দেশি মাগুর: কৃত্রিম প্রজননে রেণু উৎপাদন ও ডিম-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা (যুগোপযোগীভাবে সাজানো)
দেশি মাগুর একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ, সুস্বাদু ও জনপ্রিয় মাছ। রোগীর পথ্য হিসেবেও এর চাহিদা অনেক। একসময় প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছটি সহজেই পাওয়া গেলেও এখন দেশি মাগুর তুলনামূলক কম দেখা যায়—ফলে এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। তবে আশার কথা, দেশের মাছ চাষিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশি মাগুরকে আবার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন।
নিচে দেশি মাগুরের ডিম সংগ্রহের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং রেণু উৎপাদনকালীন সতর্কতা—সহজ ভাষায়, গুছিয়ে দেওয়া হলো।
১) ডিম সংগ্রহের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা (Post-spawning Egg Management)
ডিম সংগ্রহের পরই সঠিক যত্ন শুরু না হলে ফাঙ্গাস আক্রমণ, ডিম নষ্ট হওয়া, এমনকি বাচ্চা বের হলেও মৃত্যুহার বেড়ে যেতে পারে। তাই ধাপে ধাপে কাজগুলো ঠিকভাবে করতে হবে।
ক) ডিম সিস্টার্নে নেওয়া
ডিম সংগ্রহ করার পর ডিমগুলোকে সিস্টার্নে নিয়ে যেতে হবে।
সিস্টার্ন আয়তাকার হওয়া ভালো।
প্রস্তাবিত মাপ: দৈর্ঘ্য ৮ ফুট, প্রস্থ ৪ ফুট (এ মাপ হলে ব্যবস্থাপনা সহজ হয়)।
সিস্টার্নে পানির উচ্চতা ৩ ইঞ্চির বেশি দেওয়া উচিত নয়।
খ) ডিম বিছানো (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
ডিমগুলোকে পাখির পালক দিয়ে আস্তে আস্তে সিস্টার্নে পাতলা করে বিছিয়ে দিতে হবে।
দেশি মাগুরের ডিম আঠালো, তাই—
একটি ডিম আরেকটির সাথে যেন না লেগে যায় এভাবে বিছাতে হবে।
ডিম ঘন করে দেওয়া যাবে না।
গ) পানির ঝর্ণা/প্রবাহের ব্যবস্থা
আধা ইঞ্চি PVC পাইপে ছিদ্র করে পানির ঝর্ণা/শাওয়ার-এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এই সময় ঠাণ্ডা পানির ঝর্ণা সার্বক্ষণিক চালু রাখা জরুরি।
ঘ) তাপমাত্রা ও ডিম ফোটার সময়
দেশি মাগুরের ডিম ফুটতে কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় বেশি সময় লাগে।
তাপমাত্রা ভেদে ডিম ফুটতে সাধারণত ৩০–৩৬ ঘণ্টা লাগে।
পানির তাপমাত্রা ২৭–২৮° সেলসিয়াস রাখা দরকার।
অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা হলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলেও পরে বাচ্চা মারা যেতে পারে।
ঙ) ফাঙ্গাস নিয়ন্ত্রণ ও নষ্ট ডিম সরানো
দীর্ঘ সময় থাকায় ডিমে ফাঙ্গাস আক্রমণ হতে পারে।
ফাঙ্গাস দেখা গেলে সাথে সাথে আক্রান্ত ডিমগুলো সাইফনের মাধ্যমে তুলে ফেলে দিতে হবে।
না করলে খুব দ্রুত ফাঙ্গাস এক ডিম থেকে অন্য ডিমে ছড়িয়ে সব ডিম নষ্ট করতে পারে।
২) ডিম ফোটার পর বাচ্চার প্রাথমিক যত্ন (Hatchling Care)
ক) বাচ্চা কোথায় থাকবে?
ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর বাচ্চাগুলো সাধারণত নিজে থেকেই সিস্টার্নের কোণায় গিয়ে জমা হয়।
কোণায় অবস্থান নিলে সাধারণত বাচ্চার নিরাপত্তা ভালো থাকে।
খ) সিস্টার্ন পরিষ্কার (কোণায় গেলে)
বাচ্চাগুলো কোণায় অবস্থান নিলে সিস্টার্নের মাঝখানে থাকা ময়লা/ধূলাবালি সাইফন দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে।
গ) কখন থেকে খাবার দিতে হবে?
বাচ্চার বয়স ৭২ ঘণ্টা পার হলে কৃত্রিম খাবার/প্রথম খাবার দিতে হবে।
এই সময় খাবার হিসেবে দিতে হবে—
ছোট জু-প্ল্যাংকটন (জীবিত অবস্থায়)
জু-প্ল্যাংকটন পুকুর থেকে জীবিত ধরে সংগ্রহ করে সিস্টার্নে দিতে হবে।
ঘ) নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর
সিস্টার্নে দুই দিন জু-প্ল্যাংকটন খাওয়ানোর পর বাচ্চাগুলোকে নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করতে হবে।
৩) রেণু উৎপাদনকালীন সতর্কতা (Production-Time Precautions)
১) ব্রুড মাছ পরিপক্ক হওয়া বাধ্যতামূলক
ব্রুডমাছ (মা-বাবা মাছ) পুরোপুরি পরিপক্ক না হলে পুরো প্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে পারে।
২) ডিম সংগ্রহের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না
চাপ বেশি দিলে ডিম ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩) সিস্টার্নে ডিম অধিক ঘনত্বে দেওয়া যাবে না
ডিম পাতলা করে বিছাতে হবে, ডিম যেন একটির সাথে অন্যটি না লাগে।
৪) ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ ও ২৭–২৮° সেলসিয়াস নিশ্চিত করতে হবে
তাপমাত্রা বেশি হলে ডিম ফুটলেও বাচ্চা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
উপসংহার
সঠিক ব্রুড নির্বাচন, সিস্টার্নে ডিম পাতলা করে বিছানো, ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ বজায় রাখা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ফাঙ্গাস হলে দ্রুত আক্রান্ত ডিম অপসারণ—এই নিয়মগুলো মানলে চাহিদা অনুযায়ী যে কেউ দেশি মাগুরের রেণু উৎপাদন করতে পারবেন।
তথ্যসূত্র:
এ.কে.এম. নূরুল হক
ব্রহ্মপুত্র ফিস সিড কমপ্লেক্স (হ্যাচারি)
চর পুলিয়ামারী, শম্ভুগঞ্জ, ময়মনসিংহ










0 comments:
মন্তব্য করুন