Showing posts with label ফল. Show all posts
Showing posts with label ফল. Show all posts

প্যাসন ফলের চাষ

ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ও ফিলিপাইনের জনপ্রিয় প্যাসন ফলের চাষ হচ্ছে এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ রহিম বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় এ নতুন ফলের চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। প্রাকৃতিক গুণসম্পন্ন এ ফলের শরবত খেলে মানুষের শরীরের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল কমার পাশাপাশি ক্লান্তিও দূর হয়। চর্মরোগ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। প্যাসন ফল একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ। সচরাচর দুই ধরনের প্যাসন ফল দেখা যায়। হলুদ প্যাসন ফল ও লাল-বেগুনি প্যাসন ফল। বাংলাদেশের দুর্গম পাহাড়ি ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাসহ সারা দেশে হলুদ প্যাসন ফল চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। গাইবান্ধা, মাগুরা ও পঞ্চগড় জেলায় কিছুসংখ্যক শৌখিন ফল চাষি অল্প পরিসরে প্যাসন ফলের চাষ করছেন। তারা চারা তৈরি করেও বিক্রি করছেন। এ ফলটি এরই মধ্যে একটি লাভজনক ফল হিসেবে দেশে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলটি গোলাকার থেকে ডিম্বাকৃতি। আকার লম্বায় ৪ থেকে ৭ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার। পাল্প ও জুসের রঙ হলুদ এবং মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ ১০ থেকে ১৪ শতাংশ। বছরে দুবার প্যাসন ফল পাওয়া যায়। প্রথমবার মার্চ মাসে ফুল আসে এবং জুলাই-আগস্টে ফল পাওয়া যায়। দ্বিতীয়বার জুলাই-আগস্টে ফুল আসে এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ফল পাওয়া যায়। গাছ লাগানোর ১৪ থেকে ২০ মাসের মধ্যেই ফল ধরে। ১৮ থেকে ২০ মাস বয়সের একটি গাছ থেকে ১০০ থেকে ২০০ সংখ্যক ফল পাওয়া যায়; যার ওজন ৫ থেকে ৮ কেজি। প্যাসন ফলের চাষ পদ্ধতি বেশ সহজ। লাউ, কুমড়া, শিম ও ধুন্দল জাতীয় গাছের মতো মাটিতে চারা লাগানোর পর তা বড় হলে বাঁশের মাচা অথবা অন্য গাছে উঠিয়ে দিতে হয়।


ব্যবহার : প্যাসন ফল ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ একটি ফল। এ ফলের বীজকে আবৃত করে থাকা হলুদ রঙের জিলাটিনাস সুগন্ধিযুক্ত পাল্পকে পানিতে দ্রবীভূত করে খুব উপাদেয় শরবত প্রস্তুত করা যায়। এটিকে অন্যান্য ফলের রসের সঙ্গে মিশ্রিত করেও খাওয়া যায়। পাল্পকে প্রক্রিয়াজাত করে আইসক্রিম, জুস, স্কোয়াস, জ্যাম ও জেলি প্রস্তুত করা যায়; যা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। বীজ ও খোসা থেকে পেকটিন এবং উচ্চমাত্রার লিনোলিক এসিডসমৃদ্ধ তেল আহরণ করা সম্ভব। ফল হিসেবেও টাটকা প্যাসন ফল ভক্ষণ করা যায়।

জাত : পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র খাগড়াছড়ির বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গবেষণা করে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হলুদ প্যাসন ফলের একটি জাত উদ্ভাবন করেন। জাতটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বারি প্যাসন ফল-১ নামে ২০১৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করে। বারি প্যাসন ফল-১ এর আকার ৬.৮ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ৬.৩ সেন্টিমিটার। ফলের গড় ওজন ৬৮ গ্রাম এবং প্রতিটি ফল থেকে ৩০ গ্রাম রস আহরণ করা যায়। জুসের রঙ হলুদ এবং টিএসএসর মান ১৪ ভাগ।


আবহাওয়া : প্যাসন ফল গ্রীষ্ম ও অগ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। বছরে ১২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতযুক্ত স্থান প্যাসন ফল চাষের জন্য উপযোগী। এ ফল চাষের উপযুক্ত তাপমাত্রা হলো ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে হলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ও ফুল আসা বাধাগ্রস্ত হয়।

বংশ বিস্তার : সাধারণত বীজ ও শাখা কলমের মাধ্যমে প্যাসন ফলের বংশ বিস্তার করা হয়।

মাটি : ৫.৫ থেকে ৭.৫ অমস্নতাযুক্ত উর্বর সুনিষ্কাশিত বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ মাটি প্যাসন ফল চারে জন্য উপযোগী।
ক. বীজ দ্বারা : পাল্প থেকে বীজ আলাদা করে পানি দিয়ে ধুয়ে ছায়ায় শুকিয়ে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজ সংরক্ষণ করা যায়। তাই এ সময়ের মধ্যে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার দূরত্বের ১.৫ সেন্টিমিটার গভীরতায় বীজ বপন করে খড় দ্বারা ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ২ থেকে ৩ পাতাবিশিষ্ট চারা উৎপন্ন হলে বীজতলা থেকে চারা তুলে মাটি ও জৈব সারমিশ্রিত পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। পলিব্যাগে ৩ থেকে ৪ মাস থাকার পর ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে চারাগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে মূল জমিতে রোপণ করতে হবে।
খ. শাখা কলম দ্বারা : শাখা কলমের দ্বারাও প্যাসন ফলের বংশ বিস্তার করা যায়। শাখা কলমের মাধ্যমে চারা তৈরির উপযুক্ত সময় আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। এ সময় পেন্সিল আকৃতির ৩ থেকে ৪ পর্ববিশিষ্ট শাখা থেকে কলম তৈরি করা যায়। নির্বাচিত শাখার নিচের পর্ব থেকে ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার নিচে তেরসা করে কেটে নিচের পর্বসহ বীজতলার মাটিতে ৪৫ ডিগ্রি কোণ করে পুঁতে শাখা কলম তৈরি করা যায়। শাখা কলম রোপণের সময় এক থেকে দুটি পাতা রেখে বাকি পাতা কেটে দিতে হবে। শাখা কলমে শিকড় ও পাতা গজানোর পর চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হয়।

গর্ত তৈরি : চারা রোপণের জন্য গর্তের আকার হবে ৪৫ সেন্টিমিটার দ্ধ ৪৫ সেন্টিমিটার দ্ধ ৪৫ সেন্টিমিটার। গর্তের ওপরের ২০ সেন্টিমিটার মাটি আলাদা করে রেখে তার সঙ্গে ১০ কেজি গোবর বা পচা আবর্জনা সার, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২০০ গ্রাম এমওপি, মিশ্রিত করে ওপরের মাটি গর্তের নিচে এবং নিচের মাটি ওপরে দিয়ে গর্ত ভরাট করে ৮ থেকে ১০ দিন রেখে দিতে হবে।

চারা রোপণ : বীজের চারা বা শাখা কলম বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস সময়ের মধ্যে রোপণ করতে হবে। চারা ৩ মিটার ী ৬ মিটার দূরত্বে রোপণ করতে হবে।

মাচা তৈরি : প্যাসন ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য মাচা তৈরি করার প্রয়োজন হয়। চারার গোড়ায় খুঁটি পুঁতে গাছ উঠিয়ে দিতে হয়। গাছ মাটির ওপর উঠলে গাছের অগ্রভাগ কেটে দেয়া হয়, যাতে শাখা বের হয় এবং সব মাচায় ছড়িয়ে পড়ে। মাটি থেকে মাচা পর্যন্ত গাছের কান্ডে কোনো শাখা বের হলে তা কেটে দিতে হবে। পুরনো ও মরা ডাল কেটে দেয়া উচিত। এতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম হয়। বাড়ির আশপাশে মাচা তৈরি করে বা বড় ফলের গাছে ও সবজির বেড়ায় উঠিয়ে দেয়া হয়।

সার প্রয়োগ : প্যাসন ফল গাছের বৃদ্ধি ও ফলের জন্য সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা উচিত। এক থেকে তিন বছর বয়সের গাছে প্রতি বছর ১০ কেজি পচা গোবর, ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০০ গ্রাম টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি, ৪ থেকে ৬ বছর বয়স্ক গাছে প্রতি বছর ১২ কেজি গোবর, ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০০ গ্রাম এমওপি সার এবং ৭ বা তার চেয়ে বেশি বয়স্ক গাছে প্রতি বছর ১৫ কেজি গোবর, ১ হাজার ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৮০০ গ্রাম টিএসপি ও ১ হাজার ৪০০ গ্রাম এমওপি সার ফুল ও ফল আসার সময়সহ ৩ থেকে ৪ কিস্তিতে গাছের গোড়ার মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ প্রয়োগ : চারা রোপণের পর ঝরনা দ্বারা বেশ কিছু দিন পর্যন্ত সেচ দিতে হবে। সর্বোচ্চ ফলনের জন্য ফুল আসা ও ফলের বিকাশের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকতে হবে। এজন্য খরা মৌসুমে প্যাসন ফলের গাছে সেচ দিতে হবে এবং বর্ষাকালে প্যাসন গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে, সেজন্য পানি নিকাশের সুব্যবস্থা করতে হবে।

আগাছা দমন : গাছের গোড়া সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

পররাগায়ন : মৌমাছি ও বোলতা দ্বারা প্যাসন ফুল পরপরাগায়িত হয়। হলুদ প্যাসন ফুল দুপুরে উন্মোচিত হয় এবং সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়। পরপরাগায়নের ফলে উৎপাদিত ফলের ওজন, রসের পরিমাণ ও বীজের সংখ্যা বেশি থাকে। হস্ত পরাগায়নে বেশি ফলন পাওয়া যায়।

ফলধারণ : পরাগায়নের পরপরই ফলধারণ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরাগায়নের ২০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে ফলের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হয়। তাছাড়া তাপমাত্রা বেশি থাকলেও ফলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

রোগ ও পোকা দমন : হলুদ প্যাসন ফলে তেমন কোনো রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা যায় না। তবে রোগের মধ্যে বাদামি দাগ রোগ, গোড়া পচা রোগ ও পোকার মধ্যে ফলের মাছি, মাকড় এবং মিলিবাগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এক ধরনের ছত্রাক দ্বারা প্যাসন ফল গাছে বাদামি দাগ রোগ দেখা দেয়। এ রোগের আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রোভারাল মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ৩ থেকে ৪ বার স্প্রে করতে হবে। তবে মিলিবাগ, মাকড়সা ও ফলের মাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী মাছি পোকা আধা পাকা ফলের গায়ে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার ছিদ্রের জায়গায় ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে ফল পচিয়ে ফেলে।

প্রতিকার : আক্রান্ত ঝরা ফল কুড়িয়ে ধক্ষংস করতে হবে। সেঙ্ ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। ফল মার্বেলের আকার হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি ম্যালাথিয়ন বা সুমিথিয়ন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে ।

ফল সংগ্রহ : ফল সম্পূর্ণ হলুদ হলে গাছ থেকে হাত দিয়ে প্যাসন ফল সংগ্রহ করতে হবে।

ফল সংরক্ষণ : প্যাসন ফল সংগ্রহের পর কয়েকদিন রেখে দিলে চামড়া কুঁচকে যায় এবং সুগন্ধ কিছুটা নষ্ট হয়। অন্যদিকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় প্যাসন ফল খুব সহজেই ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়।

টবে মিশরীয় ডুমুর চাষ

আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রস্থ কোরান মজিদে ডুমুর নিয়ে একটি সূরা আছে। সূরাটির নাম আততীন । সূরার প্রথম আয়াতেই আল্লাহ তাআলা বলেন, “শপথ তীন ও যায়তুনের

ডুমুরকে আরবীতে তীন  বলা হয়। কাজেই ডুমুর ফলের গুরুত্ব সহজেই অনুমান করা যায়। ডুমুর একটি অতি উপাদেয় ফল। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে যে ডুমুর দেখা যায় তার ফল ছোট এবং খাওয়ার অনুপযুক্ত। সাধারণত এই ফল পাখিরা খেয়ে থাকে। কোন কোন জায়গায় এটি তরকারী হিসাবে সীমিত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ডুমুর মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ফল। যদিও বর্তমানে সারা বিশ্বেই এর প্রসার ঘটেছে। বিশ্বজুড়ে ফল হিসেবে যে ডুমুর সমাদৃত তা খাওয়ার উপযুক্ত। ফল নরম ও মিষ্টি।


মিষ্টি ডুমুরের চাষ পদ্ধতিঃ
ছাদে মিষ্টি ডুমুরের চারা লাগানোর জন্য ১২-২০ ইঞ্চি মাটির টব বা কালার ড্রাম সংগ্রহ করতে হবে। ড্রামের তলায় ৩-৫ টি ছিদ্র করে নিতে হবে। যাতে গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে। টব বা ড্রামের তলার ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। টব বা ড্রামের গাছটিকে ছাদের  এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে সবসময় রোদ থাকে। এবার ২ ভাগ বেলে দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ২০-৪০ গ্রাম টিএসপি সার, ২০-৪০ গ্রাম পটাশ সার,এবং ২০০ গ্রাম হাড়ের গুড়া একত্রে মিশিয়ে ড্রাম বা টবে পানি দিয়ে রেখে দিতে হবে ১০-১২ দিন । অতঃপর মাটি কিছুটা খুচিয়ে দিয়ে আবার ৪-৫ দিন একইভাবে রেখে দিতে হবে । মাটি যখন ঝুরঝুরে হবে তখন একটি সবল সুস্থ মিশরীয় মিষ্টি ডুমুরের কাটিং চারা উক্ত টব বা ড্রামে রোপন করতে হবে । চারা গাছটিকে সোজা করে লাগাতে হবে । সেই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উচু করে দিতে হবে এবং মাটি হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে । যাতে গাছের গোড়া দিয়ে বেশী পানি না ঢুকতে পারে । একটি সোজা কাঠি দিয়ে গাছটিকে বেধে দিতে হবে । চারা লাগানোর পর প্রথমদিকে পানি কম দিতে হবে । আস্তে আস্তে পানি বাড়াতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে আবার বেশী শুকিয়েও না যায়।



অন্যান্য পরিচর্যাঃ
ডুমুর গাছ অত্যান্ত তাড়াতাড়ি ফল দেয় । একটি ডুমুরের কাটিং চারা লাগানোর ৪/৫ মাস পর থেকেই ফল দিতে শুরু করে । তাই গাছ লাগানোর ২-৩ মাস পর থেকেই টবের গাছকে নিয়মিত অল্প অল্প খাবার দেয়া প্রয়োজন। সে মোতাবেক ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর সরিষার খৈল পঁচা পানি প্রয়োগ করতে হবে। সরিষার খৈল গাছে দেয়ার কমপক্ষে ১০ দিন পূর্বে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর সেই পচা খৈলের পানি পাতলা করে গাছের গোড়ায় দিতে হবে। ১ বছর পর টবের আংশিক মাটি পরিবর্তন করে দিতে হবে। ২ ইঞ্চি প্রস্থে এবং ৬ ইঞ্চি গভীরে শিকরসহ মাটি ফেলে দিয়ে নতুন সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে তা ভরে দিতে হবে। মাটি পরিবর্তনের এই কাজটি সাধারণতঃ বর্ষার শেষ এবং শীতের আগে করলেই ভাল হয়। ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর টব বা ড্রামের মাটি কিছুটা খুঁচিয়ে দিতে হবে ।

ফলের ব্যবহারঃ
ডুমুর ফলের উপরের আবরণ খুব পাতলা ও নরম । খেতে খুবই সুস্বাদু ও মিষ্টি । পাকা ফল আবরণ সহ সরাসরি খাওয়া যায়। তাছাড়াও পাকা ডুমুর দিয়ে জ্যাম, জ্যালি, চাটনি ইত্যাদি তৈরি করে খাওয়া যায়। পাকা ডুমুর শুকিয়ে বিভিন্ন রকমের খাবারের উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা যায় । কাঁচা ডুমুর তরকারী হিসেবে খাওয়া যায়। কার্বোহাইড্রেট, সুগার, ফ্যাট, প্রোটিন, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ছাড়াও বিভিন্ন পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ডুমুর। পুষ্টিগুণের পাশাপাশি ডুমুরের অনেক ঔষধী গুণও রয়েছে ।

পুষ্টিগুণ:


  • পাকস্থলীর জন্য ডুমুর বেশ উপকারী। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যআঁশ।
  • ডুমুর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে সাহায্য করে।
  • ডুমুর শরীরে এসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। শরীরে পিএইচের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
  • ডুমুর পাতা ডায়াবেটিক রোগীদের ইনসুলিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালের নাশতার সঙ্গে ডুমুরের পাতার রস খেলে উপকার পাবেন।
  • যাদের দুধ ও দুধের তৈরি খাবারে অ্যালার্জি আছে তাঁরা ক্যালসিয়ামের ঘাটতির পূরণের জন্য নিয়মিত ডুমুর খান। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম।
  • প্রতিদিন ডুমুর সেবন কারলে শুক্রানু বৃদ্ধি ও যৌন শক্তি বৃদ্ধি পায়।
  • ডুমুর ফল টিউমার ও অন্যান্য অস্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি নিবারণে ব্যবহৃত হয়। পাতা চূর্ণ, বহুমূত্র, বৃক্ক ও যকৃতের পাথর নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।
  • কাঁচা ডুমুর চর্মরোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ডুমুর থেঁতো করে ব্রণ ও মেছতায় নিয়মিত লাগালে তা সেরে যায়।
  • গবেষণায় দেখা যায়, ডুমুরের পাতা কোলেস্টেরল ট্রাইগি্লসারাইডস কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া টেস্টটিউব গবেষণায় দেখা গেছে, ডুমুরের পাতা নির্দিষ্ট ধরনের ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি কমিয়ে দিতে সক্ষম।


ডুমুরের বংশবিস্তারঃ
ডুমুরের বংশবিস্তার করার অনেক পদ্ধতি থাকলেও সবচেয়ে সহজ ও ভাল পদ্ধতি হল কাটিং । কাটিং পদ্ধতিতে বংশবিস্তারে শতকরা প্রায় ৯৮% চারাই টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে । কাটিং করার এক মাসের মধ্যেই চারা মূল টবে লাগানোর উপযুক্ত হয়। টবে কাটিং লাগানোর ৪-৫ মাসের মধ্যেই ডুমুর ফল পাওয়া যায়।


ক্যাপসিকাম একটি পুষ্টিকর সবজি

ক্যাপসিকাম বা মিষ্টি মরিচ বেগুন পরিবারের। একটি গুরুত্বপূর্ণ সবজি। দক্ষিণ আমেরিকার
নিরক্ষীয় অঞ্চল মরিচের উৎপত্তি স্থল। ধারণা করা হয়, ব্রাজিল মিষ্টি মরিচের
উৎপত্তিস্থান। বিশ্বে আবাদকৃত সব মরিচই একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত যার
মধ্যে ১১টি গ্রুপ রয়েছে এবং ঝালবিহীন ও ঝাল মরিচ হিসেবে বিভক্ত করা হয়েছে।
মিষ্টি মরিচের ফলের আকার ও আকৃতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে, তবে সাধারণত ফল
গোলাকার ও ত্বক পুরু হয়। মিষ্টি মরিচ আমাদের দেশীয় প্রচলিত সবজি না হলেও
অতি সম্প্রতি এর চাষ এ দেশে প্রসারিত হচ্ছে বিশেষ করে বড় বড় শহরের আশপাশে
সীমিত পরিসরে কৃষকরা এর চাষ করে থাকে, যা অভিজাত হোটেল ও বিভিন্ন সুপার
মার্কেটে বিক্রি হয়ে থাকে। মিষ্টি মরিচের রপ্তানি সম্ভাবনাও প্রচুর।
বিশ্বে অনেক দেশেই মিষ্টি মরিচ একটি জনপ্রিয় সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে
আসছে। বিশ্বে টমেটোর পরে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সবজি হচ্ছে মিষ্টি মরিচ। এর
বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে যেমন পাতা সালাদ অথবা স্যুপ তৈরিতে ব্যবহার হয়,
কাঁচা ফল সালাত এবং রান্না করে সবজি হিসেবে অতি সুস্বাদু খাদ্য।
পুষ্টিমানের দিক থেকে মিষ্টি মরিচ একটি অত্যন্ত মূল্যবান সবজি। প্রচুর
পরিমাণে ভিটামিন সি থাকার কারণে এবং টবে চাষের উপযোগী বলে দেশের
জনসাধারণকে মিষ্টি মরিচ খাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।  



উৎপাদন কলাকৌশল
জলবায়ু ও মাটি 

ক্যাপসিকাম
উৎপাদনের জন্য ১৬০-২৫০সে. তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। রাতের
তাপমাত্রা ১৬০- ২১০সে. এর কম বা বেশি হলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ঝরে
পড়ে, ফলন ও মান কমে যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে একেবারেই ফলন হয় না। অক্টোবর
মাসে বীজ বপন করে নভেম্বরে চারা রোপণ করলে দেখা যায় যে, নভেম্বরের শেষ
সপ্তাহ থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণে গাছের
দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এ জন্য গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পলিথিন
ছাউনি, পলি হাউস, পলিভিনাইল হাউসে গাছ লাগালে রাতে ভিতরের তাপমাত্রা বাইরে
অপেক্ষা বেশি থাকে। উন্নত বিশ্বে যেমন- জাপান, আমেরিকা, বৃটেন,
নেদারল্যান্ড, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশে গ্রিন হাউস গ্লাস হাউস, পলি হাউস
ইত্যাদির মাধ্যমে তাপমাত্রা ও আলো নিয়ন্ত্রণ করে বছরব্যাপী লাভজনকভাবে
ক্যাপসিকাম চাষ করছে। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও একই পদ্ধতি
গ্রহণ করে প্রচুর ক্যাপসিকামের চাষ হচ্ছে।  ফুল এবং ফল ধারণ দিবস দৈর্ঘ্য
দ্বারা প্রভাবিত হয় না। কিন্তু আলোক তীব্রতা এবং আর্দ্রতা ফল ধারণে প্রভাব
ফেলে। সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি মিষ্টি মরিচ চাষের  জন্য
উত্তম। মিষ্টি মরিচ খরা এবং জলাবদ্ধতা কোনোটিই সহ্য করতে পারে না। মিষ্টি
মরিচের জন্য মাটির অম্ল ক্ষারত্ব ৫.৫-৭.০ এর মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়।  


জাত 
আমাদের
দেশে আবাদকৃত জাতগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে- California Wonder, Tender
bell (f1)এবং Yolow wonder ইত্যাদি । প্রতি বছর এগুলোর বীজ আমদানি করতে
হয়। তবে আমাদের দেশে Clifornia Wonder এর বীজ উৎপাদন করার যথেষ্ট সম্ভাবনা
রয়েছে।

জীবন কাল : জাত ও মৌসুমভেদে মিষ্টি মরিচের জীবনকাল ১২০ থেকে ১৪০ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বীজ বপনের সময় : অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস।

বীজের মাত্রা : প্রতি হেক্টরে ৩০ হাজার চারার জন্য প্রায় ২৩০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয় ।

চারা উৎপাদন 
প্রথমে
বীজগুলো ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। সুনিষ্কাশিত উঁচু বীজতলায় মাটি
মিহি করে ১০x২ সে.মি. দূরে দূরে বীজ বপন করে হালকাভাবে মাটি দিয়ে ঢেকে
দিতে হবে। বীজতলায় প্রয়োজনানুসারে ঝাঝরি দিয়ে  হালকাভাবে সেচ দিতে হবে।
বীজ গজাতে ৩-৪ দিন সময় লাগে। বীজ বপনের ৭-১০দিন পর চারা ৩-৪ পাতা বিশিষ্ট
হলে ৯x১২ সে.মি. আকারের পলি ব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। পটিং  মিডিয়াতে
৩:১:১ অনুপাতে যথাক্রমে মাটি,  কম্পোস্ট এবং বালি মিশাতে হবে। পরে
পলিব্যাগ ছায়াযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করতে হবে, যাতে প্রখর সূর্যালোকে
এবং ঝড় বৃষ্টি আঘাত হানতে না পারে। উল্লেখ্য যে, অক্টোবর মাস হচ্ছে বীজ
বপনের উত্তম সময়।

জমি তৈরি, সার প্রয়োগ ও চারা রোপণ

ভালো
ভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে যাতে জমিতে বড় বড় ঢিলা এবং আগাছা না
থাকে। মিষ্টি মরিচ চাষে প্রতি শতাংশে গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি
১.৪ কেজি, এমপি ১ কেজি, জিপসাম ৪৫০  গ্রাম এবং জিংক অক্সাইড ২০ গ্রাম
প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির সময় অর্ধেক গোবর সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি
অর্ধেক গোবর, টিএসপি, জিংক অক্সাইড, জিপসাম, ১/৩ ভাগ এমপি এবং ১/৩ ভাগ
ইউরিয়া চারা রোপণের গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ২/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং এমপি
পরবর্তীতে দুই ভাগ করে চারা লাগানোর যথাক্রমে ২৫ এবং ৫০ দিন পর প্রয়োগ
করতে হবে। চারার রোপণ দূরত্ব জাতভেদে ভিন্নতর হয়। সাধারণত ৩০ দিন বয়সের
চারা ৪৫x৪৫ সে. মি. দূরত্বে রোপণ করা হয়। মাঠে চারা লাগানোর জন্য বেড তৈরি
করতে হবে। প্রতিটি বেড প্রস্থে ৭৫ সে. মি. হতে হবে এবং লম্বায় দুটি সারিতে
২০টি চারা সংকোলনের জন্য ৯ মিটার বেড হবে। দু’টি সারির মাঝখানে ৩০ সে. মি.
ড্রেন করতে হবে। চারা পড়ন্ত বিকেলে রোপণ করা উত্তম । চারা রোপণের পর গাছের
গোড়ায় পানি দিতে হবে। প্রতিদিন মাঠ পরিদর্শন করতে হবে। যদি কোনো চারা
মারা  যায় তাহলে ওই জায়গায় পুনরায় চারা রোপণ করতে হবে। নভেম্বরের শেষ
সপ্তাহ হতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায়
এ সময়  গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় । কাজেই গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির
জন্য পলিথিন ছাউনিতে গাছ লাগালে রাতে ভেতরের তাপমাত্রা বাইর অপেক্ষা বেশি
থাকে এবং গাছের দৈহিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়।

অন্যান্য পরিচর্যা মিষ্টি
মরিচ খরা ও জলাবদ্ধাতা কোনোটিই সহ্য করতে পারে না। জমিতে প্রয়োজন মতো সেচ
দিতে হবে। আবার অতিরিক্ত সেচ দিলে ঢলে পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত
বৃষ্টির ফলে যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সে জন্য সুষ্ঠু নিকাশ ব্যবস্থা
করতে হবে। কোনো কোনো জাতে ফল ধরা অবস্থায় খুঁটি দিতে হয় যাতে গাছ ফলের
ভারে হেলে না পড়ে। আগাছানাশক বা হাত দিয়ে অথবা নিড়ানি দিয়ে প্রয়োজনীয়
আগাছা দমন করতে হবে।

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
জাবপোকা (এফিড)

ক্ষতির লক্ষণ :
 প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক জাবপোকা দলবদ্ধভাবে গাছের পাতার রস চুষে খায়।
ফলে পাতা বিকৃত হয়ে যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও প্রায়শ নিচের দিকে কোঁকড়ানো
দেখা যায়। জাবপোকার শরীরের পেছন দিকে অবস্থিত দু’টি নল দিয়ে মধুর মতো এক
প্রকার রস নিসরণ করে। এই রস পাতা ও কাণ্ডে আটকে গেলে তাতে সুঁটিমোল্ড নামক
এক প্রকার কালো রঙের ছত্রাক জন্মায় এবং তার ফলে গাছের সবুজ অংশ ঢেকে যায়
এবং সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন এবং ঠাণ্ডা
আবহাওয়ায় এর বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়। প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে এর সংখ্যা কমে
যায়।


দমন ব্যবস্থা : প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাবপোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা
যায়। নিম বীজের দ্রবণ (১ কেজি পরিমাণ অর্ধভাঙ্গা নিমবীজ ১০ লিটার পানিতে
১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) বা সাবান গোলা পানি (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২
চা চামচ গুঁড়া সাবান মেশাতে হবে) সেপ্র করেও এ পোকার  আক্রমণ অনেকাংশে
কমানো যায়। লেডি বার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ ও কীড়া এবং সিরফিড্ ফ্লাই এর
কীড়া জাবপোকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে দমন করে। সুতরাং উপরোক্ত বন্ধু পোকা
সংরক্ষণ করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে
শুধু আক্রান- স্থানসমূহে কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে
স্বল্পমেয়াদি বিষক্রিয়া সম্পন্ন কীটনাশক, যেমন- ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি প্রতি
লিটার পানিতে ২ মি. লি. হারে অথবা পিরিমর ৫০ ডিপি প্রতি লিটার পানিতে ১
গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। মৌমাছি বা পরাগায়নে সাহায্যকারী
পোকাদের জন্য অনেকটা নিরাপদ। বিষ প্রয়োগের এক সপ্তাহের মধ্যে খাওয়ার জন্য
কোনো ফল সংগ্রহ করা যাবে না।

থ্রিপস পোকা
ক্ষতির লক্ষণ :
পূর্ণাঙ্গ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক থ্রিপস পাতা থেকে রস চুষে খায়। পাতার
মধ্যশিরার নিকটবর্তী এলাকা বাদামি রঙ ধারণ করে ও শুকিয়ে যায়। নৌকার খোলের
পাতা ওপরের দিকে কুঁকড়িয়ে যায়। গাঢ় বাদামি রঙের পূর্ণাঙ্গ থ্রিপস পোকা
খুবই ছোট, সরু ও লম্বাকৃতির। খালি চোখে কোনোমতে এদের দেখা যায়।

দমন ব্যবস্থা : পাঁচ গ্রাম পরিমাণ গুঁড়া সাবান প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতার নিচের
দিকে স্প্রে করা। ক্ষেতে সাদা রঙের ৩০ সে.মি. ঢ ৩০ সে.মি. আকারের বোর্ডে
পাতলা করে গ্রিজ বা আঠা লাগিয়ে কাঠির সাহায্যে ৩ মিটার দূরে দূরে আঠা ফাঁদ
পেতে থ্রিপস পোকা আকৃষ্ট করে মারা। এক কেজি আধা ভাঙা নিমবীজ ১০ লিটার
পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি স্প্রে করা। আক্রমণের হার অত্যন্ত
বেশি হলে ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি জাতীয় কীটনাশক (প্রতি লিটার পানিতে ২ মি. লি.
পরিমাণ) স্প্রে করা।

লালমাকড় (মাইট)
ক্ষতির লক্ষণ
 :
লালমাকড় খাওয়া পাতায় হলুদাভ ছোপ ছোপ দাগের সৃষ্টি হয়। যখন এই ধরনের আক্রমণ
পাতার নিচে দিকে মাঝখানে বেশি হয় তখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই পাতা কুঁকড়িয়ে
যেতে দেখা যায়। ব্যাপক আক্রমণের ফলে সম্পূর্ণ পাতা হলুদ ও বাদামি রঙ ধারণ
করে এবং শেষ পর্যন্ত পাতা ঝরে পড়ে। লালমাকড় পাতার নিচের পৃষ্ঠদেশে অত্যন্ত
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডিম পাড়ে যা খালি চোখে দেখা যায় না। এই ডিম থেকে কমলা
রঙের বাচ্চা বের হয়ে বেগুন পাতার নিচের পৃষ্ঠদেশ খেতে থাকে। এক সপ্তাহের
মধ্যেই বাচ্চাগুলো গাঢ়-কমলা বা লাল রঙের পূর্ণ মাকড়ে পরিণত হয় যারা দেখতে
ক্ষুদ্র মাকড়সার মতো। এদের পাতার নিচের পৃষ্ঠদেশে চলাফেরা করতে দেখা যায়।
দমন ব্যবস্থা :
নিমতেল ৫ মি. লি. + ৫ গ্রাম ট্রিকস্ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতার
নিচের দিকে স্প্রে করা। এক কেজি আধাভাঙা নিমবীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা
ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি পাতার নিচের দিকে সেপ্র করা। আক্রমণের হার অত্যন-
বেশি হলে নিউরন ৫০০ ইসি অথবা টর্ক ৫৫০ এস সি ২ মি.লি. হারে প্রতি লিটার
পানির সাথে স্প্রে করা যেতে পারে। মাকড়নাশক ওমাইট বা টলস্টার (প্রতি লিটার
পানিতে ২ মি. লি. পরিমাণ) স্প্রে করা।

রোগবালাই
এ্যানথ্রাকনোজ


রোগের লক্ষণ : পাতায় বসানো দাগ হয়। ফলেও এ দাগ দেখা যায়। পাতা ঝরে পড়ে এবং ফল পচে যায়।
পাতায় গোলাকৃতি দাগ দেখা যায়। কুয়াশায় পাতার পচন লক্ষ করা যায়। প্রথমে
মধ্যাংশ একটু উঁচু ছোট কালো দাগ হয়। দাগ বাড়তে থাকে এবং পুরো ফলে কালো ছোপ
ছোপ দাগ হয়ে ফল পচে যায়। উক্ত ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করলে পরের বছর চারা গজায়
না।

দমন ব্যবস্থা  : ব্যাভিষ্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার
পানিতে গুলে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করা। রোগমুক্ত ভালো বীজ ব্যবহার করতে
হবে। ফল পুরোপুরি না পাকিয়ে তুলে নিতে হবে। ক্যাপসিকামের বীজ-ফলে অবশ্যই
ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে বীজ রোগমুক্ত রাখতে হবে।

ব্লাইট
রোগের লক্ষণ 
: পাতায় দাগ হয়। পাতা ঝলসে যায়।
দমন ব্যবস্থা  : ব্যাভিষ্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে গুলে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করা। রোগমুক্ত ভালো বীজ ব্যবহার করতে হবে।
উইল্টিং

রোগের লক্ষণ : গাছ আস্তে আস্তে ঢলে পড়ে এবং মারা যায়।

দমন ব্যবস্থা  : আক্রান্ত গাছ উপড়ে ফেলা এবং জমিতে পৱাবন সেচ না দেয়া।

ফসল তোলা ও ফলন 

মিষ্টি
মরিচ সাধারণত  পরিপক্ব সবুজ অবস্থায় লালচে হওয়ার আগেই মাঠ থেকে উঠানো হয়।
সাধারণত সপ্তাহে একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের পর
ঠাণ্ডা অথচ ছায়াযুক্ত স্থানে বাজারজাতকরণের  পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে
হয়। উল্লেখ্য যে, ফসল সংগ্রহের সময় প্রতিটি ফলে সামান্য  পরিমাণে বোটা
রেখে দিতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পলি হাউজের
ভেতরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফার্টিগেশন পদ্ধতিতে সাফল্যজনকভাবে
ক্যাপসিকাম উৎপাদন করেছেন। উওম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চাষাবাদ করলে
California Wonder জাতে হেক্টরপ্রতি ১০-১২ টন ফলন পাওয়া সম্ভব।

ড্রাগন ফল চাষ করুন, একর প্রতি বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করুন।


রুম্পা চক্রবর্তী নামে শৌখিন এক ফলচাষি বাণিজ্যিকভাবে ১০ একর জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করে রীতিমতো হইচই সৃষ্টি করে ফেলেছেন ঢাকার সাভারে আশুলিয়ার মরিচকাটা গ্রামে ওই ফলচাষি প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার গাছ লাগিয়ে এরই মধ্যে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছেন মাত্র এক বছরের মধ্যে গাছগুলো ফলবতী হয়ে উঠছে বছরই তিনি থেকে ১০ হাজার ফল পাওয়ার আশা করছেন ড্রাগন ফলের দেশ হিসেবে পরিচিত থাইল্যান্ডে একটি গাছ পরিপূর্ণ ফলবান হতে সময় লাগে তিন বছর ২০০৯ সালে থাইল্যান্ড থেকে ড্রাগন ফলের চারা এনে জমিতে লাগানোর মাত্র এক বছরের মধ্যে ফল ধরতে দেখে তিনি নিজেই হতবাক হয়ে যান তাই তিনি রফতানিযোগ্য এই ফলের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী দেশে এখন এই ফলের চারাও পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রুট জার্ম প্লাজম সেন্টারে সাভারের জিরানীতেও বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এই ফল এল আর এগ্রোর স্বত্বাধিকারী লুৎফর রহমানও গড়ে তুলেছেন ড্রাগন ফলের বাগান
খবরে প্রকাশ, ফটিকছড়ির হালদা ভ্যালি চা বাগানের গাছে গাছে এখন দুলছে লাল টুকটুকে ড্রাগন ফল বছর বেশ ভালো ফলন হয়েছে দুর্লভ সুস্বাদু ড্রাগন ফলের চা উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের মাটিতে বিদেশি ফল; ড্রাগন চাষেও সফলতা অর্জন করেছে বাগান কর্তৃপক্ষ কারণে রামগড়ের পার্শ্ববর্তী উত্তর ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত এলাকার চা বাগানটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে হালদা ভ্যালি চা বাগানের ব্যবস্থাপক জানান, চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাদের খান সম্পূর্ণ শখের বশে বিদেশি ফলের চাষের উদ্যোগ নেন ২০০৪ সালে থাইল্যান্ড সফরকালে তিনি ড্রাগন ফলের ৮০০ চারা গাছ সংগ্রহ করে আনেন হালদা ভ্যালি চা বাগানের অনাবাদি জায়গায় চারাগুলো রোপণ করা হয় গাছ লাগানোর - বছর পরই ফুল ফল আসতে শুরু করে প্রথমদিকে ফলন কম হলেও এখন প্রতি বছরই উৎপাদন বাড়ছে
কাটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে বাগান সম্প্রসারণ করা হচ্ছে প্রতি বছর বর্তমানে প্রায় হাজার ২০০ ফলবান গাছ আছে এবার গাছের প্রতিটি ডালে ৫০-৬০টি ফল ধরেছে পাকা ফলগুলোর প্রতিটির ওজন ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম গত বছর প্রায় ২০০-২৫০ কেজি ফল উৎপাদন হয় এবার সাড়ে ৩৫০ কেজির মতো ফল হয়েছে তিনি জানান, এপ্রিল-মে মাসে ফুল আসে ২০-২৫ দিনে ফুল ফলে পরিণত হয় অক্টোবর-নভেম্বর মাস পর্যন্ত ফুল ফোটা ফল ধরা প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে দেশের মাটি আবহাওয়া যে ড্রাগন ফল চাষের জন্য উপযোগী তা প্রমাণ করেছে হালদা ভ্যালি চা বাগান এই ফলের অন্য নাম পিটাইয়া
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্ম প্লাজম সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক . এমএ রহিম ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ড্রাগন ফলের প্রবর্তন করেন তিনি ফলের জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ভিয়েতনাম থেকে সেসব গাছ এখন দিব্যি ফল দিচ্ছে এরই মধ্যে ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এই সফলতার ওপর ভিত্তি করেই জার্ম প্লাজম সেন্টারের পক্ষ থেকে নাটোর, রাজবাড়ী, রাঙ্গামাটিসহ এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ড্রাগন ফলের চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ২০০৯ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বড়াইগ্রামে হবিদুল ইসলামের বাড়িতে বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ উদ্বোধন করেন তার বাড়িতে ৫টি ড্রাগন ফলের চারা লাগানো হয় গত বছর তার ওই বাগানের একটি গাছে তিনটি ফল ধরেছে এবং অন্য গাছগুলোতেও ফুল ধরা শুরু করেছে মাত্র আড়াই বছর পরিচর্যার পর ড্রাগন গাছে ফল ধরাতে ভীষণ খুশি ফলচাষি হবিদুল ইসলাম এরই মধ্যে আরও অনেকে তার কাছ থেকে চারা নিয়ে লাগানো শুরু করেছেন পুষ্টিকর সুস্বাদু এই ফলের চাষ হলে সবাই উপকৃত হবে এটাই হবিদুল ইসলামের প্রত্যাশা
গত তিন বছর ধরে ড্রাগন ফলের পরীক্ষামূলক গবেষণায় সফল হয়েছেন রাঙ্গামাটির কাপ্তাই কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা তাদের মতে, পাহাড়ের মাটি এই ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে ড্রাগন ফলের জন্ম প্রায় ১০০ বছর আগে ড্রাগন ফলের বীজ নিয়ে আসা হয় ভিয়েতনামে এরপর থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয় ড্রাগন ফলের চাষ
প্রতি বিঘা জমিতে ২০০টি ড্রাগন ফলের গাছ রোপণ করা যায় ড্রাগন ফুল নাইট কুইনের মতোই রাতে ফোটে ফুলের আকার লম্বাটে এবং রং সাদা হলুদ ফুল স্বপরাগায়িত এবং মৌমাছি পোকামাকড় পরাগায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে ফুল থেকে ডিম্বাকৃতি ফল উৎপন্ন হয় ফল হালকা মিষ্টি ক্যালরি কম যুক্ত এবং এতে কালোজিরার মতো অসংখ্য বীজ থাকে একটি গাছ থেকে বছরে ৬০ থেকে ১০০ কেজি ফল পাওয়া যায় পোকামাকড় রোগবালাইয়ের উপদ্রব কম থাকায় ফল চাষে রাসায়নিক সার বালাইনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না গাছগুলো প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ খাবার বায়ুমন্ডল থেকেই সংগ্রহ করতে পারে এবং বাকি খাবার সংগ্রহ করে জৈব সার থেকে এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয় এই ফল চাষের ওপর জোর দিচ্ছে
বাউ ড্রাগন ফল- (সাদা) বাউ ড্রাগন ফল- (লাল) দুটি জাত বাংলাদেশে চাষ করা হচ্ছে বীজ কাটিং পদ্ধতিতে ড্রাগন ফলের চাষ করা যায় তবে বীজের গাছে মাতৃগাছের মতো ফলের গুণাগুণ না- থাকতে পারে এতে ফল ধরতে বেশি সময় লাগে ড্রাগন চাষের জন্য কাটিংয়ের চারাই বেশি উপযোগী কাটিং থেকে উৎপাদিত গাছে ফল ধরতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে উপযুক্ত যত্ন নিলে একরপ্রতি থেকে টন ফলন পাওয়া যায় কেজিপ্রতি দাম ২০০ টাকা হলেও, যার বাজর মূল্য ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা খরচ থেকে লাখ টাকা বাদ দিলেও নিট লাভ হবে থেকে লাখ টাকা  বর্তমানে ভিয়েতনামে এই ফল বেশি চাষ হচ্ছে ভিয়েতনাম ছাড়াও তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, চীন, ইসরাইল, অস্ট্রেলিয়াতেও ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে ড্রাগন ফল চাষ খুব সহজ ড্রাগন ফলের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় হলো  জুন-জুলাই মাস আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মে মাস থেকে অক্টোবর মাসে ফল সংগ্রহ করা যায় শীতকালে এই গাছ ফুল দেয়া বন্ধ করে দেয় ড্রাগন ফল গাছে পাকা অবস্থায় থেকে দিন রেখে দেয়া যায় আর গাছ থেকে ফল সংগ্রহের পর রাখা যায় প্রায় এক মাস

প্রায় সব ধরনের উঁচু মাটিতেই ড্রাগন ফলের চাষ করা যায় বর্তমানে ঢাকার কিছু অভিজাত হোটেলে প্রতি কেজি ড্রাগন ফল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে নাটোরসহ দেশের অন্যান্য স্থানে এর আবাদ হলে দাম কমবে বলে আশা করেন দেশের উদ্যান বিশেষজ্ঞরা এছাড়া ইউরোপ আমেরিকায় দিন দিন ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে আশা করা যায়, দুই/এক শতাব্দীর মধ্যেই ইউরোপ-আমেরিকায় ড্রাগন ফল প্রধান ফল হিসেবে আবির্ভূত হবে সেইসঙ্গে বাংলাদেশও প্রসিদ্ধি লাভ করবে ড্রাগন ফল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে

ড্রাগন ফলের পুষ্টিমান


ভক্ষণযোগ্য প্রতি ১০০ গ্রামে পাওয়া যায়-         
  • পানি    -        ৮০-৯০ গ্রাম
  • শর্করা   -        -১০ গ্রাম
  • প্রোটিন  -        .১৫-. গ্রাম
  • আঁশ     -        .৩৩-.৯০ গ্রাম
  • খাদ্যশক্তি   -    ৩৫-৫০ কিলোক্যালরি
  • চর্বি      -        .১০-. গ্রাম
  • ক্যালসিয়াম      -        -১০ মি গ্রাম
  • আয়রন -        .-. মি.গ্রাম
  • ফসফরাস        -        ১৬-৩৫ গ্রাম
  • ক্যারোটিন       -        (Vitamin A থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন সামান্য
  • ভিটামিন          -        বি- - . - .৪মিগ্রাম

ভিটামিন          -        সি --২৫ মিগ্রাম

ড্রাগন ফলের গুরুত্ব


.       ক্যারোটিন সমৃদ্ধ থাকায় সুস্থ চোখের উন্নয়ন করে
.       আঁশ বেশি থাকায় হজম শক্তি বৃদ্ধি করে
.       আঁশ শরীরের চর্বি কমায়
.       এর প্রোটিন শরীরের বিপাকীয় কাজে সহায়তা করে
.       ক্যালসিয়াম হাড় শক্ত সুস্থ দাঁত তৈরি করে
.       ভিটামিন-বি- কার্বহাইড্রেট বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন করে
.       ভিটামিন বি- রক্তের কোলেস্টেরল কমায় এবং ত্বক মসৃণ রাখে
.       ভিটামিন সি শরীরের কাটা, ভাঙা জোড়া লাগাতে সাহায্য করে
.       ভিটামিন বি- শরীরে ক্ষুধা তৃষ্ণা, যৌন বাসনা, প্রভৃতি মিটানোর আকাঙক্ষা উন্নয়ন পূরণে সাহায্য করে
১০.     ফসফরাস বেশি থাকায় কোষ কলা গঠনে সাহায্য করে


ঔষধি গুণ
রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
তাইওয়ানে ডায়াবেটিসের রোগীরা ভাতের পরিবর্তে ফল প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে
ফলটিতে ফাইটো অ্যালবুমিন, এন্টি অ্যঙিডেন্ট থাকে যা ক্যান্সারের কারণ  ফ্রি রেডিক্যাল তৈরিতে বাধা দেয়
ফল খেলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে
ক্রনিক আন্ত্রিক সমস্যার সমাধান করে
লিভারের জন্য খুবই উপযোগী
গবেষণায় জানা গেছে ফল নিয়মিত খেলে ওজন কমে এবং সুন্দর শরীর তৈরি হয়


রোপণ ও সার ব্যবস্থাপনা 
জমি ভালোভাবে চাষ করে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩ মিটার দিয়ে হেক্সাগোনাল বা ষড়ভোজী পদ্ধতি ব্যবহার করে এ গাছ লাগানো ভালো। তবে অবস্থা ভেদে দূরত্ব কম বা বেশি দেওয়া যেতে পারে। ড্রাগন ফলের চারা রোপণের জন্য ২০-৩০ দিন আগে প্রতি গর্তে ৪০ কেজি পচা গোবর, ৫০ গ্রাম ই্উরিয়া, টিএসপি ও এমওপি ১শ গ্রাম করে এবং জিপসাম, বোরাক্স ও জিংকসালফেট ১০ গ্রাম করে দিয়ে, গর্তের মাটি উপরে-নিচে ভালোভাবে মিশিয়ে রেখে দিতে হবে। ক্যাকটাস গোত্রের গাছ বিধায় বছরের যে কানো সময়ই লাগানো যায় তবে এপ্রিল-সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে লাগানো ভালো। কাটিংকৃত কলম প্রতি গর্তে ৪ থেকে ৫টি করে লাগানো হয়। এক্ষেত্রে যদি ভিয়েতনাম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাহলে পিলারের চারদিকে কাটিংকৃত কলম চারা লাগিয়ে পিলারের সাথে বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু যদি থাইল্যান্ড ও ফ্লোরিডা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাহলে গর্তে সোজা করে ৪ থেকে ৫টি কলম চারা রোপণ করা হয়। এ গাছ ১.৫-২.৫ মিটার লম্বা হয়। এজন্য এ গাছকে উপরের দিকে ধরে রাখার জন্য সিমেন্টের বা বাঁশের খুটির সাথে উপরের দিকে তুলে দেওয়া হয়। এটি হলো ভিয়েতনাম সিস্টেম। এছাড়া উপরের দিকে ছোট মোটর গাড়ির চাকা বাঁশের চ্যাগারের মধ্যে সেট করে খুব সহজেই এ গাছের শাখাগুলোকে বাড়তে দেওয়া যায় এবং এ সিস্টেমকে বলা হয় শ্রীলংকা সিস্টেম। থাইল্যান্ড ও ফ্লোরিডাতে দুপাশে দুটি খুঁটি পুঁতে মোটা তারের উপরে জাংলার মতো তৈরি করে গাছ জাংলায় তুলে চাষ করা হয়। এ সিস্টেমকে বলা হয় ফ্লোরিডা সিস্টেম। 

বংশবিস্তার 
এ ফলের বংশবিস্তার খুব সহজ। বীজ দিয়েও বংশ বিস্তার করা যায়। তবে এতে ফল ধরতে একটু বেশি সময় লাগে তবে হবহু মাতৃবৈশিষ্ট্য বজায় থাকে না। সেজন্য কাটিং এর মাধ্যমে বংশ বিস্তার করাই ভালো। কাটিং এর সফলতার হার প্রায় শতভাগ এবং তাড়াতাড়ি ধরে। কাটিং থেকে উৎপাদিত একটি গাছে ফল ধরতে ১২-১৮ মাস সময় লাগে। সাধারণত বয়স্ক এবং শক্ত শাখা ১ থেকে ১.৫ ফুট কেটে হালকা ছায়াতে বেলে দোআঁশ মাটিতে গোড়ার দিকের কাটা অংশ পুতে সহজেই চারা উৎপাদন করা যায়। তারপর ২০ থেকে ৩০দিন পরে কাটিং এর গোড়া থেকে শিকড় বেরিয়ে আসবে। তখন এটা মাঠে লাগানোর উপযুক্ত হবে। তবে উপযুক্ত পরিবেশে ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাটিংকৃত কলম সরাসরি মূল জমিতে লাগানো যায়।

প্রুনিং ও ট্রেনিং
ড্রাগন ফল খুব দ্রুত বাড়ে এবং মোটা শাখা তৈরি করে। একটি ১ বছরের গাছ ৩০টি পর্যন্ত শাখা তৈরি করতে পারে এবং ৪ বছরের বয়সী একটি ড্রাগন ফলের গাছ ১শ ৩০টি পর্যন্ত প্রশাখা তৈরি করতে পারে। তবে শাখা প্রশাখা উৎপাদন উপযুক্ত ট্রেনিং ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২ থেকে ১৮ মাস পর একটি গাছ ফল ধারণ করে। ফল সংগ্রহের ৪০ থেকে ৫০টি প্রধান শাখায় প্রত্যেকটি ১ বা ২টি সেকেন্ডারি শাখা অনুমোদন করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে টারসিয়ারী ও কোয়ার্টারনারী প্রশাখাকে অনুমোদন করা হয় না। ট্রেনিং এবং প্রুনিং এর কার্যক্রম দিনের মধ্যে ভাগে করাই ভালো। ট্রেনিং ও প্রুনিং করার পর অবশ্যই যে কোন ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। তানা হলে বিভিন্ন প্রকার রোগবালাই আক্রমণ করতে পারে। 

সেচ নিকাশ
ড্রাগন ফল চাষে পানি খুব কম লাগে। শুকনো মৌসুমে অবশ্যই সেচ ও বর্ষা মৌসুমে নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে দুলাইনের মাঝখানে ৫০ থেকে ১শ সেন্টিমিটার আকারে নালা তৈরি করা যায়। এতে করে নালায় ১ বা ২দিন পানি জমা রেখে গাছের মাটিতে রস সরবরাহ করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে যে, এ গাছ অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না। পানি ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে।

অসময়ে ফল উৎপাদনের কলা কৌশল 
বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টারে পরীক্ষামূলক চাষে দেখা গেছে যে ফল আসা শুরু হয় জুন মাসে এবং নভেম্বর মাস পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়। ভিয়েতনামে শীতকালে দিবসের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে প্রতি ৪টি গাছের জন্য একটি করে ৬০ থেকে ১শ ওয়াটের বাল্ব সন্ধ্যা থেকে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা জ্বালিয়ে রেখে ফল আনা হচ্ছে। এতে সুবিধা হচ্ছে যে চাহিদা মোতাবেক সময়ে ফল নেওয়া যায়।

রোগ বালাই ও পোকা মাকড়
ফলে রোগ বালাই খুবই একটা চোখে পড়ে না। তাবে কখনো কখনো এ পল গাছে মূলপঁচা, কান্ড ও গোড়া পঁচা রোগ দেখা যায়। মূলপচাঁ: গোড়ায় অতিরিক্ত পানি জমে গেলে মূল পঁচে যায়। এ রোগ হলে মাটির ভিতরে গাছের মূল একটি দুটি করে পঁচতে পঁচতে গাছের সমস্ত মূল পঁচে যায়। গাছকে উপরের দিকে টান দিলে মূল ছাড়া শুধু কান্ড উঠে আসে। তবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে উঁচু জমিতে এ ফলের চাষ করা ভালো। এ রোগটি Fusarium sp দ্বারা সংঘটিত হয়। কাণ্ড ও গোড়া পঁচা রোগ: ছত্রাক অথবা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হতে পারে। এ রোগ হলে গাছের কাণ্ডে প্রথমে হলুদ রং এবং পরে কালো রং ধারণ করে এবং পরবর্তীতে ঐ অংশে পঁচন শুরু হয় এবং পঁচার পরিমাণ বাড়তে থাকে। এ রোগ দমনের জন্য যে কোন ছত্রাকনাশক (বেভিস্টিন, রিডোমিল, থিওভিট ইত্যাদি) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করে সহজেই দমন করা যায়।

পোকা মাকড়
ড্রাগন ফলের জন্য ক্ষতিকর পোকা মাকড় খুব একটা চোখে পড়ে না, তবে মাঝে মাঝে এফিড ও মিলি বাগের আক্রমণ দেখা যায়। এফিডের বাচ্চা ও পূর্ণ বয়স্ক পোকা গাছের কচি শাখা ও পাতার রস চুষে খায়, ফলে আক্রান্ত গাছের কচি শাখা ও ডগার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় ও গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে। এ পোকা ডগার উপর আঠালো রসের মতো মল ত্যাগ করে ফলে শুটিমোল্ড নামক কালো ছত্রাক রোগের সৃষ্টি হয়। এতে গাছের খাদ্য তৈরি ব্যাহত হয়। এতে ফুল ও ফল ধারণ কমে যায়। এ পোাকা দমনে সুমিথিয়ন/ ডেসিস/ ম্যালাথিয়ন এসব কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ মিলিলিটার বা ৫ কাপ ভালো ভাবে মিশিয়ে স্প্রে করে সহজেই এ রোগ দমন করা যায়।


ফল সংগ্রহ ফলন

·         ফল যখন সম্পূর্ণ লাল রঙ ধারণ করে তখন সংগ্রহ করতে হবে
·         ফুল আসার ৩০-৫০ দিনের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়
·         বছরে -৬টি পর্যায়ে ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রথমত জুন-অক্টোবর, দ্বিতীয় ডিসেম্বর-জানুয়ারি
·         প্রতিটি ফলের ওজন ২০০ গ্রাম থেকে . কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে
·         তিন বছর বয়স্ক একটি বাগান থেকে বছরে - টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়

শেষ কথা 
অনেকেই দেশে ড্রাগন ফল নতুন হিসেবে উৎসাহের সাথে আবাদ করছেন বা করতে চাচ্ছেন। নতুন ফলের অনেক কিছু যেমন অজানা আছে তেমনি সমস্যাও থাকতে পারে বেশি। তাই কেউ ড্রাগন ফলে আবাদ করতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্ম প্লাজম সেন্টারের পরিচালক বিশিষ্ট ফলবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এম এ রহিমের সাথে যোগাযোগ করে করলে অন্তত ঠকবেন না কম খরচে ভালোভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করতে পারবেন। পরিকল্পিতভাবে আমরা আগ্রহীরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করে লাভবান হতে পারি।