✅ পরিচিতি
মাশরুম অনেক প্রাচীন উদ্ভিদগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে এটি একটি পুষ্টিকর সবজি হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। অন্যদিকে মাশরুম হচ্ছে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ভালো পরিবেশে চাষ করা সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ওষুধিগুণসম্পন্ন সবজি যা সম্পূর্ণ হালাল। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বলা হয়েছে—
“মাশরুম এক ধরণের ছত্রাক, যা অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ওষুধিগুণসম্পন্ন সবজি হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত।”
গ্রীক, রোমান ও চীনারা মাশরুমকে দেবতার খাবার হিসেবে মনে করেন। প্রাচীন দেব-দেবীদের এটি দিয়ে অর্ঘ্য বা পূজো দেওয়া হতো। এমনকি রাজা-মহারাজাদেরকেও মাশরুম উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। মাশরুম বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফসল।
✅ মাশরুমের গুণাগুণ
• মাশরুম অত্যন্ত সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ওষুধিগুণসম্পন্ন হালাল সবজি।
• মাশরুমে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও মিনারেলের এমন সমন্বয় আছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
• মাশরুমে চর্বি ও শর্করা কম এবং আঁশ বেশি থাকায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের আদর্শ খাবার।
• মাশরুমে আছে শরীরের কোলেস্টেরল কমানোর কিছু উপাদান; তাই নিয়মিত মাশরুম খেলে হৃদরোগ ও উচ্চরক্তচাপ দূর হয়।
• মাশরুমে প্রচুর ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন-ডি আছে, যা শিশুদের দাঁত ও হাড় গঠনে অত্যন্ত কার্যকরী।
• মাশরুমে প্রচুর আয়রন থাকায় রক্তশূন্যতা দূর হয়। এ ছাড়া হেপাটাইটিস-বি, আমাশয়, ক্যান্সার, ডেঙ্গুজ্বর, টিউমার, ডায়াবেটিস, কিডনী রোগ ও এলার্জি প্রতিরোধক উপাদানও আছে।
• মাশরুমে “ট্রাইটারপিন” নামক উপাদান থাকায় বর্তমানে এটি বিশ্বে এইডস্ প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
• মাশরুমে প্রচুর গ্লাইকোজেন থাকায় শক্তি বাড়াতে কাজ করে; তাই যৌন অক্ষম রোগীদের জন্য মাশরুম একটি মহৌষধ।
• মাশরুম খেলে হাইপার টেনশন দূর হয়, মেরুদন্ড দৃঢ় হয় ও মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে।
• মাশরুম হজমে সহায়তা করে, রুচি বাড়ায় ও পেটের পীড়া দূর করে।
• মাশরুম খেলে শারীরিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, রক্তচাপ কমায়, রক্ত চলাচল বাড়ায়, সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করে।
• বাত, ব্যথা, জন্ডিস, কৃমি, রক্ত বন্ধ হওয়ার কাজে মাশরুম ব্যবহার হয়।
• নিয়মিত মাশরুম খেলে চুল পড়া ও চুল পাকা বন্ধ হয়।
• কম ক্যালরিযুক্ত হওয়ায় ওজন কমানোর জন্য আদর্শ খাদ্য।
• বিদেশে মাশরুম “ওষুধ, টনিক ও খাদ্য”—একটির ভিতরে তিন হিসেবে পরিচিত। মাশরুমের পুষ্টিমান মাংস ও সবজির সংমিশ্রণ বলে বিচিত্র ব্যবহারে অত্যন্ত রুচিকর রকমারী খাবার তৈরি করা সম্ভব।
🍽️ জনপ্রিয় খাবার
ভর্তা, সবজি-ভাজী, মাশরুম-গুঁড়ামাছ, মাশরুম-চিংড়ি মাছ, মাশরুম-মাংসের ভুনা, চাইনিজ কারি, চাইনিজ স্যুপ, মাশরুম পোলাও, মাশরুম-বিরিয়ানী, মাশরুম রাইস ইত্যাদি।
ফাস্টফুড/নাস্তা হিসেবে: মাশরুম ভাজা, চপ, সমুচা, রোল, স্যান্ডউইচ, পিৎজা, পেটিস, সিঙ্গাড়া, নুডুলস, বার্গার, চটপটি, মোগলাই ইত্যাদি।
✅ মাশরুমের পুষ্টিমান (১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমে শতকরা হিসাব)
১) সাদা বোতাম মাশরুম
প্রোটিন: ২৮.১
চর্বি: ৩.১
কার্বোহাইড্রেট: ৫৯.৪
আঁশ: ৮.৩
শক্তি (কিলোক্যালরি): ৩৫৩
২) ঝিনুক মাশরুম
প্রোটিন: ২১.৬
চর্বি: ৭.২
কার্বোহাইড্রেট: ৫৭.৬
আঁশ: ৮.৭
শক্তি (কিলোক্যালরি): ৩৪৫
৩) খড় মাশরুম
প্রোটিন: ২৯.৫
চর্বি: ৫.৭
কার্বোহাইড্রেট: ৬০
আঁশ: ১০.৪
শক্তি (কিলোক্যালরি): ৩৭৪
✅ ভিটামিন ও খনিজ (১০০ গ্রাম শুকনো মাশরুমে, মিলিগ্রাম)
১) সাদা বোতাম মাশরুম
থায়মিন: ৮.৯
রিবোফ্লাভিন: ৩.৭
নায়াসিন: ৪২.৫
ক্যালসিয়াম: ৭১০
পটাশিয়াম: ২৮৫০
আয়রন: ৮.৮
সোডিয়াম: ১০৬
২) খড় মাশরুম
থায়মিন: ১.২
রিবোফ্লাভিন: ৩.৩
নায়াসিন: ৯১.৯
ক্যালসিয়াম: ৭১৫
পটাশিয়াম: ৩৮৫৫
আয়রন: ১৭.১
সোডিয়াম: ৩৭৪
৩) ঝিনুক মাশরুম
থায়মিন: ৪.৮
রিবোফ্লাভিন: ৪.৭
নায়াসিন: ১০৮.৭
ক্যালসিয়াম: ৩৩৩
পটাশিয়াম: ৩৭০৩
আয়রন: ১৫.২
সোডিয়াম: ৮৩৭
👉 প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা মাশরুমে প্রায় ৩০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায় এবং এতে কোলেস্টেরল নেই। চর্বির পরিমাণ খুবই কম (২%–৮%), তবে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড আছে।
✅ মাশরুম চাষের প্রয়োজনীয়তা
• মাশরুম প্রোটিন, আঁশ, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ সবজি।
• আবাদি জমি দরকার হয় না—ঘরেই চাষ সম্ভব।
• খড়, কাঠের গুঁড়া, পচা পাতা, আখের ছোবড়া ইত্যাদি উপকরণ সস্তা ও সহজলভ্য।
• অল্প পুঁজি ও শ্রমে অধিক লাভ করা যায়।
• দেশের পুষ্টি উন্নয়ন, দারিদ্র দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
• বিশ্বে চাহিদা বাড়ায় রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
✅ মাশরুমের বৈশিষ্ট্য
মাশরুম একপ্রকার ছত্রাকজাতীয় উদ্ভিদ। এতে ক্লোরোফিল নেই বলে নিজে খাদ্য তৈরি করতে পারে না; তাই প্রাণীজ বা উদ্ভিজ বস্তুর উপর নির্ভরশীল। খাবারযোগ্য অংশ সাধারণভাবে চার ভাগে ভাগ করা হয়—
১) টুপী (Pileus)
ছাতার মত আকৃতি; সাধারণত মাংসল ও পুরু। জাতভেদে আকৃতি, মাপ ও বর্ণ ভিন্ন হয়।
২) জিল (Lamella)
টুপীর নিচের অংশ; এখানে স্পোর থাকে। স্পোরের মাধ্যমে বংশবিস্তার হয়। স্পোর খালি চোখে দেখা যায় না; অনেক স্পোর একসাথে ধুলোর মতো মনে হয়। স্পোর গজিয়ে হাইফা তৈরি হয়; অনেক হাইফা মিলে মাইসেলিয়াম হয়—এটাই মূল কাঠামো।
৩) আবরণ (Veil) ও এনুলাস (Annulus)
জিল ঢেকে রাখা আবরণ বৃদ্ধি পেলে ছিঁড়ে যায়; কিছু অংশ টুপীর কিনারায় থাকে, আর কিছু অংশ দণ্ডে আংটির মতো থাকে—এটি এনুলাস।
৪) দণ্ড
টুপীর মাঝখানে বা একপাশে হতে পারে। দণ্ড ভেতরে ভরাট বা ফাঁপা হতে পারে; আকৃতিও ভিন্ন হতে পারে।
✅ বাংলাদেশে চাষ উপযোগী মাশরুমের জাত
১) ঝিনুক মাশরুম (Oyster)
২) দুধ মাশরুম (Milky)
৩) কান মাশরুম (Wood ear)
৪) বোতাম মাশরুম (Button)
৫) শিতাকে মাশরুম (Shiitake)
৬) খড় মাশরুম (Paddy Straw)
✅ তাপমাত্রা (উৎপাদনের জন্য)
১) ঝিনুক: ২০°–৩২° সে.
২) দুধ: ২৫°–৩৭° সে.
৩) খড়: ২৫°–৩৯° সে.
৪) কান: ২২°–৩২° সে.
৫) তাপ সহনশীল বোতাম: ১৮°–২৪° সে.
৬) শিতাকে: ১৮°–২২° সে.
৭) বোতাম: ১৬°–২০° সে.
✅ বীজ (স্পন) উৎপাদন পদ্ধতি
মাশরুম বীজ/স্পন সহজে পাওয়া যায় না—তাই অনেকে চাষ করতে পারেন না। ল্যাবরেটরিতে দুইভাবে স্পন উৎপাদন করা যায়—
১) টিস্যু কালচার পদ্ধতি
২) স্পোর কালচার পদ্ধতি
✅ স্পন সংগ্রহের ঠিকানা
• প্রকল্প পরিচালক, মাশরুম সেন্টার উন্নয়ন প্রকল্প, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা। ফোন: ৭৭১০৬৪৬
• মান্না মাশরুমি, ৫৫/৬/১, পূর্ব বাইশটেকী (মুক্তিযোদ্ধা মসজিদ সংলগ্ন), মিরপুর-১৩, ঢাকা-১২১৬।
মোবাইল: ০১৭১২-৯৭২৪৬০, ০১৮১৯-২১৭৮৪৪
ফোন: ৯০১৬০২৬ (বাসা)
ই-মেইল: mannamushroomy@yahoo.com
✅ মাশরুম চাষ পদ্ধতি (সংক্ষেপে পূর্ণ নির্দেশনা)
চাষকৃত খাবার উপযোগী মাশরুমের মধ্যে বোতাম, ঝিনুক, কান, শিতাকে ও খড় মাশরুম—এই পাঁচটিকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১) ঝিনুক মাশরুম উৎপাদন পদ্ধতি
বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে “পিপি ব্যাগ” (পলিপ্রপাইলিন ব্যাগ) সরবরাহ করা হয়। ব্যাগের ওজন ৫০০ গ্রাম। মিডিয়া প্রস্তুত:
কাঠের গুঁড়া ৬৪% + গমের ভূষি ৩২% + ধানের ভূষি ৪% + সামান্য চুন + ৬০–৬৫% পানি।
ধাপসমূহ
• উজ্জ্বল সোনালী রঙের শুকনো খড় সংগ্রহ করে ১–২ ইঞ্চি টুকরা করতে হবে।
• খড় চটের থলিতে ভরে পরিষ্কার পানিতে এক রাত ভিজিয়ে রাখতে হবে।
• সকালে তুলে জালে রেখে অতিরিক্ত পানি ঝরাতে হবে।
• ড্রাম/ডেকচিতে পানি গরম করে খড় ভর্তি বস্তা ডুবিয়ে ৪০–৪৫ মিনিট গরম করতে হবে। পানি ফুটলে ১০ মিনিট রেখে “পাস্তুরাইজেশন” সম্পন্ন হবে।
• বিকল্পভাবে: ১০০ লিটার পানিতে ১২৫ মি.লি. ফরমালডিহাইড + ১২.৫ গ্রাম ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে খড় ১ দিন ডুবিয়ে রাখলেও পাস্তুরাইজেশন হবে।
• ঠান্ডা করে খড় ছড়িয়ে পানি ঝরাতে হবে।
• ৩৫×৪৫ সেমি পিপি ব্যাগে স্তরে স্তরে খড় ও স্পন দিতে হবে (খড় ৪–৫ ইঞ্চি, স্পন ছিটানো, আবার খড়—এভাবে ৩ স্তর)।
• ব্যাগের মুখ রাবার ব্যান্ড দিয়ে বন্ধ করতে হবে।
• স্পন কক্ষে তাপমাত্রা ২৫°–২৬° সে. রাখতে হবে।
• ২৫°–২৮° সে. তাপমাত্রায় ২–৩ সপ্তাহে মাইসেলিয়াম পুরো ব্যাগ ঢেকে ফেলবে।
• এরপর ব্যাগ “চাষ ঘরে/শস্য ঘরে” নিতে হবে; ৮ ইঞ্চি দূরে দূরে রেখে পলিথিন খুলে দিতে হবে।
• ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন + ৫ মি.লি. ফরমালডিহাইড মিশিয়ে ঘরে স্প্রে করতে হবে (মাশরুমে সরাসরি নয়)।
• চাষ ঘরের তাপমাত্রা ২৪°–২৬° সে. রাখতে হবে।
• ২–৩ দিনে মাশরুম ২–৩ ইঞ্চি হলে গোড়া থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
• সংগ্রহের পর ছিদ্রযুক্ত পলিথিন প্যাকেটে রাখা ভালো।
• সাধারণ তাপমাত্রায় ৫–৬ ঘণ্টা ভালো থাকে; ফ্রিজে ৩–৪ দিন।
• প্রথম ফসলের ১০ দিন পর আবার ফসল; মোট ৩ বারের বেশি না।
• বেশি হলে ৩–৪ দিন রোদে শুকিয়ে ৬ মাস রাখা যায়।
• মাছি হলে ম্যালাথিয়ন ০.১% স্প্রে; ছত্রাক হলে ৪% ফরমালডিহাইডে তুলা ভিজিয়ে আক্রান্ত স্থানে লাগাতে হবে।
২) কান মাশরুম (Wood ear) উৎপাদন পদ্ধতি
• কাঠের গুঁড়া ৮০% + ধানের তুষ ২০% + ২৫০ গ্রাম চুন মিশিয়ে ব্যাগে ভর্তি।
• ৯০°–১০০° সে. তাপমাত্রায় ৯০ মিনিট জীবাণুমুক্ত।
• ঠান্ডা করে স্পন দিয়ে ২৮° সে. তাপমাত্রায় ৮০%–৯০% আর্দ্রতায় রাখা।
• ২০–২৫ দিনে ব্যাগ ভরে গেলে চাষ ঘরে নিতে হবে; ব্যাগের উপর/নিচে কাট দিতে হবে।
• তাপমাত্রা ২২°–২৭° সে. ভালো।
• এক সপ্তাহে ফসল সংগ্রহযোগ্য।
• বিশেষত্ব: পরিপক্ক হলেও দুই সপ্তাহ নষ্ট হয় না।
৩) খড় মাশরুম (Straw/Paddy Straw) উৎপাদন পদ্ধতি
যা লাগবে: স্পন, ধানের খড়, শিমুল তুলা, চালের কুঁড়া, চাড়ি/ড্রাম, পলিথিন সিট, কাঠের ফরমা/বাক্স।
ধাপ
• পানিতে চুন মিশিয়ে খড় ভেজাতে হবে (১ কেজিতে ১০ গ্রাম চুন; ১ কেজি খড়ে ১০ লিটার পানি)।
• ৩০ মিনিট ভিজিয়ে পানি ঝরাতে হবে।
• পলিথিনের উপর স্তূপ বানিয়ে ঢেকে ২৪–৪৮ ঘণ্টা রোদে রাখা (তাপ ৪৫°–৫০° সে.)।
• বেড তৈরির আগে শিমুল তুলা ভিজিয়ে ৭০% আর্দ্রতা রাখা।
• মেঝে পরিষ্কার করে পলিথিন বিছিয়ে ফরমা বসানো।
• ৪ ইঞ্চি খড় বিছিয়ে, ২ ইঞ্চি ভিতরে তুলার টুকরা বসানো; চারপাশে ১০–১৫ গ্রাম স্পন ছিটানো, তারপর ৫ গ্রাম কুঁড়া + ৩ গ্রাম চুন।
• এভাবে ২য় স্তর, তারপর ৩য় স্তর।
• উপরিভাগে ১.৫ ইঞ্চি খড় দিয়ে আলতো চাপ।
• ৫–১০টি বেড ৬ ইঞ্চি দূরে দূরে করা যায়।
• পলিথিন দিয়ে ঢেকে ৩০°–৩৬° সে. তাপমাত্রায় মাইসেলিয়াম বৃদ্ধি।
• ২–৩ দিন পর পলিথিন খুলে ১ ঘণ্টা বাতাস।
• ৮–৯ দিনে গজাবে; ১০–১২ দিনে সংগ্রহ। ডিম্বাকৃতি অবস্থায় তুলতে হবে; বেশি দেরি হলে মাথা ফেটে মান নষ্ট। দিনে ২ বার তোলা ভালো।
৪) দুধ মাশরুম উৎপাদন পদ্ধতি
• খড় ১ ইঞ্চি টুকরা করে পাটের বস্তায় ভরে ৮–১৬ ঘণ্টা পানিতে ভিজানো।
• পানি ঝরিয়ে ড্রাম/পাতিলে ৯০° সে. তাপে ৩৫–৪০ মিনিট পাস্তুরাইজেশন।
• ঠান্ডা করে ব্যাগে স্তরে স্তরে খড় ও স্পন।
• স্পনিং কক্ষ আগে পরিষ্কার করে ১% ফরমালডিহাইড স্প্রে; কক্ষ অন্ধকারে রাখা।
• তাপমাত্রা ২৫°–৩৫° সে.
• ২০ দিন পর মাইসেলিয়াম হলে চাষ ঘরে।
কেসিং
• ৭৫% মাটি + ২৫% বালি + চক পাউডার।
• ৪% ফরমালডিহাইডে জীবাণুমুক্ত।
• ব্যাগের উপরিভাগে ০.১% কারবেনডাজিম + ০.৫% ফরমালডিহাইড স্প্রে।
• ১ ইঞ্চি কেসিং মাটি বিছিয়ে ভিজিয়ে রাখা।
• তাপমাত্রা ৩০°–৩৫° সে., আর্দ্রতা ৮০%–৯০%।
• ১০ দিন পর মাইসেলিয়াম দেখা গেলে হালকা আলো ও বাতাস।
• ৩–৫ দিনে দানা; পরের ৭ দিনে বড় হবে; তখন সংগ্রহ।
৫) শিতাকে (Shiitake) উৎপাদন পদ্ধতি (ব্যাগ পদ্ধতি)
• বাঁশের চাষঘর; পলিথিন দিয়ে ঢেকে খড়ের ছাউনি।
• কাঠের গুঁড়া ৮০–৯০% + ধানের তুষ ১০–২০% + পানি ৬৫% + ১% চুন।
• মিশ্রণ এক সপ্তাহ বাইরে রেখে পরে ব্যাগে ভরা।
• ব্যাগের মুখে রিং ও তুলা দিয়ে বন্ধ; তারপর জীবাণুমুক্ত।
• ঠান্ডা করে স্পনিং কক্ষে স্পন।
• ৪০–৪৫ দিনে ব্যাগ বাদামী ও শক্ত।
• চাষ ঘরে এনে মুখ কেটে পানি স্প্রে; ব্যাগ উল্টে/সোজা করে রাখা।
• তাপমাত্রা ২০°–২২° সে., আর্দ্রতা ৮০%–৮৫%; দিনে ২–৩ বার পানি স্প্রে; বাতাস চলাচল।
• মাশরুম গজাতে শুরু করবে।
৬) ওষুধি মাশরুম (রেইসি/লিংঝি) সম্পর্কে
প্রাচীনকাল থেকেই মাশরুমের ওষুধিগুণ জানা ছিল। চীন, কোরিয়া ও জাপানে টনিক/ওষুধ হিসেবে বহু বছর ব্যবহার হচ্ছে। রেইসি বা লিংঝি মাশরুম জনপ্রিয় হওয়ায় উৎপাদনও বাড়ছে। বাংলাদেশে চাষ ও রপ্তানির সুযোগ আছে। এর বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
৭) রেইসি (Reishi) মাশরুম চাষ পদ্ধতি
• ১ কেজি কাঠের গুঁড়া (কাঁঠাল/আম) + ১০০ গ্রাম ধানের তুষ + ৩০ গ্রাম জিপসাম; পানি দিয়ে আর্দ্রতা ৬০%–৬৫%।
• ৭০০ গ্রাম করে পিপি ব্যাগ/বোতলে ভরা (ইচ্ছা করলে ৮×১২ ইঞ্চি ব্যাগে ২ কেজিও)।
• মুখে কলার/রিং বসিয়ে তুলা দিয়ে বন্ধ।
• ৯৫°–১০০° সে. তাপে ৪–৫ ঘণ্টা জীবাণুমুক্ত।
• এক রাত ঠান্ডা করে প্রতি কেজিতে ২% হারে গম বীজের স্পন যোগ।
• অন্ধকার কক্ষে ৩০°–৪০° সে., আর্দ্রতা ৮০%—৩–৪ সপ্তাহ।
• মাইসেলিয়ামে ভর্তি হলে ব্যাগের মুখ কেটে ২৮°–৩০° সে., আর্দ্রতা ৯০%–৯৫%—২–৩ দিন।
• ৩ দিন পর জানালা খুলে আলো-বাতাস; আর্দ্রতা ৯০% এর নিচে না।
• ১০–১২ দিনে পিন হেড দেখা যাবে; আর্দ্রতা ৮০%–৮৫% করা যায়।
• ৩০–৪০ দিনে সংগ্রহযোগ্য; পূর্ণ উৎপাদন শেষ হতে প্রায় ৪ মাস।
• সংগ্রহের পর ২–৩ সপ্তাহ পর আরও অন্তত ২টি ফসল পাওয়া যেতে পারে।
✅ মাশরুম সংরক্ষণ
মাশরুমের সংরক্ষণ ক্ষমতা কম। সাধারণত ৮–১০ দিন পর ফসল তোলা যায়।
• পলিথিন মোড়কে ৩০°–৩৫° সে. তাপমাত্রায় ৫–৬ দিন ভালো রাখা যায়।
• পিপি ব্যাগে সিল করে ফ্রিজে কয়েকদিন রাখা যায়।
• ছিদ্রযুক্ত পলিথিনে ভরে কার্ডবোর্ড বাক্সে বাজারে পরিবহন করা যায়।
সংরক্ষণের উপায়
• ঠান্ডা বায়ু শূন্য অবস্থায়
• হিমায়িত
• শুকানো
• ক্যান/টিনজাত
• ১৮%–২০% লবণের দ্রবণে
শুকানোর পদ্ধতি
• ডাটার নিচের অংশ কেটে পরিষ্কার।
• পানি ফুটিয়ে ২% লবণ।
• ৩ মিনিট গরম পানিতে ডুবানো।
• তুলে ট্রেতে ঠান্ডা করা; একটার উপর আরেকটা না।
• ২–৩ দিন রোদে শুকানো।
• পাতার মতো মচমচে হলে পলিথিনে সিল।
• ঠান্ডা জায়গায় রাখা।
👉 সাধারণত ১০০ গ্রাম তাজা মাশরুম থেকে ১০ গ্রাম শুকনো মাশরুম পাওয়া যায়।
👉 ১৮%–২০% লবণের দ্রবণে ১% সাইট্রিক এসিড দিয়ে রাখাও সহজ সংরক্ষণ পদ্ধতি।
✅ মাশরুম দিয়ে রান্না (কিছু জনপ্রিয় প্রণালী)
ক) মাশরুম সবজি
উপকরণ:
১) শুকনো মাশরুম ২০ গ্রাম
২) আলু ১টি (৫০ গ্রাম)
৩) মটরশুটি ১২০ গ্রাম
৪) টমেটো ১৫০ গ্রাম
৫) পেঁয়াজ ১০০ গ্রাম
৬) আদা ১০ গ্রাম
৭) রসুন ২–৩ কোয়া
৮) তেল ১–২ চামচ
৯) লবণ ও মসলা প্রয়োজনমত
রান্না:
• শুকনো মাশরুম গরম পানিতে ১৫–২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন।
• সবজি ধুয়ে কেটে নিন।
• পেঁয়াজ হালকা ভেজে মসলা ভেজে সবজি দিয়ে নাড়ুন।
• সামান্য পানি দিয়ে সিদ্ধ করুন।
• মাশরুম কেটে দিয়ে ২–৩ মিনিট রান্না করে নামান।
খ) মাশরুম বিরিয়ানি
উপকরণ:
চাল ১৫০ গ্রাম, মাশরুম ১০০ গ্রাম, গাজর ৫০ গ্রাম, মটরশুটি ৫০ গ্রাম, ফুলকপি ৫০ গ্রাম, পেঁয়াজ ১০০ গ্রাম, ধনেপাতা ২৫ গ্রাম, রসুন ৫ গ্রাম, আদা ৫ গ্রাম, কাঁচা মরিচ ৫ গ্রাম, টক দই ৫০ গ্রাম, তেল/মাখন ৫০ গ্রাম, লবণ-মসলা-পানি প্রয়োজনমত।
রান্না:
• চাল ধুয়ে মসলা বেটে নিন।
• পেঁয়াজ সোনালী করে ভেজে রাখুন।
• মাশরুম কুচি করে ভেজে নিন; সবজি সেদ্ধ করুন।
• চাল তেলে ভেজে অল্প পানি দিয়ে প্রায় রান্না করুন।
• দই ফেটে ধনে পাতার সাথে মিশিয়ে নিন।
• সবজি+মাশরুম+দই মিশিয়ে দিন।
• শেষে হাঁড়িতে ১০ মিনিট দমে রেখে পরিবেশন করুন।
গ) মাশরুম ফ্রাই
উপকরণ: মাশরুম ১০–১২টি, ডিম ১টি, বেসন ১–২ টেবিল চামচ, লবণ-গোলমরিচ, তেল।
রান্না:
• মাশরুম ধুয়ে পানি ঝরান।
• ডিম+বেসন+মসলা মিশিয়ে ঘন মিশ্রণ বানান।
• ডুবিয়ে গরম তেলে ভেজে পরিবেশন করুন।
ঘ) মাশরুম হালিম
ডাল (মুগ/মসুর/ছোলা) + মাশরুম + পেঁয়াজ-আদা-রসুন-মসলা দিয়ে হালিম/স্যুপ বানানো যায়।
ঙ) চিকেন মাশরুম স্যুপ
মুরগির স্টক+মাশরুম+পেঁয়াজ+কর্নফ্লাওয়ার দিয়ে স্যুপ তৈরি করা যায়।
চ) মাশরুম চিংড়ি
চিংড়ি ভেজে নিয়ে মাশরুম দিয়ে ৫–৭ মিনিট নেড়ে নামান।
ছ) মাশরুম স্যান্ডউইচ
মাশরুম স্লাইস করে বাটার/কর্ন অয়েলে পেঁয়াজ-লবণ দিয়ে ভেজে পাউরুটির মাঝে স্প্রেড করে পরিবেশন।
জ) মাশরুম ওমলেট
মাশরুম হালকা ভেজে ডিম+দুধ মিশিয়ে ওমলেট বানান। কোলেস্টেরল সমস্যা থাকলে কুসুম বাদ দিয়ে করতে পারেন।
✅ মাশরুমের আচার
• ধুয়ে মসলা দিয়ে তেলে ভেজে শুকনো করুন।
• ঠান্ডা করে লবণ ও ভিনেগার দিন।
• ঠান্ডা তেলে বোতলে ভরে সংরক্ষণ করুন (বোতল আগে সিদ্ধ করে নিন)।
✅ মাশরুম প্রাপ্তিস্থান (উৎপাদন/বিক্রি/ট্রেনিং/গবেষণা)
• সিরাজ ভেজিটেবলস, গুলশান-১। ফোন: ৮৮৫৬৪৯৩
• লোকমান ভেজিটেবলস, গুলশান-১। মোবাইল: ০১৭১০-৯৫৮৩১১
• কনজুমার শপিং মল, কাজীপাড়া বাস স্ট্যান্ড
• ওশান শপিং মল, মিরপুর-১৩। ফোন: ৯০১৬০৩৯
• সিটি শপিং মল, মিরপুর-১০। ফোন: ৯০০৫৭৯০
• মাসলিন বুটিক, বনানী। ফোন: ৮৮১৬২০১
• তয়বা ফার্মেসী, শেওড়াপাড়া। ফোন: ৮০২৩১০৬
• কাজী সুপার স্টোর, মিরপুর-১০। ফোন: ৯০০১২৫২
• এস ডি হোমিওপ্যাথিক ফার্মেসী, মিরপুর-১৩। মোবাইল: ০১৭১১-৮১৬৬০৪
• খামারবাড়ি, ফার্মগেট। মোবাইল: ০১৭১৯-৬৪২৬৫৬
• এম এম ইন্টারন্যাশনাল, মধুমিতা রোড, টঙ্গী। মোবাইল: ০১৭১৩-৫৩৯৮০৬
✅ আয়-ব্যয় হিসাব
(ক) পারিবারিক পর্যায়ে ঝিনুক মাশরুম উৎপাদনের আয়-ব্যয়
কাঁচামাল/উপকরণ — পরিমাণ — ব্যয় (টাকা)
ক) ধানের খড় — ২৫০০ কেজি — ১৮৭৫.০০
খ) স্পন — ৩৬৫ কেজি — ৪৩৮০.০০
গ) পলিথিন ব্যাগ — ৪০ কেজি — ৩০০০.০০
ঘ) পিপি ব্যাগ — ২৫ কেজি — ১৭৫০.০০
ঙ) সুতার বল — ৫টি — ১০০.০০
চ) ফরমালডিহাইড — ৫টি — ২৫০.০০
ছ) ব্যাভিস্টিন — ০.২৫ গ্রাম — ২৫০.০০
জ) ব্লিচিং পাউডার — ৫ কেজি — ১০০.০০
ঝ) বিবিধ ব্যয় (মোট খরচের ১০%) — — ১১৭০.০০
মোট (উপকরণ) = ১২,৮৭৫.০০
২) শ্রমিক ব্যয় (৯০ দিন) = ৬৩০০.০০
৩) চাষ ঘর নির্মাণ = ৫০০০.০০
৪) স্প্রেয়ার ড্রাম, ট্রে ইত্যাদি = ২০০০.০০
✅ মোট ব্যয় = ২৬,১৭৫.০০ টাকা
মোট আয়: উৎপাদন ১২৫০ কেজি; বাতিল ১২৫ কেজি (১০%)
নীট উৎপাদন = ১১২৫ কেজি
প্রতি কেজি ১০০ টাকা হলে আয় = ১১২৫×১০০ = ১,১২,৫০০ টাকা
✅ মোট লাভ = ১,১২,৫০০ – ২৬,১৭৫ = ৮৬,৩২৫ টাকা
(খ) সীমিত পর্যায়ে দুধ মাশরুম উৎপাদনের আয়-ব্যয়
কাঁচামাল/উপকরণ — পরিমাণ — ব্যয় (টাকা)
ক) ধানের খড় — ২৫০০ কেজি — ১৮৭৫.০০
খ) স্পন — ৩৬৫ কেজি — ৭০০০.০০
গ) পলিথিন ব্যাগ — ৪০ কেজি — ৩০০০.০০
ঘ) পিপি ব্যাগ — ২৫ কেজি — ১৭৫০.০০
ঙ) সুতার বল — ৫টি — ১০০.০০
চ) ফরমালডিহাইড — ৫ লিটার — ২৫০.০০
ছ) ব্যাভিস্টিন — ০.২৫ গ্রাম — ২৫০.০০
জ) ম্যালাথিয়ন — ৫ লিটার — ২৫০.০০
ঝ) ব্লিচিং পাউডার — ৫ কেজি — ১০০.০০
ঞ) বিবিধ ব্যয় (মোট খরচের ১০%) — — ১২০০.০০
মোট (উপকরণ) = ১৫,৭৭৫.০০
২) শ্রমিক ব্যয় (৯০ দিন) = ৬৩০০.০০
৩) চাষ ঘর নির্মাণ = ৫০০০.০০
৪) স্প্রেয়ার ড্রাম, ট্রে ইত্যাদি = ২০০০.০০
✅ মোট ব্যয় = ২৯,০৭৫.০০ টাকা
মোট আয়: নীট উৎপাদন ১১২৫ কেজি
প্রতি কেজি ৬০ টাকা হলে আয় = ১১২৫×৬০ = ৬৭,৫০০ টাকা
✅ মোট লাভ = ৬৭,৫০০ – ২৯,০৭৫ = ৩৮,৪২৫ টাকা
✅ তথ্যসূত্র
১) মাশরুম উৎপাদন প্রযুক্তি, এ. বি. সিদ্দিকী (পিএইচডি), জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী
২) Integrated Horticulture & Nutrition উন্নয়ন প্রকল্প, জানুয়ারি-২০০৬
৩) সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, জানুয়ারি-২০০৬
৪) দারিদ্র বিমোচনে মাশরুম চাষ, কৃষিকথা, ৬৬তম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, আশ্বিন-১৪১৩
৫) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-২০০৬, পৃষ্ঠা ১৬৪–১৬৬
৬) পুষ্টিকর সবজি মাশরুম, কৃষি তথ্য সার্ভিস শক্তিশালীকরণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প
৭) খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, সেপ্টেম্বর-২০০৬
৮) মাশরুম সেন্টার উন্নয়ন প্রকল্প, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা
৯) মান্না মাশরুমি, মিরপুর-১৩, ঢাকা-১২১৬
১০) মাশরুমের বীজ বানানোর কৌশল, দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুলাই-২০০৬
১১) স্ট্র মাশরুমের চাষ, দৈনিক প্রথম আলো, ক্ষেত-খামার পাতা










0 comments:
মন্তব্য করুন