পুকুরে চিতল মাছের পোনা উৎপাদন পদ্ধতি (প্রাকৃতিক ডিম সংগ্রহ + নার্সারি)
চিতল মাছ (Notopterus chitala) আমাদের দেশীয় মূল্যবান মাছ। প্রাকৃতিকভাবে এরা নির্দিষ্ট মৌসুমে ডিম দেয় এবং ডিম আঠালো হওয়ায় সঠিকভাবে ডিম সংগ্রহ ও নার্সারিতে স্থানান্তর করতে পারলে পোনা উৎপাদন করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে কাজগুলো মূলত ৪ ভাগে ভাগ করা যায়—
ব্রুড পুকুর প্রস্তুতি (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি)
ব্রুড মাছ মজুদ ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা (ফেব্রুয়ারি–মার্চ)
ডিম দেওয়া ও ডিম সংগ্রহ (এপ্রিল–জুলাই)
নার্সারি পুকুর প্রস্তুতি ও পোনা লালন (ডিম পাওয়ার পর ১২–১৫ দিন থেকে ২–৩ সপ্তাহ)
১) ব্রুড পুকুর প্রস্তুতি (জানুয়ারি মাস)
✅ লক্ষ্য
পুকুরে এমন পরিবেশ তৈরি করা যাতে চিতল মাছ স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম দিতে পারে এবং ডিম আটকানোর জন্য প্রাকৃতিক/কৃত্রিম আশ্রয় থাকে।
ধাপে ধাপে
পুকুর শুকানো (প্রায় ১৫ দিন)
জানুয়ারির দিকে পুকুর ভালোভাবে শুকিয়ে রাখুন।
এতে তলার ক্ষতিকর গ্যাস/জীবাণু কমে, তলা শক্ত হয়।
তলায় ঘাস/প্রাকৃতিক আশ্রয় গড়ে উঠতে দেওয়া
শুকানোর পর যখন তলায় হালকা ঘাস/জলজ উদ্ভিদ উঠতে শুরু করবে, তখন ধীরে ধীরে পানি দিন।
পানি বাড়ার সাথে সাথে তলার ঘাসগুলো বড় হয়ে পানির উপর ভেসে উঠতে পারে—এটাই পরে ডিম দেওয়ার জন্য প্রাকৃতিক আশ্রয়/আঁকড়ে ধরার জায়গা তৈরি করে।
টিপস: একেবারে হঠাৎ করে পূর্ণ পানি না দিয়ে ২–৩ ধাপে পানি দিন। এতে পরিবেশটা “প্রাকৃতিক” থাকে।
২) ব্রুড মাছ মজুদ ও খাদ্য ব্যবস্থা (ফেব্রুয়ারি)
✅ ব্রুড মাছ ছাড়ার সময়
পুকুর প্রস্তুতির প্রায় এক মাস পর, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে।
✅ মজুদ ঘনত্ব (স্টকিং ডেনসিটি)
প্রতি শতাংশে সর্বোচ্চ ৩টি ব্রুড চিতল (মাতৃ + পুরুষ মিলিয়ে)
অতিরিক্ত ঘনত্ব হলে ধাক্কাধাক্কি/আঘাত/স্ট্রেস বাড়ে, ডিম কমে।
✅ খাদ্য ব্যবস্থা (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ)
চিতল মাছ স্বভাবগতভাবে শিকারি, কিন্তু সাধারণত বড় মাছ খায় না—ওদের পছন্দ ছোট ছোট মাছ।
কার্প/রুই জাতীয় মাছের ধানী পোনা
ব্রুড ছাড়ার পর খাদ্য হিসেবে পুকুরে ধানী পোনা ছেড়ে দিন।
এগুলো চিতলের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে কাজ করবে।
তেলাপিয়ার বাচ্চা (লাইভ ফুড) তৈরি করতে ব্রুড তেলাপিয়া ছাড়ুন
পুকুরে কিছু সংখ্যক ব্রুড তেলাপিয়া ছেড়ে দিলে তারা প্রাকৃতিকভাবে বাচ্চা দেবে।
সেই ছোট তেলাপিয়া বাচ্চা চিতলের খুব পছন্দের খাবার—এতে চিতল দ্রুত শক্তি পায়, ডিম দেওয়ার প্রস্তুতি ভালো হয়।
সতর্কতা: ব্রুড তেলাপিয়া বেশি হলে তেলাপিয়া অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে পুকুরে প্রতিযোগিতা/ঘোলাভাব বাড়াতে পারে। তাই “কিছু সংখ্যক” রাখাই ভালো।
৩) ডিম দেওয়া, প্রজনন ত্বরান্বিত করা ও ডিম সংগ্রহ (এপ্রিল–জুলাই)
✅ চিতল কখন ডিম দেয়?
সাধারণভাবে এপ্রিলের শেষ দিক থেকে জুলাই পর্যন্ত, বিশেষ করে
অমাবস্যা বা পূর্ণিমার রাতে প্রাকৃতিকভাবে ডিম দেয়
বর্ষা মৌসুমে এই প্রবণতা আরো বাড়ে
✅ প্রজনন ত্বরান্বিত করতে পানির প্রবাহ
এপ্রিলের শেষ দিক থেকে জুলাই পর্যন্ত—
শ্যালো মেশিন/পাম্প দিয়ে হালকা পানির প্রবাহ (water flow) দিলে
পানি সঞ্চালন ও অক্সিজেন বাড়ে
মাছ দ্রুত প্রজননে সাড়া দেয় এবং ডিম দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
টিপস: প্রবাহ “হালকা” রাখুন—অতিরিক্ত স্রোত হলে ডিম নষ্ট/ডিম ছাড়ার পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।
✅ ডিম সংগ্রহের কৌশল (কাঠের ফ্রেম/ছোট নৌকা)
কেন দরকার?
চিতলের ডিম আঠালো, তাই ডিম পানিতে ভেসে না থেকে কোনো জিনিসে লেগে থাকে।
এজন্য ডিম সংগ্রহের জন্য ডিম ধরার মাধ্যম তৈরি করতে হবে।
কীভাবে বানাবেন?
কাঠের ফ্রেম বানান ছোট নৌকার মতো
সেটি পানিতে ডুবিয়ে স্থিরভাবে রেখে দিন
ডিম দেওয়ার সময় মাছ সেই কাঠ/ফ্রেমে ডিম লাগিয়ে দেয়
কখন সেট করবেন?
এপ্রিলের আগেই ফ্রেম/নৌকা বানিয়ে পুকুরে বসিয়ে রাখুন
মে মাস থেকে ডিম দেখা শুরু হতে পারে
ডিম চেক করার সময়
অমাবস্যা/পূর্ণিমার ২–৩ দিন পর
কাঠের নৌকা/ফ্রেম ধীরে তুলে দেখুন ডিম আছে কি না
ডিম দেখা গেলে—ডিমসহ ফ্রেমটি দ্রুত নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করুন
৪) নার্সারি পুকুর প্রস্তুতি ও পোনা লালন
✅ নার্সারি পুকুরের সাইজ
চিতলের ডিম সংখ্যা তুলনামূলক কম হতে পারে, তাই
সাধারণত ৫ শতাংশ বা কাছাকাছি ছোট পুকুর নার্সারির জন্য সুবিধাজনক
✅ নার্সারি প্রস্তুতি (ধাপে ধাপে)
পুকুর শুকানো
তলায় চাষ/কাদা নেড়ে পরিষ্কার করা
পরিষ্কার পানি ২–৩ ফুট গভীরতা পর্যন্ত ভরা
পানি যেন থাকে পরিষ্কার ও স্থির (ডিমে ফাঙ্গাস রোধে জরুরি)
গুরুত্বপূর্ণ: চিতলের ডিম ফুটতে সাধারণত ১২–১৫ দিন লাগতে পারে (তাপমাত্রা অনুযায়ী)।
তাই অনেক আগে নার্সারি তৈরি করলে পানি পুরনো/নোংরা হয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে ভালো: ডিম পাওয়া নিশ্চিত হওয়ার পরই নার্সারি “ফাইনাল প্রস্তুত” করা।
✅ ডিমসহ ফ্রেম নার্সারিতে বসানো
ডিমসহ কাঠের নৌকাটি খুব দ্রুত, সতর্কভাবে এনে নার্সারি পুকুরে ডুবিয়ে স্থিরভাবে রেখে দিন
নৌকা/ফ্রেম নড়াচড়া কম করুন—ডিম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
✅ ডিম ফুটে পোনা হওয়া (Hatching)
তাপমাত্রাভেদে ১২–১৫ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের হবে
বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর চিতল পোনা সাধারণত তুলনামূলক বড়—অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ½ ইঞ্চি দেখা যায়
✅ নার্সারি খাদ্য ব্যবস্থাপনা
বাচ্চা ফুটে বের হওয়ার পর খাদ্য হিসেবে—
কার্প জাতীয় মাছের রেণু/ছোট পোনা দিতে পারেন (প্রাকৃতিক লাইভ ফুড হিসেবে)
পুকুরে যাতে অতিরিক্ত ঘোলাভাব/দূষণ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন
✅ নার্সারিতে সময়
নার্সারিতে প্রায় ২ সপ্তাহ রাখলে
পোনা প্রায় ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে
তারপর চাষের পুকুরে ছাড়ার জন্য প্রস্তুত।
✅ নিরাপত্তা: সাপ/শত্রু নিয়ন্ত্রণ
নার্সারি পুকুরে
১–২ ইঞ্চি ফাঁসের জাল/নেট চারপাশে বা প্রবেশমুখে রাখুন
যাতে সাপ/শত্রু প্রাণী আটকে যায় ও পোনা নষ্ট না করে
৫) চিতলের চাষ পদ্ধতি (মিশ্রচাষে)
বাংলাদেশে এখনও চিতলের একক (মনোকালচার) চাষ খুব সীমিত—কারণ প্রধান সমস্যা হলো পোনা প্রাপ্তি। তাই বাস্তবে চিতলকে সাধারণত মিশ্রচাষে রাখা হয়।
পরীক্ষালব্ধ সাধারণ ধারণা (মিশ্রচাষে)
প্রতি ৫ শতাংশে অন্যান্য মাছের সাথে ১টি চিতল দিলে
প্রায় ১ বছরে ~২ কেজি পর্যন্ত হতে পারে
অনেক ক্ষেত্রে আলাদা বাড়তি খাবার না দিলেও চলে (কারণ ছোট মাছ খেয়ে বড় হয়)
বাস্তবে ফলাফল পুকুরের প্রাকৃতিক খাবার, তেলাপিয়া বাচ্চা পাওয়া, পানি মান, ঘনত্ব—এসবের উপর নির্ভর করে।
৬) রোগবালাই ও ব্যবস্থাপনা
সাধারণ সমস্যা (প্রজনন মৌসুমে)
প্রজননের সময় পুরুষ–স্ত্রী চিতল জড়াজড়ি/ধাক্কাধাক্কি করতে গিয়ে—
মুখের কাঁটা বা বুকের নীচের কাঁটা দিয়ে একে অপরকে আঘাত করে
পরে শরীরে ক্ষত/ঘা দেখা দিতে পারে
করণীয়
প্রতিবার ডিম দেওয়ার পর পুকুরে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KMnO₄) প্রয়োগের কথা অনেক জায়গায় বলা হয়, যাতে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ কমে।
তবে এটা শক্তিশালী রাসায়নিক—ডোজ ও প্রয়োগ পদ্ধতি স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা সবচেয়ে নিরাপদ (পানির গভীরতা/পুকুরের আয়তন অনুযায়ী ডোজ বদলে যায়)।
মিশ্রচাষে রোগ কম
সাধারণভাবে মিশ্রচাষে চিতলে বড় ধরনের রোগবালাই তুলনামূলক কম দেখা যায়, যদি পানি মান ঠিক থাকে।
উপসংহার
উপরের ধাপগুলো ঠিকভাবে অনুসরণ করলে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চিতল মাছের ডিম সংগ্রহ, নার্সারিতে ফোটানো এবং পোনা তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে
মিশ্রচাষে ভালো লাভ করা যায়
এবং দেশীয় মূল্যবান চিতল মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে










0 comments:
মন্তব্য করুন