ভব।

যন্ত্রটির প্রধান বৈশিষ্ট্য:১. সাধারণ লোহা দিয়ে তৈরি করা যায়;
২. মাত্র ০.৫ অশ্বশক্তির বৈদ্যুতিক মোটর দিয়ে চালানো যায়;
৩. সার থেকে কেঁচোকে সফলভাবে পুরোপুরি আলাদা করা যায়;
৪. কম সময় ও খরচে বাণিজ্যিকভিত্তিতে কেঁচো সার তৈরির কাজ করা যায়;
৫. মহিলা/পুরুষ এটা সহজেই চালাতে পারে;
৬. যন্ত্রটি চালাতে ৩ জন লোকের প্রয়োজন হয়;
৭. যন্ত্রটি দিয়ে ৫ মি.মি. এর চেয়ে কম ব্যসার্ধের চা পাতার মত সার সহজেই পাওয়া যায়;
৮. ঘণ্টায় ১৫০০ কেজি ভার্মিকম্পোস্ট চালা যায় যেখানে হাতে চাললে ৩ জন লোকে ঘণ্টায় ২৪০ কেজি ভার্মিকম্পোস্ট চালতে পারে।

যন্ত্রটির বিবরণ:১. এম এস এঙ্গেলবার দিয়ে তৈরি করা ফ্রেমে ছাকনি সিলিন্ডার বসানো থাকে;
২. এস এস নেট (৫ মেশ) দিয়ে আবৃত সিলিন্ডারাকৃতির ছাঁকনিটি একটি শ্যাফটের সাহায্যে দু’টি বিয়ারিং এর উপর স্থাপিত থাকে;
৩. ০.৫ অশ্বশক্তির বৈদ্যুতিক মোটর থেকে মেইন শ্যাফটে শক্তি দেয়া হয়;
৪. সিলিন্ডার শ্যাফেটর ঘূর্ণন গতি মিনিটে ভার্মিকম্পোস্টের জন্য ১০ বার এবং ট্রাইকোকম্পোস্টের জন্য ১৫ বার;
৫. সিলিন্ডারটি ইনপুট থেকে আউটপুটের দিকে ১০০ কোণে আনত থাকে;
৬. মাপ: দৈর্ঘ্য ৪ ফুট (প্রস্থ ৩ ফুট) উচ্চতা ৫ ফুট;
৭. ওজন: ৯৫ কেজি।

কার্যপ্রণালী:যন্ত্রটি একটা ছায়াযুক্ত সমতল ও খোলা জায়গায় বসিয়ে বৈদ্যুতিক লাইনে মটরকে সংযোগ দিন। সুইচ অন করলে মটর চালু হবে এবং সিলিন্ডারাকৃতির চালনি ঘুরতে থাকবে। প্রবেশ হপারে পিট/চাঁড়ি থেকে সংগ্রহকৃত কম্পোস্ট ঢালুন। হালকা আর্দ্রতাসম্পন্ন কম্পোস্ট সমানভাবে চালনিতে প্রবেশ করান। মুহূর্তের মধ্যে কাংখিত চা পাতার মতন সার চালনির নিচে সংগ্রহ ট্রেতে জমা হবে এবং কেঁচো ও বড় আকৃতির বর্জ্য নির্গমন পথ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। উল্লেখ্য যে, কেঁচোগুলো একদিকে জমা হবে এবং বর্জ্য দূরে জমা হবে। কেঁচোগুলোকে সামান্য বর্জ্যসহ আলাদা করে নতুন পিটে/চাঁড়িতে দেয়া যাবে। বড় আকৃতির বর্জ্য কম্পোস্ট তৈরির জন্য পুনরায় পিটে/চাঁড়িতে দেয়া যাবে।

সতর্কতা:যন্ত্রটি চালানোর সময় ঢিলাঢালা পোশাক না পরাই ভাল। বৈদ্যুতিক লাইন যাতে শর্টসার্কিট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।পরীক্ষার ফলাফল:কার্যক্ষমতা: ১,৫০০ কেজি/ঘণ্টা (ভার্মিকম্পোস্টে যখন ১৬-১৮% আর্দ্রতা থাকে)
চালুনি খরচ: ০.০৭ টাকা/কেজি (ভার্মিকম্পোস্ট সেপারেটর) ও ০.৪০ টাকা/কেজি (হাতে)। মূল্য:২০,০০০ টাকা।

বিশেষ পরামর্শ:কেঁচো সার তৈরির চাঁড়ি/রিঙগুলো থেকে সার সংগ্রহের আগে যদি স্তরে স্তরে সার হাত দিয়ে আলগা করে এক থেকে দু’ঘণ্টা রাখার পর সার সংগ্রহ করা হয় তবে কেঁচো নিচের দিকে চলে যায় ফলে সংগ্রহকৃত সারে কেঁচো কম থাকে। এভাবে কয়েক স্তরে সারকে আলগা করে রেখে ঘণ্টা খানেক পরে সার সংগ্রহ করলে কেঁচো কম পৃথক করতে হয়, অনেক কেঁচোকে একসাথে সংগ্রহ করা যায় ও কেঁচো আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া থেকে রেহাই পায়।
লেখক: মোহাম্মদ এরশাদুল হক, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
ফার্ম মেশিনারি এন্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর

আমিরের ধানকাটা যন্ত্র : দু’ঘণ্টায় কাটা যাবে এক একর জমির ধান

আসাদুজ্জামান ফিরোজ, বগুড়া
বগুড়ার প্রকৌশলী আমির হোসেন এবার হালকা ও সস্তা ধানকাটা মেশিন তৈরি করেছেন। এ মেশিন দিয়ে ধান-গম-ভুট্টা-পাট ও আখ কাটা যাবে। যন্ত্রটির নাম কলের কাচিঁ

আমির হোসেনের তৈরি এ মেশিনে দুঘণ্টায় এক একর জমির ধান কাটা যাবে। এজন্য খরচ হবে ২ লিটার পেট্রোল। ১ দশমিক ৫ হর্স পাওয়ারের মেশিন খুব হালকা, ১০/১৫ কেজি ওজন। নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী যে কেউ সহজেই যন্ত্রটি চালিয়ে ধান-পাট-গম-ভুট্টা-তিল-আখ গাছ কাটতে পারবেন। আপাতত পেট্রোল ইঞ্জিন তৈরি করলেও তিনি পরে এটিকে সোলার পাওয়ার মেশিনে রূপান্তরিত করবেন বলে জানান।
তৈরি হলো যেভাবে: কোনো যন্ত্র একবার মনে ধরলে অবিকল সে-রকম যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করেন আমির হোসেন। এটি তাঁর শখ। বছরখানেক আগে তিনি গাজীপুরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে গিয়ে ধান কাটার একটি যন্ত্র দেখেন। যন্ত্রটি বেশ বড়। আমির জানতে পারেন, বিদেশ থেকে এটি প্রায় ১২ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। যন্ত্রটি তাঁর মনে ধরে। স্বল্পমূল্যে চাষিদের এমন একটি যন্ত্র উপহার দেওয়ার কথা ভাবেন তিনি।
 বাড়ি ফিরে আমির তাঁর মেয়ে আশার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেন। আশা বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজের শিক্ষার্থী। যন্ত্রের নকশা তৈরির ওপর স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ রয়েছে তাঁর। বাবার কথামতো ধান কাটার যন্ত্রের একটি নকশা তৈরি করেন তিনি। আমির নকশামতো যন্ত্র তৈরিতে নেমে পড়েন। প্রায় এক বছর ধরে এই মেধা ও শ্রম দিয়ে তিনি তৈরি করেন কলের কাঁচি

 এই কলের কাস্তে তৈরিতে আমির দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে পাইপ, কার্বন স্টিল পেনিয়াম, কার্বন স্টিল ব্লেড রয়েছে। যন্ত্রে জুড়ে দেওয়া হয়েছে দেড় অশ্বশক্তির পেট্রলচালিত ইঞ্জিন।
 আমির জানান, তাঁর কলের কাঁচি দিয়ে দুই ঘণ্টায় এক একর জমির ধান কাটা যাবে। প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে খরচ হবে ৬০৭০ টাকা। যন্ত্রটি তুলনামূলকভাবে হালকা হওয়ায় এটি দিয়ে পূর্ণবয়স্ক যে কেউ সহজে ক্ষেতের ফসল কাটতে পারবেন। তিনি জানান, কৃষকেরা এখন যন্ত্রটি আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় কিনতে পারবেন। যন্ত্রটি আরও সস্তা ও আধুনিক করতে তিনি কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি সহযোগিতা পেলে কৃষক পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় এটি কিনতে পারবেন।

একজন কৃষক মাত্র ৮/১০ মণ চাল বিক্রি করে এ মেশিন ৮/১০ হাজার টাকায় কিনতে পারবেন। ইঞ্জিনের বিশেষত্ব, ধান-পাট-গম যে অবস্থায় থাকুক, যে অবস্থায় লাগানো হোক, খাড়া থাক বা মাটিতে হেলে পড়ুক, সহজেই এসব কাটা যাবে।

এ মেশিন দিয়ে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটে এক বিঘা জমির ধান কেটে দেখিয়েছেন আমির হোসেন বগুড়া পৌর এলাকার ধরমপুর গ্রামের মাঠে। এক বিঘা জমির ধান কাটতে খরচ হবে মাত্র ৬০/৭০ টাকা। বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন দাবি করেছেনচীন, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড কোনো দেশ এখনও তার মতো হালকা, টেকসই ও সস্তা শস্যকাটার মেশিন তৈরি করতে পারেনি। তারা যা তৈরি করেছে, তা অনেক ভারি, দামি ও ব্যয়বহুল। ওইসব যন্ত্র ব্যবহার করতে হলে ধান-পাট-গম লাইন করে লাগাতে হয় এবং খাড়া হয়ে থাকতে হয়। কিন্তু মাটিতে ধান-পাট-গমের গাছ হেলে পড়লেও আমিরের তৈরি মেশিন দিয়ে সহজেই কাটা যাবে।

বোরো মৌসুমে একসঙ্গে লাখ লাখ একর জমির ধান পেকে যায়। শ্রমিকের অভাবে কৃষক ধান কাটতে পারে না। সে সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকায় শঙ্কিত থাকে কৃষক। অনেকেই শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে না পারায় ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে যায়। একথা চিন্তা করে আমির হোসেন হালকা ও সস্তা এ ধানকাটার মেশিন তৈরি করেছেন।

এ মেশিন আরও সস্তা ও আধুনিক করার জন্য কৃষিমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সহযোগিতা চেয়েছেন আমির হোসেন। সোলার পাওয়ারে এ মেশিন চালানো গেলে শস্য কাটতে কোনো খরচ লাগবে না। এ প্রযুক্তির ওপর তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ৬ বিভাগের ৬শ কৃষকের মধ্যে তার এই সস্তা ধানকাটা মেশিন নামমাত্র মূল্যে তৈরি করে দিতে চান। কৃষিকে যান্ত্রিক ও আধুনিকীকরণের জন্য এটি তার আর একটি নতুন পদক্ষেপ।

এ ব্যাপারে বগুড়ার কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক রোস্তম আলী সাংবাদিকদের বলেন, এই যন্ত্র ব্যবহার করে কৃষককুল উপকৃত হবে। ধান কাটতে খরচ ও সময় দুই-ই বাঁচবে।

ভিডিও লিংক

ধান ও গম কাটা মেশিন

কৃষি প্রধান বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের মধ্যে ধান ও গম অন্যতম। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়ানো দরকার তেমনি দরকার উৎপাদন খরচ কমানোর। আমাদের দেশে ফসল উৎপাদন ও আহরণের ক্ষেত্রে এখনো সনাতন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ধান অতিরিক্ত শুকিয়ে ৪-৫% জমিতেই ঝরে পড়ছে।এ ধান ও গম কাটার সময়, খরচ ও শ্রম বাঁচিয়ে উৎপাদন খরচ কমাতে ধান ও গম কাটার যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।

ব্যবহারের নিয়মাবলী :
ইঞ্জিন চালু করার পূর্বে ফুয়েল ট্যাংক ডিজেল দ্বারা পূর্ণ করতে হবে। ইঞ্জিনে সঠিক গ্রেডের এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করতে হবে। বোল্ট ও চেইন টেনশন সঠিক রাখতে হবে। নাট, বোল্ট, ফিটিংস্ ইত্যাদি চেক করতে হবে। এরপর ইঞ্জিন টেনশন পুলির সহায়তায় ট্রান্সমিশন সিস্টেম হতে বিচ্ছিন্ন করে ইঞ্জিন চালু করতে হবে। ইঞ্জিন চালুর পর কাটার ব্লেড, চেইন লাগ, স্টার হুইল ইত্যাদি সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা লক্ষ্য রাখতে হবে। ধান বা গম কর্তন আরম্ভ করার পূর্বে লক্ষ্য রাখতে হবে যদি জমির আইল ৬ ইঞ্চির বেশি উঁচু হয় তবে অবশ্যই জমির চারদিকে ফসল ১ ফুট পরিমাণ কাঁচির সাহায্যে পূর্বেই কর্তন করে নিতে হবে, এতে শস্য সঠিকভাবে ডান দিকে পড়বে।

সংরক্ষণ পদ্ধতি :
ব্যবহারের পর যন্ত্রটি থেকে ঘাস, খড়, মাটি সম্পূর্ণরূপে পরিস্কার করতে হবে। ফুয়েল ট্যাংক হতে সম্পূর্ণ ফুয়েল বের করে পরিস্কার করতে হবে। কোনো অংশ ঢিলা হলে তা ঠিক করে নিতে হবে। যন্ত্রটির ঘূর্ণায়মান অংশগুলোতে এবং চেইনে মাঝে মাঝে মবিল দিতে হবে। মৌসুম শেষে ভালভাবে পরিস্কার করে শুষ্ক ও উপরে শেড যুক্ত স্থানে রাখতে হবে। কাটিং ব্লেড এবং চেইনে লুব্রিকেটিং অয়েল বা গ্রিজ দিয়ে রাখতে হবে ।

যন্ত্রের সুবিধা :
যন্ত্রটি ঘণ্টায় ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ জমির ফসল কাটতে পারে। এক ঘণ্টায় মাত্র আধা লিটার ডিজেল খরচ হয়। যন্ত্রটি চালাতে মাত্র একজন লোকের প্রয়োজন হয়। যন্ত্রটির ওজন কম তাই প্রয়োজনে রশি, বাঁশের সাহায্যে এক জমি থেকে অন্য জমিতে নেয়া যায় এবং পরিবহনের সময় জমির কোনো ক্ষতি হয় না। এর চাকা বিশেষভাবে তৈরির ফলে অল্প পরিমাণ কাদা ও পানি থাকলে জমিতে ব্যবহার করা যায়। যন্ত্রটির সকল পার্টস দেশর সর্বত্র পাওয়া যায় এবং সহজেই স্থানীয় ওয়ার্কশপে মেরামত যোগ্য । ধান ও গম কাটার যন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগে।
লেখক : মো. আরিফুল হক, ছাত্র, বাকৃবি, ময়মনসিংহ
তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক